ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য আর শেষ হলো না। মাথা ঘামাবার আগেই মাথা ঝিম ঝিম করছে। জন্ম মৃত্যু নিয়ে মিসির আলী কখনোই খুব একটা ভাবেনি। আজ প্রথমবার তার অস্তিত্বের সুতোয় টান পড়লো। যা অমোঘ তা তো হবেই। আমাদের প্রিয় কথা সাহিত্যিক ও নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নালিল্লাহি রাজিউন।

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এই লেখক হুমায়ূন আহমেদের বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনা জেলায় জন্ম হয়েছিল তার। বৃহদন্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যান হুমায়ূন আহমেদ। দুই পর্বে মোট ১২টি কেমো থেরাপি নেওয়ার পর গত ১২ জুন বেলভ্যু হাসপাতালে আমাদের প্রিয় কথা সাহিত্যিক ও নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের দেহে অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর বাসায় বাসায় ফিরলেও অবস্থার অবনতি ঘটলে পুনরায় বেলভ্যু হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে।

হুমায়ূন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই লেখালেখি শুরু করেন এবং নন্দিত নরকে তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশে কাটতির শীর্ষে থাকা এই ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি ছিলেন ‘বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টা।

হিমুর পিতার কঠিন আদেশ ছিল, মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হইয়ো না! পা ভাঙ্গা কুকুরটাকে পাউরুটি খাওয়াতে খাওয়াতে আজ তার চোখে জল গড়িয়ে পড়ছে। রুপার জন্য কখনো এতো মায়ার টান অনুভব করেনি। আজ হুমায়ূন আহমেদ নামক ব্যক্তির জন্য যে রকম অনুভব করছে।

যাও পাখি বল, হাওয়া ছল ছল
আবছায়া চশমার কাঁচ,
আমরা কি হারিয়েছি
মিসির আলী, হিমুদের আনাচ কানাচ।

অন্ধকার কোনে জ্বলে জোনাকি
জোছনায় হারিয়েছি সোনা কি?
মনের আকাশে, তোমার লেখা শুধুই
কখার মেঘ।
আকাশ তুমি চেপে রাখো
আমার এ ব্যাথার আবেগ।

চারটি উপন্যাস লিখেই ১৯৮১ পান বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পান হুমায়ূন আহমেদ। সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের জীবনের নিস্পন্দ রোমান্টিকতাকে নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন তার প্রধানত সংলাপনির্ভর উপন্যাসমালায়। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সস্তা চতুর্থ শ্রেণীর লেখকদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন’। হুমায়ূন আহমেদ এর দুই শতাধিক উপন্যাসের ভেতর ‘শ্রেষ্ঠ’গুলোকে আলাদা করা কঠিন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত তার লেখা জনপ্রিয় ধারাবাহিকের ভেতর রয়েছে ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’ ইত্যাদি। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ঘটনাপ্রবাহ দর্শকদের এতটাই আলোড়িত করেছিলো যে তারা নায়কের ট্র্যাজিক পরিণতি মানতে না পেরে রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি জায়গায় বিক্ষোভ পর্যন্ত করে।

সত্যি জানালা খুলে আজ রুপা জোছনা দেখছে। আজকে চশমা খোলার পর শুভ্র ভাবছে, আজ তার মত যেন কেউ জোছনা দেখতে না পরে। আজ রুপার শেষ জোছনা দেখা। আজ শুভ্র কাঁদবে, জরির হাত ধরে কাঁদবে। মিসির আলী, হিমু, রুপা, শুভ্র, জরি, নীলু, ধানমন্ডি থানার ওসি, মাজেদা খালা, পা ভাঙ্গা আগামাসি লেনের কুকুরটা, আজকে সবাই জোছনাতে ভিজতে ভিজতে কাঁদবে।

আজকে তাদের শেষ জোছনা দেখা। আজকের পর “কোথাও কেউ নেই”! কেউ তাদের খুজে পাবে না।

পড়ন্ত বিকেলে
ছেড়া কাগজের টুকরো গুলো
বাতাসে ওড়ে।
ওরে হিমু, মিসির আলী
তোরা হুমায়ূনের সযত্নে লেখা আবেগী পংক্তি
মাজেদা খালাদের শৈল্পিক কাহিনীচিত্র উড়তেই থাকবে
পুনঃ স্ববস্থানে ফেরার নেই কোন সম্ভাবনা।

হিমু হারিয়েছে বাউরি বাতাস
হুমায়ূন বিনে ‘লু হাওয়ার কাছে।
মিসির আলী হারিয়ে গেছে
ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্দ বৈরি বাতাসে।

জানালা খুলেছে রুপা, জোছনা দেখবে
হারিয়ে গেছে জোছনা আজ
চির গহীন আমবস্যাতে।

আজ শুভ্র কাদছে,
জরির নরম হাত ধরে,
নেই নেই কি যেন নেই।
নেই কিছু ধরাতলে।

মনকে আবার ফেরাবো কি করে
পুর্নিমা রাতের জোছনার কাছে?