ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

স্কুলের শিক্ষার্থীদের চোখ বন্ধ করে বের করে আনা হচ্ছে যাতে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাশের বীভৎস দৃশ্য না দেখে

আজ শুক্রবার সকালে কানেকটিকাটের নিউটাউনের স্যান্ডি হুক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটে গেল এক নির্মম ট্র্যাজেডি – ক্লাশ চলাকালীন সময়ে এক উম্মাদ যুবক দুইটি হ্যান্ডগান নিয়ে স্কুলে ঢুকে ২০ জন নিষ্পাপ, তরতাজা শিশু সহ মোট ২৮ জনের প্রাণ কেড়ে নিল। এই শিশুদের বেশিরভাগই ছিল কিন্ডারগার্টেনের ছাত্র। খবরে প্রকাশ, কিন্ডারগার্টেনের ওই ক্লাশের শিক্ষক ছিলেন, উম্মাদ খুনীর মা। ধারণা করা হচ্ছে, মায়ের উপর কোনো কারণে ক্ষোভ থেকে সে তার ক্লাশে গিয়ে এই বর্বরতা চালায়। যাদের সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা এই নির্মমতার শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতি জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। এই খুনের মোটিভ কি বা কে দায়ী সেটি আলোচনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে, আমার ছয় বছরের সন্তান যে আমেরিকাতে কিন্ডারগার্টেনে যায়, তার নিরাপত্তার ভাবনা আমাকে আতংকিত করে।

যারা বাংলাদেশে থাকেন, তাদের অনেকেরই ধারণা, নিরাপত্তার অভয়ারণ্য হচ্ছে আমেরিকা ও উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো। অন্য দেশের কথা আমি জানি না, তবে আমেরিকাকে আমি আমার শিশুর জন্য মোটেই নিরাপদ ভাবতে পারিনা। গত কয়েক বছরে কিছু উম্মাদ পশুর বর্বরতায় আমেরিকায় প্রাণ দিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এই বছরের কথাই বলি না কেনো, আমেরিকায় কমপক্ষে চারটি ঘটনায় উম্মাদ খুনীরা এককভাবে গণহত্যা করেছে (কমপক্ষে চারজন বা তার চেয়ে বেশি) – মে মাসে সিয়াটলে কফিশপে ৫ জন, জুলাই মাসে কলোরাডোতে মুভি থিয়েটারে ১২ জন, আগস্ট মাসে উইসকনসিনে শিখদের মন্দিরে ৭ জন এবং সর্বশেষ আজ কানেকটিকাটের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও এ বছরই গোলাগুলিতে প্রাণ হারানোর আরও অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। আর ২০০৭ এর ভার্জিনিয়া টেক এর এর হত্যাকাণ্ডে ৩৩ জন ছাত্রের প্রাণ হারানোর দগদগে স্মৃতিতো রয়েছেই।

বাংলাদেশে যারা বাস করেন তারা নিশ্চয়ই বাংলাদেশে নিজেদের ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। আর চিন্তিত না হবার কি কোনে কারণ আছে? সাগর-রুনি তাদের বেডরুমে নিরাপদ নয়, পরাগ তার মায়ের কোলো নিরাপদ নয় আর আমজনতার যে কেউ যেকোনো দিন বিশ্বজিৎ হয়ে যাবার ভয় তো রয়েছেই। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা, হরতাল/ধর্মঘট সহ নানবিধ সমস্যা এবং অর্থনৈতিক সুবিধার অভাবে আমেরিকার ভিসা হাতে পেলে তাই আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা কোথায় নিরাপদ? আমেরিকাতে উম্মাদ মানুষের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমারতো মনে হয় প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশই বেশি নিরাপদ!

বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অভাবের বিষয়টি প্রশ্নাতীত। চুরি, ডাকাতি ও সম্পত্তি সহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিরোধে খুনখারাবি পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই হয়। তবে বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতার একটি অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এই বিচ্ছিন্ন অপরাধসমূহের পাশাপাশি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড/বর্বরতা। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আবার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে – তবে বেশিরভাগ সময়ই এর শিকার হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা বা কর্মীগণ। যদিও বিশ্বজিৎদের মতো সাধারণ মানুষও তথাকথিত ওই রাজনৈতিক দলের নরপশুদের নৃশংসতার শিকার হন প্রায়ই।

বাংলাদেশ সমন্ধে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, রাজনৈতিক যেসব অপরাধ আমাদেরকে শংকিত করে তোলে, সেগুলো কিন্তু বেশিরভাগই প্রেডিক্টেবল। হরতালের দিনে, (সম্প্রতি প্রচলিত) হরতালের আগের দিন সন্ধ্যায়, অবরোধে কিংবা দুই দলের মহাসমাবেশ চলাকালীন সময়ে যে সহিংসতা হয়, সেগুলো নি:সন্দেহে নিন্দনীয় এবং অনাকাঙ্খিত। তবে, যেহেতু এই রাজনৈতিক (?) কর্মসূচি যেহেতু আগে থেকেই ঘোষনা করা হয়, তাই এই নৃশংসতাগুলো প্রেডিক্টেবল। দয়া করে ভুল বুঝবেন না, শুধু আর্গুমেন্টের খাতিরে বলছি, আমরা যদি ওই বিশেষ সময়ে ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারি, তাহলে কিন্তু নিজেকে নিরাপদ রাখা অনেকটা সম্ভব।

অন্যদিকে আমেরিকায় কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা ‘জ্বালাও’ ‘পোড়াও’ ধরনের রাজনীতি না থাকলেও এখানে রয়েছে অসংখ্য উম্মাদের সমারোহ। হঠাৎ কারও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, ওমনি অস্ত্র হাতে নিয়ে এলোপাতাড়ি গোলাগুলি শুরু! অন্যকেও মারবে, নিজেও মরবে ! এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনার পরিসংখ্যান আগেই উল্লেখ করেছি। উম্মাদনাতো আর প্রেডিক্ট করা যায় না। মুভি দেখতে গেলেন, হঠাৎ একজনের মাথা গরম হয়ে গেল! ব্যস! কয়েক রাউন্ড ছুঁড়ে দিল – ফলাফল আর কী! নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। গ্যাস স্টেশন, শপিং মল, কফি শপ, ইউনিভার্সিটি, এলেমেন্টারি স্কুল কোথাও জীবনের নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশের বিরোধী দলতো আগে থেকেই বলে দেয়, ওমুক দিন গাড়ি বের করবেন না, তাই আমরা জানি গাড়ি বের করলে গাড়িতে আগুন আর নিজে বের হলে বিশ্বজিৎ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বলা নেই কওয়া নেই, ট্রেনে আপনার পাশে বসা ভদ্রলোক যে হঠাৎ অস্ত্র উচু করে বিনা কারণে গুলি ছুড়বে এমন ঘটনা কিন্তু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

কানেক্টিকাটের ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘটনায় ফিরে আসি। স্কুলে শিক্ষকের তত্বাবধানে শিক্ষারত নিষ্পাপ শিশুদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করার খবরে বিচলিত হবেন না এমন পিতামাতা কি কোথাও আছে? স্যান্ডি হুক স্কুলের হতাহতের খবরে, আমার ছেলেদের স্কুলে মেইন গেইট লক করে রেখেছিল কিছুক্ষণ। প্রিন্সিপলসহ অনেক শিক্ষকের চোখেই পানি। টিভির খবরে দেখলাম, খোদ প্রেসিডেন্ট ওবামাও তার চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি এই নৃশংস ঘটনা সমন্ধে কথা বলতে গিয়ে। যেসব পরিবার সন্তান হারিয়েছেন তারা তো বটেই, পাশাপাশি যেসব ভাগ্যবানরা সন্তানদের ফেরত পেয়েছেন, তারা সবাই অপূরনীয় ক্ষতির শিকার হয়েছেন। যেসব শিশুরা তাদের চোখের সামনে তাদের প্রিয় বন্ধুদেরকে গুলি খেয়ে মৃত্যূর বুকে ঢলে যেতে দেখেছে, তারা যে মানসিক আঘাত পেয়েছে, সেটি বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। ভাবলে শিউরে উঠি, কানেক্টিকাটের ওই স্কুলের ঘটনা যদি আমার ছেলের স্কুলে হতো তাহলে কী হতো! পরম করুনাময় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারদের ঘুরে দাড়ানোর শক্তি দিন এই প্রার্থনা করি।

সবশেষে বলতে চাই, বিপদ যদি হয় অনুমানযোগ্য, তাহলে প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু হঠাৎ কোনো উম্মাদের মস্তিস্ক বিকৃতি ঘটলে তার আক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা কিন্তু ভাগ্যদেবীর সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। স্কুলে গেলে ভয়, শপিং মলে গেলে ভয়, মুভি দেখতে গেলে ভয়, তাহলে কী সারাক্ষণ ঘরেই বন্দি হয়ে থাকতে হবে? এরচেয়ে তো বোধহয় বাংলাদেশে মাঝে মধ্যে দুই একবার হরতাল আর অবরোধের দিন ঘরে বন্দী থাকাই ভাল। মাঝে মাঝে মনে হয়, আনপ্রেডিক্টেবল আমেরিকার চেয়ে প্রেডিক্টেবল বাংলাদেশই বেশি নিরাপদ।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে আগের লেখা