ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

আগামীকাল অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ ও এই ব্যাপারে কম নয়। সত্যি কথা বলতে কি, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় বাংলাদেশের কিছু কিছু মানুষের আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারন ভোটারের চেয়েও অনেক বেশি। অফিস শেষে সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা) বাসায় ফিরে যখন অনলাইনে বাংলাদেশের পত্রিকা দেখছি, প্রতিটি বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকার প্রধান শিরোনামেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের খবর। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ও অনলাইন নিউজ মিডিয়াগুলো এই নির্বাচনের প্রচারাভিযানকে যে নিবিড়ভাবে ফলো করেছে, সেটি বাংলাদেশের মানুষের অদম্য কৌতুহলেরই প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের কি আসে যায় সে প্রসঙ্গ অন্য এক সময়ের জন্য থাকল, তবে গত কয়েকদিনে ফক্স নিউজ ও এমএনবিসির টক শো দেখে বাংলাদেশের নির্বাচনের কথা খুব মনে পড়ে গেল। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশের চেয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনেকভাবে এগিয়ে আছে, তবে রাজনীতিবিদদের কথার ঝুলি (সত্য এবং মিথ্যা) দিয়ে মানুষের মন ভোলানোর চেষ্টা, পক্ষপাতমূলক নির্বাচনী জরিপ এবং এজেন্ডা নিয়ে মিডিয়াতে ভোটারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টার বিষয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না।

রাজনীতিবিদদের কথা দিয়েই শুরু করি। প্রথম নির্বাচনী বিতর্কে বারাক ওবামা খুব একটা ভাল পারফর্ম করেননি একথা সরাসরি অস্বীকার না করে প্রেসিডেন্ট ওবামার চীফ স্ট্র্যাটেজিস্ট ডেভিড প্লাফি ওবামা কি কি পয়েন্টে ভাল করেছেন সেগুলোকে হাইলাইটস করলেন। এক্ষেত্রে তেমন কোনো আপত্তি নেই আমার। তবে দ্বিতীয় বিতর্কে বারাক ওবামা যে মিট রমনিকে পরাস্ত করেছেন সেটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মিট রমনির জয় দাবী করে বসলেন রমনির ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ম্যাট রোয়েড! নিজ দলের প্রার্থীর বিতর্কে পরাজয় কেউ স্বীকার করতে চাইবে না সেটিই স্বাভাবিক, কিন্তু নিজের প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা – এ যেন বাংলাদেশে সরকারী দলের: “জনগণ হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে” এবং বিরোধী দলের: “স্বত:স্ফূর্তভাবে জনগণ হরতাল পালন করে এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে” টাইপ মন্তব্য!

নির্বাচনী জরিপের কথা বলবেন! সেখানেও একই সমস্যা। জরিপের ফলাফল কাকে সমর্থন করবে সেটি নির্ভর করবে আপনি কোন প্রতিষ্ঠানের জরিপের ফলাফল দেখছেন। যেমন ধরুন, কিছু কিছু টেলিভিশন প্রোগ্রাম লাইভ শোতে টেক্সট ম্যাসেজের মাধ্যমে মতামত আহবান করে। আজ সন্ধ্যায় এবিসি চ্যানেলের একটি জরিপে দেখা গেল, ৯৬% দর্শক বিশ্বাস করে প্রেসিডেন্ট ওবামা পুর্ননির্বাচিত হবেন! এক্ষেত্রে বায়াসনেস (পক্ষপাতিত্ব) অবধারিত কারণ একটি টিভি চ্যানেলের কনস্যুমার সব ভোটার রিপ্রেজেন্ট করেনা বরং তাদের রুচি/পছন্দের মিল রয়েছে এবং এধরনের স্যাম্পলিং গ্রহনযোগ্য ও নয়। পেশাদার জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ও এধরনের (হয়ত এত এক্সট্রিম না) পক্ষপাতিত্বমূলক জরিপ করতে পারে। যেমন ধরুন, গ্যালাপের এক জরিপে কয়েক মাস আগে দেখিয়েছে ৭৭ শতাংশ বাংলাদেশী শেখ হাসিনার সরকারের কর্মকান্ডের সমর্থন করে! এটি কতখানি বিশ্বাসযোগ্য সেটি পাঠকই বিবেচনা করবেন, তবে সেই একই গ্যালাপ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের জনমত ও জরিপ করছে।

এবার মিডিয়ার কথায় আসি। আপনি যদি ফক্স নিউজ দেখেন, আপনার মনে হবে প্রেসিডেন্ট ওবামা অত্যন্ত ব্যর্থ এবং তার জয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। বিভিন্ন সভা সমাবেশে মিট রমনির জোরালো যুক্তি আর ওবামা কোথাও অসাবধনতাবশত কোনো ভুল উক্তি করে থাকলে সেগুলোকে সারাদিন হাইলাইটস করবে। শুধু কী তাই! নির্বাচনের একদিন আগেও নির্বাচন বিষয়ক খবরের ফাঁকে ফাঁকে লিবিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের মৃত্যু এবং ওবামা প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলতে থাকে! অন্যদিকে, আপনি যদি এমএসএনবিসি এর প্রোগ্রাম দেখেন, আপনার মনে হবে মিট রমনির মত মিথ্যাবাদী যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দ্বিতীয়টি আর নেই, আর ওবামার সাফল্যেরও শেষ নেই। দুইটি চ্যানেলই এমনভাবে প্রচার করছে যে, বিপরীত পক্ষ জিতলেই যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত একদম শেষ! এ যেনো, ওরা ক্ষমতায় এলে “দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে” আর ওরা এলে “দেশ ভারতের কাছে বিক্রি করে দেবে” টাইপ যুক্তি।

আবার রাজনীতিবিদদের কথায় ফিরে যাই। সুইং স্টেট হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা এবং ওহাইয়োতে আগাম ভোটিং নিয়ে এরই মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্রেটদের অভিযোগ, ফ্লোরিডা স্টেটের রিপাবলিকান ক্ষমতাসীনরা ডেমোক্র্যাট ভোটারদের অনুৎসাহিত করার জন্য আগাম ভোটের দিন ১৪ দিন থেকে কমিয়ে ৮ দিন করেছে। ৫ই নভেম্বরের ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা গেল যে, লম্বা লাইন দিয়ে ভোটাররা অপেক্ষা করছে – সর্বোচ্চ ৭ ঘন্টাও অপেক্ষা করতে হয়েছে কারও কারও। যেসব ভোটাররা লাইনে ছিলেন, তাদের বেশীরভাগই আফ্রিকান আমেরিকান (কৃষ্ণাঙ্গ) যারা অধিকাংশই ডেমোক্র্যাট। একই ধরনের অভিযোগ ওহাইয়োতেও। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ যেহেতু বারাক ওবামার ভোটারা নিম্ন আয়ের, নির্বাচনের দিন দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিতে গেলে তাদের কাজের ক্ষতি হবে (বাংলাদেশের মত যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের দিন সাধারণ ছুটি থাকে না) এবং আগাম ভোটের দিন কমানোর মাধ্যমে তারা প্রেসিডেন্ট ওবামার জয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এই অভিযোগ যদি সত্যি হয় (টিভিতে কালোদের লম্বা লাইন আমি দেখেছি), তাহলেতো বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের নির্বাচন প্রভাবিত করার রাজনীতির মতই হলো! আর যদি এ অভিযোগ ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনের ফলাফল বিপক্ষে গেলে ব্লেইম করার চেষ্টা হয় সেটিও তো সেই বাংলাদেশের মতই হলো!

শেষ করার আগে বলতে চাই, এত কিছুর পরেও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের গণতন্ত্র চর্চা আমাদের দেশের রাজনীতিকদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়ার মানসিকতা তাদের মধ্যে আছে এবং সংসদ (কংগ্রেস/সিনেট) বর্জন করার প্রচলন ও তাদের মাঝে নেই। ২০০৮ এর নির্বাচনের ফলাফল যখন আসতে শুরু করলো, ফলাফল অনুমান করতে পেরে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই সিনেটর জন ম্যাকেইন প্রেসিডেন্ট ওবামাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন এবং দেশের যেকোনো প্রয়োজনো প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ ও করেছিলেন।

দলীয় ব্যবধান থাকলেও গুরত্বপূর্ণ সময়ে পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তারা একযোগে কাজ করতে পারে – কয়েকদিন আগে স্যান্ডি মোকাবেলা করার সময়ে নিউ জার্সির রিপাবলিকান গভর্ণর ক্রিস্টোফার ক্রিস্টি ও প্রেসিডেন্ট ওবামার এক সাথে কাজ করা ও একে অপরের প্রশংসা করা দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নাই। এই ঘটনার প্রভাব নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের উপরে পড়বে, কিন্তু জাতীয় গুরত্বপূর্ণ সময়ে দলমত নির্বিশেষে একসাথে কাজ করাইতো প্রকৃত দেশপ্রমিকের কাজ! আমাদের দেশের রাজনীতিকরা যাতে (কমপক্ষে জাতীয় দূর্যোগের সময়ে) দেশপ্রেমিক হতে পারেন সেই প্রত্যাশাই করি।