ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলনে ছাত্রদের সাহসী ভূমিকা অনস্বীকার্য – ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং জাতীয় দাবি আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ৯০ এর পরবর্তী সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের ছাত্র সংগঠনগুলো টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হল দখল, ভর্তিবাণিজ্য ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানিতে দেশে প্রতিনিয়ত অশান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো বরাবরই এহেন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’ – এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ক্ষমতাবদলের প্রথম প্রহর থেকেই আবাসিক হল দখলের মধ্য দিয়ে তারা আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু অথবা শহীদ জিয়ার আদর্শের সৈনিক হিসেবে তারা নিজেদের পরিচয় দিলেও আপাতদৃষ্টে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হল দখল ও ভর্তিবাণিজ্য করার নৈতিকতার বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। বলা বাহুল্য, দেশের বর্তমান ছাত্র রাজনীতির এ ভয়ংকর পরিস্থিতি নিয়ে আজকাল প্রায়ই অনেক আলোচনা হয় এবং অনেকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষেও মত দেন। পূর্ণবয়স্ক ছাত্রদের রাজনীতি করা নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক অধিকার, তবে ছাত্র সংগঠনের কর্মপরিধি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কল্যাণমূলক বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত কিনা সেটি অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে। এ বিষয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে অনেক বিতর্ক ও লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছেও। আমি এ বিষয়ে আর বিতর্কে যেতে চাই না, তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্র সংগঠন সমন্ধে কিছু কথা বলতে চাই।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে (সেইন্ট লুইস, মিসৌরিতে অবস্থিত) এমবিএতে ভর্তির জন্য নির্বাচিত ছাত্রদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সম্পৃক্ততা ও ভূমিকা দেখে আমি অভিভূত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। দুই দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজন, চমৎকার উপস্থাপনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে মনঃস্থির করেছিলাম। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত ও নিয়েছিলাম।

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র হিসেবে অভিষেকের শুরু থেকেই আমি সব সহপাঠীদের ভালভাবে জানার চেষ্টা করলাম। বিজনেস স্কুলের স্টুডেন্ট ডিরেক্টরি ও ফটোবুক দেখে সবার নাম ও ব্যাকগ্রাউন্ড জানলাম। প্রথম দুই সপ্তাহের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম, বিভিন্ন টিম বিল্ডিং ইভেন্টস ও নেটওয়ার্কিং সেশনগুলো সবার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ব্যাপারে খুবই সহায়ক হলো।

ওরিয়েন্টেশন শেষ হওয়ার পরের সপ্তাহেই এমবিএর মূল কোর্সওয়ার্ক শুরু হলো এবং গ্রাজুয়েট বিজনেস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনেট নির্বাচনের ঘোষণা হলো। অনেক চিন্তাভাবনা করে শেষ মুহূর্তে আমি ও এই সিনেট নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই নির্বাচনের নিয়মাবলী ছিল বাংলাদেশে আমার দেখা যেকোনো নির্বাচন থেকে খুবই আলাদা। প্রচারণা করার সময় নির্ধারিত ছিলো সোমবার সকাল ৫টা থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত। পোস্টারিং করার জন্য নির্ধারিত ছিল একটি কমনরুমের ভেতরের দেয়াল। রবিবার রাতে পোস্টার ডিজাইন করে সোমবার সকালে ১০-১২টি কপি প্রিন্ট করে যখন বিজনেস স্কুলে পৌঁছালাম, কমনরুমের দেয়ালে তিলধারণের জায়গাও ছিল না। অনেক কষ্ট করে কোনোমতে দুটি পোস্টার এমন জায়গায় লাগালাম যেখানে সাধারনত কারো দৃষ্টি যায় না। যাই হোক, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সহপাঠী ছাত্রদের সাথে যথাসম্ভব কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলাম এবং ভোট চাইলাম। কেউ কেউ আমাকে সমর্থন করার কথা জানালেও অনেকেই বললো যে শুক্রবার নির্বাচনপূর্ব বিতর্ক দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে বলে রাখা ভাল যে, বর্ণগত দিক থেকে আমাদের ক্লাস ছিল খুবই বহুজাতিক – প্রায় ৬৫% ককেশীয় (সাদা) এবং বাকিরা চাইনিজ, জাপানিজ, ভারতীয় ও অন্যান্য দেশি। বলাই বাহুল্য, আমি ছিলাম একমাত্র বাংলাদেশী। এই পরিসংখ্যান চিন্তা করলে আমার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। যাই হোক, নির্বাচনপূর্ব বিতর্কে স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নিয়ে আমি আমার ভিশন তুলে ধরলাম এবং বিভিন্ন প্রশ্ন ভালোভাবেই সামলালাম, যা নির্বাচনের ফলাফলেই প্রতীয়মান হলো। কোনো দল বা গোত্রের সমর্থন ছাড়াই আমি অ্যাসোসিয়েশনের সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হলাম।

ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কি ভূমিকা রেখেছিলাম সেকথা বলার আগে স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের গঠন সমন্ধে একটু বলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। অ্যাসোসিয়েশনের মূল সংগঠনের ছিল দুটি ব্রাঞ্চ – সিনেট (প্রতি ক্লাসের পাঁচ জন করে মোট দশজন সিনেটর)এবং অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্রাঞ্চ। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্রাঞ্চের প্রধান ছিল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, যার অধীনে ছিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিভিন্ন অঙ্গ – ফাইন্যান্স, এ্র্যাকাডেমিক্স, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, বহিঃসম্পর্ক, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি। অ্যাসোসিয়েশনের সার্বিক গঠন ছিল অনেকটা ফেডারেল সরকারের আদলে গড়া – সিনেটে আমরা বিভিন্ন পলিসি, সংবিধান, বাজেট, বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতাম এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব্রাঞ্চ সেগুলো বাস্তবায়ন করতো। এই দুই মূল সংগঠনের বাইরে ছিল বিভিন্ন ক্লাব, যেগুলো ছাত্রদের পেশাগত ও ব্যাক্তিগত আগ্রহের উপর ভিত্তি করে গঠিত হতো। যেমন, ব্যাংকিং ও কর্পোরেট ফাইন্যান্সে ক্যারিয়ার গঠনে আগ্রহী ছাত্রদের জন্য ফাইন্যান্স ক্লাব, ব্র্যান্ড মার্কেটিং ও মার্কেটিং রিসার্চে আগ্রহীদের জন্য মার্কেটিং ক্লাব ইত্যাদি। এছাড়াও সংস্কৃতি ও বিনোদনের জন্য ছিল গলফ ক্লাব, ড্যান্স ক্লাব ইত্যাদি। সব সংগঠনেরই মূল লক্ষ্য ছিল বিজনেস স্কুলে ছাত্রদের এ্যাকাডেমিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে সফল প্রফেশনাল ও সর্বোপরি সফল মানুষ হতে সহায়তা করা।

স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিনেটে আমাদের প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর মিটিং হতো। এই মিটিং ছিল সর্বসাধারণ ছাত্রদের জন্য উন্মুক্ত। তবে সিনেটর, ডিন অফিসের প্রতিনিধি এবং ক্যারিয়ার সার্ভিস অফিসের প্রতিনিধির জন্য এ মিটিং ছিল বাধ্যতামূলক। যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেয়াই এমবিএ করার মূল উদ্দেশ্য, আমরা আলোচনা করতাম কিভাবে শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেশনগুলোকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতি আগ্রহী করা যায় – ডিন অফিস কিভাবে মার্কেটিং করতে পারে, ছাত্রদের ইন্টারভিউয়ের জন্য ক্যারিয়ার অফিস কিভাবে প্রস্তুত করতে পারে, কারিকুলামে কি ধরনের পরিবর্তন আনলে ছাত্ররা এ্যাকাডেমিকভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকবে। আমরা প্রতিনিয়ত এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে নতুন নতুন আইডিয়া দিয়েছি এবং বাস্তবায়নে সাহায্য করেছি। একই সময়ে কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সাথে আলোচনা করে সমাধান করেছি।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে এর ছাত্রদের মেধা, মনন ও অন্যান্য গুনাবলীর উপর। তাই যোগ্য ও মেধাবী ছাত্রদের নির্বাচন করা একটি অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ কাজ – ছাত্র সংঘটনের নেতা হিসেবে আমরা পরবর্তী ব্যাচের ছাত্রদের আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়েছি এবং ভর্তিচ্ছুদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এমবিএ এ্যাডমিশন কমিটিকে সাহায্য করেছি। এছাড়া ছাত্রদের সার্বিক সুযোগ সুবিধা ও ছিল আমাদের অগ্রাধিকার – ক্যাফেতে খাবারের মেনু পরিবর্তন করা, লাইব্রেরিতে স্টাডি রুমের সংখ্যা বাড়ানো, কমনরুমে নতুন আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করাও ছিল আলোচনার বিষয়বস্তু। ছাত্রদের মনোবল বাড়ানোর জন্য ইউনিভার্সিটির এ্যাকটিভিটি ফান্ডের সাহায্যে বিভিন্ন এ্যাওয়ার্ড ব্যবস্থা চালু করা, আনুষ্ঠানিক নৈশভোজের আয়োজন করা – আরও কত কি!

দুই বছর সিনেটে দায়িত্ব পালনকালের সব ভূমিকার ফিরিস্তি দিয়ে এ লেখা বড় করতে চাই না, তবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতি আমাদের দায়িত্ব পালনে কোনো প্রভাব ফেলেনি। প্রশ্ন জাগতে পারে ছাত্রদের মধ্যে কি দলীয় আদর্শবাদী কেউ ছিল না কিংবা ছাত্ররা কি কখনো রাজনৈতিক আলোচনায় জড়ায়নি? অবশ্যই ছিল, কিন্ত ওসব আমাদের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ছাত্রদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে আমরা রাজনৈতিক বিতর্কের আয়োজন করেছি যেখানে ছাত্ররা বারাক ওবামা ও জন ম্যাকেইনের ভূমিকায় বিতর্ক করেছে (২০০৮ এর নির্বাচনের সময়)। এই বিতর্ক পর্যবেক্ষণ করা ছিল আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংগঠনের কি ভূমিকা হওয়া উচিৎ সেটি পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিতে চাই। তবে একথা বলতে চাই যে, বাংলাদেশে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির যে দুর্নাম তা দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় কতিপয় ছাত্রনেতাদেরই সৃষ্টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির প্রতি নির্লজ্জ আনুগত্যও এক্ষেত্রে কম দায়ী নয়। ছাত্র রাজনীতির বর্তমান নেতিবাচক ভাবমূর্তিকে দূর করে ঐতিহাসিক হারানো গৌরবকে পুনরুদ্ধার করা সুদূর স্বপ্নের মতো। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোকে দলীয় রাজনীতির বলয় থেকে মুক্ত করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব সাধারণ ছাত্রদের মাঝে ফিরিয়ে দিয়ে শুরু করা যায় হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের পথের এই কঠিন যাত্রা। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমনটা আশা করা কি অলীক কল্পনা নয়?