ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

আজকাল অনেকেই যেকোনো বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র অথবা উন্নত বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সাথে তুলনা করে অতি সহজেই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন। অনেক ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা এধরনের দেশের কোনো অনিয়মের কথা তুলে এই একই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনিয়মকে বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টা করেন। উন্নত দেশের সাথে তুলনা করায় দোষের কিছু নেই। বরং যথাযথ তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনেক সময়ই অনেক কিছু শেখা যায় এবং নিজেদের ভুলত্রুটি সংশোধন করে উন্নতিসাধন করা যায়। তবে পরিতাপের ব্যাপার হচ্ছে আমাদের দেশের অনেক প্রথিতযশা কলাম লেখকগণও অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ বিশ্লেষণ/গবেষণা না করেই কলাম লিখে তাদের মতামত সাধারণ পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেন। এমনই একটি উদাহরণ নিয়ে আজ কিছু কথা পাঠকের উদ্দেশ্য তুলে ধরতে চাই।

গত ১ জুলাই, ২০১৪ দৈনিক প্রথম আলোর মতামত বিভাগের একটি লেখা (দেশে দেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রতারণা, আবদুল মান্নান) আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। লেখাটিতে দেশের একটি স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আব্দুল মান্নান যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু অনিয়মের অভিযোগ করে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের অনিয়ম, দূর্নীতি এবং প্রতারণাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লেখার শুরুতেই বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তিনি লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্র মুনাফা লাভের জন্য টোফেল,জিআরই, জিম্যাট, স্যাট সহ বিভিন্ন ‘পরীক্ষার পসরা সাজিয়ে সারা দুনিয়ার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার তুলে নিত। এই পরীক্ষায় পাস করা ছিল সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তির পূর্বশর্ত। এখন এসবের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয় না।’

তার এ বক্তব্যের মধ্যে দুটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতে চাই। প্রথমত, তিনি বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির পূর্বশর্ত এই স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষাগুলো শুধুই বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রযোজ্য। তিনি সারা দুনিয়ার ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘কোটি কোটি ডলার’ তুলে নেয়ার বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শুধুমাত্র টোফেল ছাড়া বাকি সবগুলো টেস্ট বিদেশী ছাত্রদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্যও প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা সমন্ধে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য স্যাট (SAT) অথবা এসিটি (ACT) এবং গ্রাজুয়েট পর্যায়ে পড়াশোনা করার জন্য জিআরই (GRE), ব্যবসা শিক্ষার জন্য জিম্যাট (GMAT), আইন শিক্ষার জন্য এল স্যাট (LSAT), এবং চিকিৎসাক্ষেত্রের জন্য এমক্যাট (MCAT) পরীক্ষার স্কোর আবশ্যক। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শুধু স্কোরই যথেষ্ট নয়, পাঠক্রমের বাইরে শিক্ষার্থীদের অর্জন এবং শিক্ষকদের সুপারিশপত্র (letter of recommendation) ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মূল কথা হচ্ছে এসব নিয়মাবলী দেশী-বিদেশী সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। অধিকন্তু, স্ট্যান্ডার্ডাইজ টেস্টের অনেক সুবিধাও রয়েছে। দেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সমক্ষেত্রে পড়াশোনা করার জন্য প্রাসঙ্গিক স্ট্যান্ডার্ডাইজ টেস্টটি শুধু একবার দিয়েই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করতে পারে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের প্রচলিত ভর্তি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়ে এবং আলাদা আলাদা ফি ও দিতে হয়। এছাড়াও একই দিনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা সংঘটিত হওয়া এবং বিভিন্ন শহরে যাওয়ার বিড়ম্বনার কথাতো রয়েছেই। তাই আমি বলব স্ট্যান্ডার্ডাইজ টেস্টের মাধ্যমে ‘সারা দুনিয়ার’ অন্যান্য দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগটি নিতান্তই অমূলক।

দ্বিতীয়ত, তিনি লিখেছেন ওপরে উল্লেখিত টেস্টগুলো আগে ভর্তির পূর্ব শর্ত ছিল তবে এখন আর এসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এ শিথিলতার খবর তিনি কোথায় পেলেন তা আমার বোধগম্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রে আন্ডারগ্রাজুয়েট এবং গ্রাজুয়েট পর্যায়ে পড়াশোনা করার সুবাদে এদেশের ভর্তি সিস্টেম সমন্ধে যতটুকু জানি, কোনো অ্যাক্রেডিটেড বিশ্ববিদ্যালয়েই এসব টেস্টের ভ্যালিড স্কোর ছাড়া আবেদন গৃহীত হয়না। যেকেউ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়েই ভর্তির প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে দেখতে পারেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে লেখকের এই মন্তব্য মনগড়া ছাড়া কিছুই না।

সাবেক এই উপাচার্য আরো লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দেশীয় এক এজেন্ট নাকি বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয়ে ঘাটতি থাকলেও তাতে সমস্যা নেই। ওই এজেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। এখানে আমি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দোষের কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা জানি বাংলাদেশের বিভিন্ন এজেন্টরা দেশের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মন ভোলানো বিজ্ঞাপন দিয়ে অনেক সময়ই প্রতারণা করে থাকে। এপ্রসঙ্গে নিজের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসার আগে একবার ‘বিএসবি’র বিজ্ঞাপন দেখে তাদের গুলশানে অবস্থিত অফিসে গিয়েছিলাম। তারা বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি তাদের অফিসে বসে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি সাক্ষাতকার দিচ্ছেন। কৌতুহলবশত ওই প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাতকার করতে গিয়ে দেখলাম, একজন প্রবাসী বাঙালি যিনি সঠিক ইংরেজিও বলতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি (?) যদি শুদ্ধ (grammatecially correct) ইংরেজিই বলতে না পারেন, তাহলে সে সম্পর্কে সন্দিহান না হয়ে আর উপায় থাকেনা।

যাই হোক, ফিরে আসি দেশীয় এজেন্টের বিজ্ঞাপন নিয়ে লেখা মন্তব্যে। তিনি লিখেছেন, বিজ্ঞাপনে উল্লেখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘প্রায় সবই প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়’। আলোচিত এই বিজ্ঞাপনটি আমি দেখিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রিক্রুট করার জন্য বাংলাদেশে এজেন্ট নিয়োগ দেবে সেটি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতার হার অত্যন্ত কম (শীর্ষ স্থানীয় ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি আবেদনকারীই ভর্তির সুযোগ পায়না)। তাই আমার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির উল্লেখিত বিজ্ঞাপন দেখে, ঐসব বিশ্ববিদ্যালয় সমন্ধে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই তাদেরকে প্রথম সারির বলে আখ্যায়িত করে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে তাচ্ছিল্য করেছেন এবং এর সাথে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমাহীন দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ভর্তি-বাণিজ্য, রাজনীতিকরণের তুলনা করেছেন।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত এই কলামে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নাম বিহীন সার্টিফিকেট-সর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কথা বলেছেন। তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে এসব অদৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘ব্রিফকেস বিশ্ববিদ্যালয়’ বলা হয়। তিনি এও লিখেছেন যে, এধরনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টাকার বিনিময়ে অর্জিত শ খানেক পিএইচডিধারী বাংলাদেশে রয়েছে। সত্যি বলতে কি, তার এ মন্তব্যের বিপক্ষে আমার কোনো বক্তব্য নেই। বরং এ ব্যাপারে একটি মজার অভিজ্ঞতার কথা বলে নিই। কয়েক বছর আগে অনলাইনে বাংলা পত্রিকায় রাজউকের এক ঊর্ধতন কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন সমন্ধে একটি নিউজ দেখলাম। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আমি আগে কখনোই শুনিনি। কৌতুহলবশত গুগলে সার্চ করে জানলাম ক্যালিফোর্নিয়াতে এমন একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেটি একটি নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে নামমাত্র রিসার্চ পেপারের মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রী প্রদান করে। বলাই বাহুল্য, এসব নামধারী সার্টিফিকেট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্য অ্যাক্রেডিশন নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয় টাকার বিনিময়ে ন্যূনতম অ্যাকাডেমিক অর্জনের পরেও পিএইচডি এর মতো ডিগ্রী দিয়ে নি:সন্দেহে অন্যায় করে। তবে নামের সাথে পিএইচডি টাইটেল নেয়ার লোভে যারা টাকা খরচ করেন, তারা এসব বিশ্ববিদ্যালয় (?) দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন এমনটি বলা যাবে কি? বরং নামের সাথে পিএইচডি যোগ করে এরাই কি সাধারন মানুষের সাথে প্রতারণা করছেন না?

শেষ করার আগে বলতে চাই, কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হলেও মতামত প্রকাশ করার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা/পড়াশোনা করে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা উচিত। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য যখন অন্য একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সমন্ধে না জেনে, মনগড়া তথ্য দিয়ে দেশের প্রথম শ্রেণীর দৈনিক পত্রিকায় কলাম লেখেন এবং প্রত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক কলামে উল্লেখিত তথ্যের বিচার বিশ্লেষণ না করে সেটি ছেপেও দেন, সেটি কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দূরাবস্থা এবং গণমাধ্যমেরও দেউলিয়াত্বই প্রমাণ করে।

slide