ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

নাফিস নামক ২১ বছর বয়সী বাংলাদেশী যুবকের নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে হামলা পরিকল্পনা গত কয়েকদিনের পত্রিকার একটি গুরত্বপূর্ণ খবর। বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্ক টাইমস অথবা বৃটেনের দি টেলিগ্রাফসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অধিকাংশ পত্রিকাই খবরটিকে অত্যন্ত গুরত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। ‘স্টিং অপারেশন’ এর নামে এভাবে ফাঁদে ফেলার নৈতিকতা নিয়ে এরই মধ্যে অনেকে প্রশ্নও তুলেছেন। অনেকে এই ঘটনার মধ্যে আমেরিকার ষড়যন্ত্রও খুঁজছেন। তবে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এতটুকু বলতে পারি, নাফিসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য হোক বা নাই হোক, বাংলাদেশের নামের সাথে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা লাগুক সেটি কোনো বাংলাদেশীই পছন্দ করবেন না। দু:খজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে নাফিসের এহেন কুকীর্তির দায় বাংলাদেশের ঘাড়েই বর্তাবে এবং চাইলেও এই দুর্নামের সাথে বাংলাদেশের নামের সম্পৃক্ততা এড়ানো যাবে না।

নাফিস দোষী নাকি নির্দোষ সেটি আদালতে প্রমাণ সাপেক্ষ এবং প্রমাণিত হওয়ার আগে তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করাটা সমীচিন হবে না। তবে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি খুবই গুরুতর। এই অভিযোগের সত্যতা বা ফাঁদে ফেলে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের প্রশ্ন থাকতেই পারে, তবে নিজের দেশের বা নিজের ধর্মের ছেলে বলে নাফিসের পক্ষ না নিয়ে, তরুন সমাজের মধ্যে অন্য ধর্ম বা দেশের প্রতি ঘৃণা/আক্রোশ তৈরি প্রতিহত করতে আমাদের করণীয় নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্বের প্রতিটি ধর্মই শান্তির শিক্ষা দেয় এবং ধ্বংস বা হত্যার মাধ্যমে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে একশ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ কোমলমতি মানুষকে জিহাদের নাম করে ভুল পথে প্ররোচিত করে। নাফিসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ থেকে অনুমান করা যায় যে আমেরিকার প্রতি তার প্রচণ্ড বিদ্বেষ ছিল এবং আমেরিকাকে শিক্ষা (?) দিতে আত্নঘাতী হামলা করাকেও সে যথাযথ মনে করেছিল (অভিযোগ অনুযায়ী)। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নাফিসদের মতো তরুনদের মধ্যে এধরনের মানসিকতা (যদি অভিযোগ সত্য হয়) তৈরিতে আমাদের সমাজ উৎসাহিত করে কি না?

বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার সুবাদে এবং সাম্প্রতিক আরও অনেক ঘটনায় আমাদের দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়ার (দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত মন্তব্যের) আলোকে আমি বিশ্বাস করি যে, ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরিতে আমাদের সমাজ যথেষ্ট উৎসাহিত করে। এ প্রসঙ্গে দুটি উদাহরণ দিচ্ছি।

ছোটবেলায় যখন সকালে কোরআন শরীফ পড়তে মক্তবে যেতাম, পাণ্জাবী না পড়ে শার্ট পড়ে গেলে হুজুর কখনও কখনও বিধর্মী/ইহুদী/খ্রিষ্টান বলে বকা দিতেন। এভাবে অন্য ধর্মকে ছোট করে দেখার এই মানসিকতা যদি ছোটবেলায়ই ধর্ম শিক্ষক শিক্ষা দেন তাহলে বড় হয়ে কেউ যদি অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ হয় সেটি অনাকাঙ্খিত হবে কেন?

কিছুদিন আগে ইউটিউবে মহানবী(স:) কে নিয়ে বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল সেটি সবারই নিশ্চয়ই মনে আছে। মহানবী (স:) কে ব্যঙ্গ করলে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগা স্বাভাবিক, তাই বলে একজন বিতর্কিত ব্যক্তির চলচ্চিত্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি পুরো জাতিকে দায়ী করা কি যুক্তিযুক্ত? লিবিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করা কি সমর্থনযোগ্য? বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এই বর্বর হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত খবরে অনেকের মন্তব্য দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। অনেকে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, ‘আমেরিকানদেরও হত্যা করা যায়!’ অনেকে এর জন্য মার্কিনি প্রতিরক্ষানীতিকে দায়ী করে লিবিয়ার রাষ্ট্রদূতের হত্যাকাণ্ডকে যায়েজ করার চেষ্টা করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছেন। প্রাপ্তবয়স্করা যখন এধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেন, তখন তরুনদের উপর কি এর প্রভাব পড়ে না?

এবার নাফিস প্রসঙ্গে ফিরে আসি। দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ইতিমধ্যে নাফিসের পক্ষে অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। অনেকে বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে নাফিসের মত নিরীহ/শান্ত ছেলের পক্ষে এতবড় পরিকল্পনা করা সম্ভব। অনেকে আবার এই ঘটনায় প্ররোচনা (?) দেয়ার জন্য এফ বি আই কে দোষীর কাঠগড়ায়ও দাঁড় করাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ‘জজ মিয়া’ নাটকের ও গন্ধ পাচ্ছেন। তবে যারা এই দলে আছেন, তাঁদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা একটু মন খুলে চিন্তা করুন। আপনার ছোট ছেলে বা মেয়ে সমন্ধে যদি প্রতিবেশী কোনো কারণে অভিযোগ করে, আপনি কি প্রথমেই প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করবেন নাকি নিজের সন্তানের দোষ খুঁজে তাকে সংশোধন করার চেষ্টা করবেন? নাফিসের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যদি সত্য হয়, এবং ওই বোমা যদি প্রকৃত বোমা হত, তাহলে এটি কি ধরনের ক্ষতি করতে পারতো ভেবে দেখুন। আমাদের দেশের কিছু মানুষ যেমন একজন বাসিলের কর্মের জন্য নিজের দেশে হরতাল করেছে ও লিবিয়ার কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষেরা (আসলে সন্ত্রাসীরা) যেভাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তার উপর একজন নাফিসের হামলার জবাব কিভাবে দিতো ভেবে দেখুন। এফ বি আইএর এজেন্ট যদি নাফিসকে প্ররোচিতও করে থাকে, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে নিশ্চয়ই বাধ্য করেনি। যদি তাও করে থাকে, তাহলে নাফিস আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে পারত। ও আরেকটি কথা, আমেরিকাতে প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশীরা স্টুডেন্ট ভিসায় আসে এবং আরও লাখ লাখ বাংলাদেশী এদেশে বসবাস করে। কই, আর কেউতো এফ বি আই এর ফাঁদে পড়েনি!

নাফিস যে হামলার পরিকল্পনা করেছিল সেটি বলছি না, কিন্তু যে ছাত্র এস এস সি ও এইচ এস সিতে জিপিএ ৫ পায়, সে হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেল করা শুরু করলে কিন্তু তার মানসিক অবস্থা সমন্ধে প্রশ্ন ওঠে। কিছু একটা নিশ্চয়ই তার স্বাভাবিক জীবনে (পড়াশোনার ক্ষেত্রে) প্রভাব ফেলেছিল। বাবা মায়ের কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে আমেরিকায় এসে উজ্জল ভবিষ্যৎ গড়ার পরিবর্তে পরিবার পরিজন ও দেশের সম্মান ধূলিস্যাত করে এবং নিজের জীবনকে এহেন অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়া অত্যন্ত দু:খজনকও মর্মান্তিক।

এই ঘটনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিভিন্ন সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরতে হবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। গত বৃহস্পতিবার অফিসে আমার বস আমাকে দেখা মাত্রই জিজ্ঞাসা করলো আমি নাফিসকে চিনি কিনা। আমার এক বন্ধু (সেও নর্থ সাউথের ছাত্র ছিল) বললো, তার সহকর্মী তাকে মজা করে বলে, “ইউ আর ফরম বাংলাদেশ, সো, স্টে এ্যাওয়ে ফরম মি”। যদিও ওই সহকর্মী মজা করে বলেছে, বাংলাদেশী হিসেবে এ ধরনের উক্তি নি:সন্দেহে আমাদের লজ্জিত ও ব্যথিত করে। তাই শেষ করার আগে আবার অনুরোধ করছি, আসুন ভেবে দেখি, সমাজে তরুনদের মধ্যে অন্য ধর্ম/দেশের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব তৈরি করতে আমরা উৎসাহিত করছি কি না? আসুন, হিংসা-বিদ্বেষের পরিবর্তে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি ভালবাসা, সহনশীলতা ও সম্মান দেখাতে আমরা নিজেরা উদ্বুদ্ধ হই এবং তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করি যাতে ভবিষ্যতে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বিশ্বের দরবারে অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারে।