ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি, প্রতিদিন জাতীয় সত্ত্বার এই মিষ্টি মধুর জাতীয় সংগীত গেয়ে আমাদের সন্তানদের প্রতিদিনের শুভ সকাল হয়। দুই বাংলার মহা কবি, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আজ ৭১তম মহা প্রয়ান দিবস। ‘কে বলে ‘যাও যাও’—আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া।’ সত্যিই তাই। কে বলে রবীন্দ্রনাথ চলে গেছেন আমাদের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ—সবকিছুই যার সুরে, যার ছন্দে দোলায়িত সারাক্ষণ তিনি চলে গেছেন—কে বলবে! জাগতিক নিয়মে শুধু তার নশ্বর দেহটা মিলিয়ে গেছে বাংলার জল হাওয়ায়। ভারতের কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে ২৫শে বৈশাখ, ১২৬৮— ২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ জন্ম নেয়া এ জমিদারপুত্র বাংলা সাহিত্যের সব শাখাতেই সফল বিচরণ করেছেন। প্রেম, প্রকৃতি আর জীবনের প্রতি বাঙালির বোধকে রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার পরশে বর্ণময় ও বহুমাত্রিকতায় ভরে দিয়ে গেছেন।

তার লেখা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ সর্বকালের সেরা সঙ্গীত হিসেবে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত অর্থাৎ দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সবকটি শাখাকে স্পর্শ করেছে, সমৃদ্ধ করেছে জাদুয় ছোঁয়ার মতই। তার লেখা গান বাঙালির হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয় আজো। আনন্দে, বেদনায় এমনকি দ্রোহে এখনও রবীন্দ্রনাথ বাঙালির প্রেরণার উত্স। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মন-মানসিকতা গঠনের, চেতনার উন্মেষের প্রধান অবলম্বন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালির নয় বাংলাদেশ ও ভারত দুইদেশের সহ সারা বিশ্বের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব বাঙালির কাছেই তিনি মানবমুক্তির বারতা নিয়ে উদ্ভাসিত। গতবছর ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী। এই সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীকে স্মরণ করে রাখতে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে বছরব্যাপী তাঁর জন্মদিন পালনে নানা ধরনের আয়োজন করেছিল। দুইদেশের মানুষের সম্পর্কে সেতুবন্ধন রচনায় রবীন্দ্রনাথ দেখে দিয়েছেন নতুনতর মহিমায়। গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি এবং এশীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি ‘গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ’ রূপে। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ওই উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

কলকাতায় জন্ম নিলেও পৈতৃক জমিদারি দেখভালের জন্য রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে এসেছেন বহুবার। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরের জমিদার বাড়ি আজও তার স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। রবীন্দ্রনাথের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়েছিল কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে। তার পরের কয়েক বছর তিনি পড়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠিত নর্মাল স্কুলে। সেখানেই তার বাংলা শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়। সবশেষে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল সেন্ট জেভিয়ার্সে। অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে তার স্কুলে পড়া শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। তিনি গৃহশিক্ষকের কাছে সংস্কৃত, ইংরেজি, পদার্থবিদ্যা, গণিত, ইতিহাস, ভূগোলসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। পাশাপাশি ড্রয়িং, সঙ্গীত শিক্ষাও ছিল। ১৮৭৪ সালে রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৮৭৮ সালে তিনি ইংল্যান্ড যান। উদ্দেশ্য ব্যারিস্টারি পড়া। তবে সেটি আর হয়ে ওঠেনি।

দেড় বছর সেখানে অবস্থান শেষে দেশে ফিরে রচনা করেন গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি প্রতিভা’। ১৮৮২ সালে তিনি ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ ও ১৮৮৩ সালে ‘প্রভাতসঙ্গীত’ রচনা করেন। এ দুটোই কবিতাগ্রন্থ। তার গ্রন্থের মধ্যে ‘শেষের কবিতা’ বহুল পঠিত উপন্যাস। সোনার তরী, মানসী, চিত্রা, চৈতালী, চোখের বালি, নৌকাডুবি, গোরা, চিত্রাঙ্গদা, শ্যামা, নটরাজ, সভ্যতার সঙ্কট ইত্যাদি গ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। তার সাহিত্যকর্ম বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও পঠিত হচ্ছে। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করেন মৃণালিনী দেবী চৌধুরানীকে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের খুলনার বেণীমাধব রায় চৌধুরীর মেয়ে।

ঢাকার বাইরে রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশে স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, নওগাঁর পতিসর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, খুলনার দক্ষিণ ডিহি ও চট্টগ্রামে পালন করা হবে বিভিন্ন কর্মসূচি। বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ আর ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৬ মে (বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিবর্তনে এখন বাংলাদেশে ৮ মে) রবীন্দ্রনাথের জন্ম। ১৯৪১ সালে তিনি জোড়াসাঁকোর বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।

কবিগুরুর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সারাদেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ২২শে শ্রাবণ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলের আয়োজনে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকছে নাটক, টকশো, কবিতা আবৃত্তি, সঙ্গীতানুষ্ঠান, প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ইত্যাদি। তবে পবিত্র রমজান মাসের কারণে অনুষ্ঠানমালাগুলো কিছুটা অনাড়ম্বর হবে। তবে ঈদের শেষে নানা আয়োজনে এই দিনটি পালিত করবে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

কে বলে তুমি নেই,
তুমি আছ আমার আত্মার ভিতরে,
আমার প্রতিটি স্বত্ত্বায়
আজো তোমার বিচরণ।

আমি বৃষ্টির পানিতে
জোছনা রাতে,
কিংবা হিমেল প্রভাতে
যতটা মুগ্ধ না হই,
তোমার শেষের কবিতা
আমাকে আজো ঘুরে ফিরে খোজে।

তুমি শুধু কবি নও
নওতো মহা কবি,
বাঙালির হৃদয়ে আঁকা
প্রেরনার তুমি ছবি।

তোমার গল্প, আর গান
ছুয়ে যায় পাঠক-শ্রোতার প্রান,
তাইতো তোমার
মহা প্রয়ান দিবসে
সব বাঙালি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়
গেয়ে যায় তোমার গান।