ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার আজকের শীর্ষ খবর হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিচারপতি নিজামুল হকের পদত্যাগ। বাংলাদেশে যেখানে পদত্যাগের সংস্কৃতি নেই বললেই চলে, সেখানে যুদ্ধাপরাধের মত স্পর্শকাতর বিচারের দায়িত্বে থাকা একজন বিচারপতির পদত্যাগ নি:সন্দেহে একটি বড় খবর। সাধারনত: আমি অনলাইন পত্রিকা থেকে শুধু শিরোনামগুলো পড়ি এবং বাংলাদেশ সমন্ধে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বাকিটুকু অনুমান করে নেই। যেহেতু এই খবরটি অন্য দশটি খবরের চেয়ে আলাদা, তাই একটু আগ্রহ নিয়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এ সম্পর্কিত খবরগুলো পড়লাম এবং গুগলে সার্চ করে কথিত স্কাইপের অডিও রেকর্ডিংটগুলোও শুনলাম।

বেলজিয়াম প্রবাসী আইনজীবি আহমেদ জিয়াউদ্দিন এবং বিচারপতি নিজামুল হকের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে স্কাইপের মাধ্যমে সংঘটিত তিনটি সংলাপ শুনে যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় টেম্পারিং এর কোনো অকাট্য নমুনা খুঁজে পাইনি, তবে বিচারপতি সাহেব যেভাবে মনোযোগী ছাত্রের ভূমিকায় একজন প্রবাসী আইনজীবির উপদেশ গ্রহণ করলেন, সেটি মোটেই শোভনীয় নয়। তাছাড়া বক্তব্য থেকে এটিও প্রতীয়মান হয় যে, বিচারপতি নিজামুল হক আইনজীবি আহমেদ জিয়াউদ্দিনের দেয়া টেম্পলেট এবং স্ট্রাকচার ব্যবহার করে রায় দেয়ার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রায়ের স্ট্রাকচার ঠিক করার পরে আনুসঙ্গিক যুক্তি, সাক্ষ্য প্রমাণ বা প্রযোয্য আইন নিয়ে আলোচনা এবং সর্বশেষ বিচারের রায় ওভারঅল স্ট্রাকচারের সাথে মিল রেখে দেয়া হতো বলেই ধারণা করছি। সেক্ষেত্রে, এই রায়ে বিচারপতির নিজস্ব মতামতের প্রতিফলন কতখানি ঘটত সেটি নিয়ে সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক। আর যদি ধরেও নেই যে, উনি শুধু স্ট্র্যাকচার এবং টেম্পলেটের ব্যপারে জ্ঞান অর্জনের জন্যই বন্ধুর সাহায্য নিতে চাইছিলেন, কিন্তু বিচারাধীন মামলা নিয়ে অন্য কারও সাথো আলোচনা করা নিশ্চয়ই ন্যায়সম্মত নয় (সংবিধান সম্মত কিনা আমার জানা নেই)। আর বিচারকের যোগ্যতা, নিষ্ঠা ও সততা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তার দেয়া রায় নি:সন্দেহেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।

বলাই বাহুল্য, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে সরকারী ও বিরোধী দলের মধ্যে যথারীতি বাকবিতণ্ডা শুরু হয়ে গিয়েছে এবং এ নিয়ে রাজনীতিও চলতে থাকবে। তবে দলীয়করণ ও রাজনীতিকরণের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দায় প্রধান দুদলের কেউই যে এড়াতে পারবেন না, সে ব্যাপারে দেশের সাধারন মানুষের মনে কোনো সন্দেহ আছে বলে মনে করি না। কে জানে দেশে কতজন বিচারক আছেন যারা দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ পেয়েছেন এবং যারা নিজের মত করে রায় না লিখে অন্যের দেয়া টেম্পলেট বা স্ট্র্যাকচার ব্যবহার করেন! দু:খ ও আশংকার বিষয় হচ্ছে, মাননীয় বিচারকগণের ব্যাপারে কোনো কথা বললেই আবার আদালত অবমাননার অভিযোগের খড়গ নেমে আসে। তবে ওই বিচারাদেশ বা কারণ দর্শানের নোটিশগুলো তাদের নিজেদের ফর্ম্যাটে, নিজেদের হাতে লেখা কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া কিন্তু কঠিন।

যাই হোক, বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপে আলোচনা নিয়ে স্ক্যান্ডালের সত্যতা বা এ ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা, সেটি সময় হলেই জানা যাবে ( যদিও বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, এর কোনো গ্রহণযোগ্য তদন্ত হবে না)। তবে, আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, আমাদের বেশিরভাগ বিচারপতিগণই যোগ্য ও সৎ এবং সরকার অনতিবিলম্বে একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সৎ বিচারপতিকে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেবে যাতে করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বিলম্বিত না হয়।

অডিও – ১
অডিও – ২
অডিও – ৩