ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। বিভিন্ন সংস্থার জরিপের আপ টু মিনিট আপডেট ও কেবল টেলিভিশনে বিভিন্ন টক শো এর ঝড় বয়ে যাচ্ছে – সবাই প্রেডিক্ট করার চেষ্টা করছেন কে হবেন হোয়াইট হাউজের পরবর্তী কর্ণধার! রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলই জয়ের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাসী। তবে সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আর মাত্র ২৪ ঘন্টা পর নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল আসতে শুরু করবে এবং বিশ্ববাসী জানতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী চার বছরের গতিপথ। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমি মনে করি প্রেসিডেন্ট ওবামার পুর্ননির্বাচিত হওয়া উচিত।

২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে যে পরিবর্তনের স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন তা হয়ত তিনি শতভাগ পূরণ করতে পারেননি, তবে যে প্রতিকূল অবস্থার তিনি সম্মুখীন হয়েছেন সেসব কাটিয়ে চার বছরের মধ্যে তার অর্জনকে ছোট করে দেখা ও সমীচিন হবে না। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। আমি তখন ছিলাম এমবিএ স্টুডেন্ট। শীর্ষস্থানীয় বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ শেষ করে সিক্স ফিগার বেতনের (বাৎসরিক এক লাখ ডলার বা তার বেশী) চাকরি পাওয়ার আশায় অন্য প্রোগ্রামের ফুল স্কলারশীপ ও স্টাইপেন্ডের অফার ছেড়ে দিয়ে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে এমবিএতে ভর্তি হয়ে ক্লাশ শুরু করার এক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ফাইন্যন্সিয়াল জায়ান্ট কোম্পানীগুলোর পতন শুরু হলো। স্বপ্ন ছিল ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংকার হবো – সেই স্বপ্ন শুরুর আগেই শেষ। সেপ্টেম্বর মাসে সিটি ব্যংকে ইন্টার্ণশীপের জন্য প্রাথমিক ইন্টারভিউতে কোয়ালিফাই করে ফাইন্যাল ইন্টারভিউয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হিউম্যান রিসোর্সের ভদ্রমহিলা বললেন যে পরের সপ্তাহে ফ্লোরিডায় যেতে হবে এবং তিনি বিমানের টিকিট ও হোটেলের রিজার্ভেশন কনফার্ম করে আমাকে ইমেইল করবেন। দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও তার আর কোনো খোঁজ নেই। তাকে ফোন করলাম, কিন্তু রিসিভ করেননা। পরে সিটি ব্যাংকে কর্মরত পরিচিত একজনকে ফোন করে জানতে পারলাম যেই ডিপার্টমেন্টের জন্য আমি ইন্টারভিউ দিচ্ছিলাম, পুরো ডিপার্টমেন্টকেই ছাঁটাই করা হয়েছে (হিউম্যান রিসোর্সের সেই ভদ্রমহিলাসহ)।

সেসময় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ দ্বিতীয় বর্ষের অনেক ছাত্রদের দেয়া চাকরির অফার ফিরিয়ে নিল বেশ কয়েকটি কোম্পানী। ভর্তির আগে যেখানে শুনেছিলাম (আগের বছরের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে) যে প্রথম বর্ষের কয়েক মাসের মধ্যেই কয়েকটি ইন্টার্ণশীপের অফার পাওয়া যায় এবং ইন্টার্ণশীপ শেষ হওয়ার আগেই চাকরির অফার পাওয়া যায়, সেখানে আবেদন করার মতো চাকরির এ দেখা নেই। দুই একটি কোম্পানীতে আবেদন করলেও ইন্টারভিউ পাওয়াটাই ছিল স্বপ্নের মত। অর্থনীতির এরকম চরম দু:সময়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন বারাক ওবামা। অর্থনীতির দুরবস্থা নিশ্চয়ই মানুষকে রিপাবলিকান বিরোধী করে তুলেছিল, যেটি ওবামার জয়কে সাহায্য করেছিল।

নির্বাচিত হওয়ার সাথে সাথেই (ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে) তিনি রুগ্ন অর্থনীতিকে উদ্ধার করার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল বেইল আউট প্ল্যানের কাজ শুরু করলেন। অর্থ সংকটে যখন বেশীর ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তখন ক্রেডিট পাওয়া হয়ে গেল অত্যন্ত দুরহ! ব্যাংক লোন দেয়া বন্ধ করে দেয়ায় সমগ্র অর্থনীতিতে একটি প্যানিক শুরু হয়ে গেল। ফলশ্রুতিতে যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্যাশ টাকাও ছিল তারাও নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে দিল এবং কনসিউমাররাও অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বন্ধ করে দিল। এই প্যানিকের কারণে প্রতিটি ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ল এবং যুক্তরাষ্ট্র গ্রেট ডিপ্রেশনের পরের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হোল। এমন অবস্থায় বাজারে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটি অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ কাজ এবং সরকারী অর্থ লোন প্রদানের মাধ্যমে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ওবামা সেএ কাজটিই করার চেষ্টা করেছেন। সরকারূ অর্থের সহায়তায় রক্ষা হোল যুক্তরাষ্ট্রের অটো ইন্ডাষ্ট্রি (জি এম, ফোর্ড সহ অন্যরা) এবং গোল্ডম্যান সাকস সহ অন্যান্য ফাইন্যান্সিয়াল জায়ান্টরা। এই বিশাল বেইল আউটকে তখন রিপাবলিকান মিট রমনী সহ অনেকেই সমর্থন করেননি। তবে পরবর্তীতে এসব কোম্পানীগুলো প্রত্যেকেই সুদসহ সরকারী লোন পরিশোধ করেছিল। সরকারী অর্থনৈতিক সহায়তা ছাড়া তখন বাজারে বিশ্বাস ফেরানো যে সম্ভব ছিল না সেটি বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদই সমর্থন করবেন।

আজ যখন মিট রমনি অভিযোগ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ওবামার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার বেড়েছে, তার দাবির সত্যতা আছে। তবে ওবামা যখন দায়িত্ব নেন তখনকার যে অবস্থা ছিল সে অবস্থা চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতি আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো সেটি ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। যদিও নেট হিসেব করলে ওবামার ক্ষমতা নেয়ার সময়ের তুলনায় এখন বেকারত্বের হার বেশি, সর্বশেষ (৩৫ মাসের) ট্রেন্ড অনুযায়ী পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ২০০৯ সালে ইন্টারভিউয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌঁড়িয়েছি, আজ সেখানে প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন রিক্রুটাররা বিভিন্ন চাকরির জন্য লিংকডইন প্রোফাইল থেকে খুঁজে ইমেইল করে। বেকারত্বের হার শুধু সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা না করে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই অর্থনীতির প্রকৃত উন্নয়ন অনুধাবন করা যায়।

রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনির আর একটি বক্তব্য হচ্ছে, বারাক ওবামার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম (আমেরিকানরা গ্যাস বলে) বেড়েছে যার কারণে মধ্যবিত্তদের বাৎসরিক প্রায় ৩ হাজার ডলার খরচ বেড়েছে। তার এ কথাটিও সত্য। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সেইন্ট লুইসে আমরা গ্যালন প্রতি সর্বনিম্ন প্রায় ২ ডলার দিয়ে ট্যাংক ফিল করেছি। বর্তমানে তেলের মূল্য ৩ ডলারের উপরে। এক্ষেত্রও তুলনাটি করা অন্যায়। কারণ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০০৮/২০০৯ সালে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে গিয়েছিল, যার কারণে ক্রুড অয়েলের মূল্য ব্যারেল প্রতি (আগষ্ট ২০০৮) ১১৪ ডলার থেকে প্রায় সর্বনিম্ন ৩৭ ডলারে (জানুয়ারি ২০০৯) নেমে এসেছিল। ৩৭ ডলার নি:সন্দেহে একটি অস্বাভাবিক দাম ছিল, যেটির সাথে বর্তমান ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৫ ডলার এর তুলনা করা যুক্তিহীন। বুশ প্রশাসনের (২০০৮ এর মাঝামাঝি) সময়ে প্রতি গ্যালন ৩.৫০ এর মত দিয়েও গাড়ির ট্যাংক ফিল করতে হয়েছে। অতএব, মুদ্রাস্ফীতির কথা হিসেব করলে, বর্তমান গ্যাসের দাম ২০০৮ এর তুলনায় অনেক ভাল।

রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনীতি ছাড়া পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রেসিডেন্ট ওবামা অনেক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইরাকের যুদ্ধ শেষ করা, ওসামা বিন লাদেনের পতন ঘটানো, লিবিয়াতে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করেও স্বৈরশাসক গাদ্দাফির পদনে ভূমিকা রাখা এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ তার অসামান্য দক্ষতারই প্রমাণ।

প্রেসিডেন্ট ওবামার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ গুণ হচ্ছে, তার সততা। তিনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওবামাকেয়ার পাশ করেছেন – ওবামাকেয়ারের ইফেক্টিভনেস একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। তিনি যেটি সঠিক মনে করেন সেটিই করেন এবং বলেন। অন্য রাজনীতিবিদদের মত ভিতরে এক বাইরে আর এক এ ধরনের মানুষ তিনি নন। পক্ষান্তরে, মিট রমনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন – অনেকটা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের মত। অহরহ মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সর্বশেষ, ওহাইয়োর অটো ইন্ডাষ্ট্রি নিয়ে কয়েক দফা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন মিট রমনি। তিনি বলেছেন, জিপ চীনে আউটসোর্সিং করছে (যেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, জিপ কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে তাদের বক্তব্যও দিয়েছে)। রাষ্ট্রপতির মত এমন গুরত্বপূর্ণ পদে সুবিধাবাদী ধরনের মানুষকে আমেরিকানরা নির্বাচিত করবে কিনা তা আর ২৪ ঘন্টার মধ্যেই জানা যাবে।

সর্বশেষ, গত কয়েকদিনের বিভিন্ন প্রচারিভাযানে মিট রমনি ও প্রেসিডেন্ট ওবামার বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছে, ওবামা যেন সরাসরি মানুষের সাথে কথা বলছেন, কোনো উচ্চাকাঙ্খী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না, সাধারন মানুষের মনের কথা বলছেন। অন্যদিকে, মিট রমনির বক্তব্য শুনে আমার মনে হচ্ছে, তিনি গদবাধা কিছু কথা বলে যাচ্ছেন – কথার মধ্যে কোনো আন্তরিকতা নেই। যাই হোক, ভোট শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি। আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে শুধু সংখ্যার বিচারে না দেখে, বরং প্রেসিডেন্ট ওবামা কোন বিভীষিকাময় অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে এসেছেন সেটি বিবেচনায় নিয়েই আমেরিকানরা তাঁকে পুর্ননির্বাচিত করবেন।

একটি শেষ কথা, আজ বাসায় ফিরে যখন টিভি দেখছি, আমার ছয় বছরের ছেলে আমার পাশে এসে বলল, “পাপা, আমি টেলিভিশনের ওই লোককে চিনি। ওর নাম মিট রমনি”। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কিভাবে জানলে”? সে বলল, তাদের ক্লাশে (কিন্ডারগার্টেন) তাদের শিক্ষক প্রেসিডেন্ট ওবামা ও মিট রমনির সমন্ধে বলেছে এবং আগামীকাল সকালে তারা ‘প্লে ভোট’ দেবে। আরও বললো, সে বারাক ওবামাকে ভোট দেবে। আমি আর জানতে চাইনি কেনো সে ওবামাকে ভোট দেবে। কাল নির্বাচনে আমার ছয় বছরের ছেলের ‘প্লে ভোট’ হয়ত কাউন্ট হবে না, তবে আমি চাই যেনো আমার ছেলের দলই বিজয়ী হয়! জয় হোক প্রেসিডেন্ট ওবামার! গুড লাক মি: প্রেসিডেন্ট!