ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই আমরা দেখতে পাই চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও খুনের অসংখ্য খবর। এসব খবর পড়ে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মন খারাপ হয় এবং দিনদিন প্রিয় শহর ঢাকার আইন শৃংখলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি আমাদের শঙ্কিত করে তোলে। দেশের প্রতি অভিমান করে এবং পরিবারের নিরাপত্তা ও পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রবাসে পাড়ি জমাই অথবা প্রবাসী হওয়ার পরিকল্পনা করি। বলাই বাহুল্য, প্রবাসের গন্তব্য হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র অধিকাংশেরই প্রথম পছন্দ। আমরা ধরেই নিই যে, যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রে এমন সব শহর আছে যেখানে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি ঢাকার চেয়েও খারাপ। প্রবাসী বাঙালিদের অনেকেই এবিষয়ে খুব একটা খোঁজ খবর রাখেন না। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমি নিজেও একসময় এই দলে ছিলাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোকে সবচেয়ে নিরাপদ ভাবতাম। গত এপ্রিল মাসে শিকাগোতে একটি ছোট দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর কৌতূহলবশত একটু অনুসন্ধান করতেই আমার ভুল ভাঙলো।

গত এপ্রিল মাসে শপিং করতে গিয়েছিলাম শিকাগোর ডেভোন স্ট্রিটে (Devon Street)। এটি নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের মতো একটি জায়গা যেখানে প্রচুর ভারতীয় ও পাকিস্তানী শপিং কমপ্লেক্স, বাংলাদেশী গ্রোসারি শপ এবং রেষ্টুরেন্ট আছে। সেইন্ট লুইস থেকে পাঁচ ঘন্টা ড্রাইভ করে যখন শিকাগোতে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভাবলাম হোটেলে যাবার আগে গরীবে নেওয়াজ রেষ্টুরেন্ট থেকে দেশীয় প্রিয় সব খাবার খেয়ে নিই। রেস্টুরেন্টের বিপরীত দিকে রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে ডিনার করতে গেলাম। প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে বেরিয়ে যখন গাড়ির কাছে গেলাম, দেখি কাঁচ ভেঙে গাড়ির ভেতর থেকে সব কিছু নিয়ে গেছে। এত ব্যস্ত একটি রাস্তায় এমন ঘটনা ছিলো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। দেখলাম আরও চার-পাঁচটি গাড়িরও একই দশা। গাড়ির কাঁচ ভেঙে চুরির ঘটনা সচরাচর অনেক ঘটে, তাই আমি এটিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে পুলিশকে ফোন করলাম রিপোর্ট করার জন্য যাতে ইন্স্যুরেন্সে কোম্পানী আমার পলিসি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেয়। অবাক হলাম যে, নন ইমার্জেন্সি পুলিশ এক্সেন্জ আমাকে ১৫ মিনিটেরও বেশি সময় লাইনে রেখে তারপর আমার রিপোর্ট নিল।

এরপরে আমরা আমাদের ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোকে ফোন করলাম যাতে হারানো কার্ডগুলো বন্ধ করা যায় এবং জানলাম যে খোয়া যাওয়া একটি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে চোররা রেড বক্স কিয়স্ক থেকে কয়েকটি ডিভিডি ভাড়া করেছে। আমার স্ত্রীর পীড়াপিড়িতে রেড বক্স কোম্পানীতে ফোন করে ওই কিয়স্কের লোকেশনও নিলাম। এরপরে আবার পুলিশকে ফোন করে বিস্তারিত জানালাম; আশা করেছিলাম যে এই অতিরিক্ত তথ্য ওই চোরগুলোকে ধরার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। পুলিশ ভদ্রলোকতো আমার উপর ক্ষেপেই গেলো – আমাকে সে বললো যে আমি নাকি তাদের তদন্ত করার ক্ষমতাকে ছোট করে দেখেছি। কোনোমতে সরিটরি বলে তাকে ঠাণ্ডা করার পরে সে আমাকে বললো, ওদের অফিসে গিয়ে কি এক ফরম পূরণ করতে হবে। আমি এ বিষয়ে আর কিছু না করতে চাইলেও আমার স্ত্রী নাছোড়বান্দার মতো বললো যে পরের দিন পুলিশ স্টেশনে যেতে হবে। পরের দিন সে ফেইসবুকে লগইন করতে গিয়ে দেখলো যে, ওর ফোন দিয়ে কেউ একজন ফেইসবুকে লগইন করতে চেষ্টা করেছিল – ফেইসবুক ও গুগল ম্যাপের মাধ্যমে আমরা ওদের লোকেশন জানলাম। পরেরদিন পুলিশ স্টেশনে গেলে কর্তব্যরত সার্জেন্ট আমাকে বললো এসব করে আমরা শুধু শুধু সময় নষ্ট করছি। পুলিশের এহেন আচরণে আমার স্ত্রী খুবই মন:ক্ষুন্ন হলো; উল্লেখ্য যে চুরি হওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে ওর ডায়মন্ডের একটি নেকলেস সেট ও ছিল, তাই তার মন:ক্ষুন্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ ও ছিলো।

যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের কাছে প্রত্যাশিত সাহায্য না পেয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো যে পুলিশরা কি নিয়ে এত ব্যস্ত? অপরাধ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান খুঁজতে গিয়ে শিকাগো পুলিশের ওয়েবসাইটে গিয়ে ওদের সাপ্তাহিক রিপোর্ট ডাউনলোড করে তো আমি অবাক! শুধু ওই সপ্তাহেই ২৮ জন খুন! ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধের পরিসংখ্যান রীতিমত ভয়াবহ। তখন বুঝতে পারলাম যে পুলিশ নিশ্চয়ই খুন, ডাকাতি জাতীয় অপরাধকে অগ্রাধিকার দেয়। কৌতূহল নিয়ে সেইন্ট লুইসের পরিসংখ্যান ডাউনলো্ড করে দেখি একইরকম চিত্র। যদিও ওই সপ্তাহে সেইন্ট লুইসে খুনের সংখ্যা ছিল ৬/৭ (পুরোপুরি মনে নেই), কিন্তু শহরের জনসংখ্যার অনুপাতে সেটি খুবই ভয়াবহ। এরপর থেকে মাঝেমাঝেই আমি বিভিন্ন শহরের অপরাধ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান দেখি। সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত শিকাগোতে ৩০৫ জন খুন, প্রায় দশ হাজার গাড়ি চুরিসহ ৪৩,৮৬৭ টি বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মেট্রোপলিটন শিকাগোর জনসংখ্যা প্রায় ৯৮ লাখ, যা ঢাকার তুলনায় অর্ধেক বা তার চেয়েও কম। জনসংখ্যার অনুপাতে এই পরিসংখ্যান চমকে দেবার মত। আমি বলছিনা যে ঢাকার অথবা বাংলাদেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভাল, কিন্ত ঢাকার পরিস্থিতি সম্ভবত শিকাগোর চেয়ে ভাল। মিসিগানের ডেট্রয়েট সহ আরও কিছু শহর আছে যেখানে অপরাধের হার শিকাগোর চেয়েও খারাপ। এছাড়াও মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে, যা উম্মাদনাকেও হার মানায় – যেমন, কয়েক সপ্তাহ আগে কলোরাডোর মুভি থিয়েটারে নিরপরাধ দর্শকদের উপর কোনো কারণ ছাড়াই গুলি চালানো অথবা গত সপ্তাহে উইসকনসিনের শিখদের উপাসনালয়ের হত্যাকাণ্ড।

শিকাগোতে আমাদের গাড়ি ভেঙে চুরি না হলে আমি হয়ত কখনোই যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধের এই ব্যাপকতা সমন্ধে জানতাম না এবং এক ভুল নিরাপত্তাবোধ নিয়ে সন্তষ্ট থাকতাম। আমরা প্রায়ই ধরে নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র বা উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের চেয়ে সবদিক দিয়েই ভালো। প্রকৃতপক্ষে, বস্তুনির্ভর বিশ্লেষণ করলেই শুধু সত্যিকার অবস্থা জানা যায়।

পরিশেষে বলতে চাই, নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জনগনকে নিরাপত্তা প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি শুধু আক্ষরিক পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়। দেশের জনগণ নিরাপত্তা অনুভব করে কিনা সেটি খুবই গুরত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার অনুপাতে শিকাগো অথবা ডেট্রয়েটের অপরাধের হার উচ্চ হলেও বিচারব্যবস্থার উপর মানুষ আস্থা রাখে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরা পড়ে এবং যথাযথ শাস্তি পায় যেটা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ আনতে সাহায্য করে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশে প্রকৃত অপরাধীরা বেশিরভাগ সময়ই ধরা ছোঁয়া বাইরে থেকে যায় যা সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে সাহায্য করে। আইনশৃংখলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে সরকার আন্তরিকভাবে জনগনের নিরাপত্তা বিধান করতে কাজ করলেই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসবে।