ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

মানুষ কেন বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ভালবাসে? – প্রশ্নটির উত্তরে আমি এক শব্দে বলব উপযোগিতা বা ইউটিলিটি। প্রকৃতপক্ষে মানুষ কাউকে ভালবাসে শুধুই উপযোগিতা পাওয়ার জন্য। উপযোগিতাগুলো নানান ধরনের হতে পারে। তবে প্রথম ও প্রধান উপযোগিতা হল যৌনতা। একজন স্বাভাবিক যৌনাচারি মানুষ অবশ্যই তার বিপরীত লিঙ্গেরই প্রেমে পড়ে, সমলিঙ্গের নয়। অপরদিকে সমকামী পুরুষ বা নারী কিন্তু সমলিঙ্গের প্রতিই আকৃষ্ট হয়। এখান থেকে স্বচ্ছভাবেই বোঝা যায় যে, প্রেমের চূড়ান্ত গন্তব্য হল যৌনতা যা প্রেমের প্রধান উপযোগিতা।

আধুনিক মানুষ কেবলই যৌনাচারি নয়। তার বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা ও সৃজনশীলতা তাকে অন্যান্য প্রাণী হতে পৃথক করেছে। নব্য প্রস্তর যুগ হতে সামাজিক মানুষ জীবনকে বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে জটিল থেকে জটিলতর করছে। এরই কারণে তাকে নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে অস্তিত্বকে যথাসম্ভব রঙিন করে তোলার চেষ্টায় মত্ত থাকতে হয়। আর এ বিরামহীন পথচলায় তার প্রয়োজন হয় সঙ্গীর। তথাপি মানুষ সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় আত্নীয়-স্বজন, বন্ধুবরকে। কিন্তু, তার এমন একজন সঙ্গীর অভাবোধ থাকে যার মাধ্যমে সে চূড়ান্ত পারস্পারিক সহযোগিতা ও সহমর্মীতার আশ্বাস পাবে। যে মানুষটি সুখে-দুখে এবং প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহে তার পাশে থাকবে স্বীয় ছায়ার মত।

মানুষের অবচেতন মন প্রতিটি মুহূর্তে এমন কাউকেই খুঁজে বেড়ায়। সঙ্গীর সাথে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ‘সিরিয়াস’ চিন্তা প্রথম দেখা দেয় কৈশোরে। তৃষিত মন খুব সহজেই তখন কাউকে খুঁজে নেয়। মন তখন খরতাপে ফেটে পড়া চৌচির মাঠ। একফোঁটা পানির ভীষণ আকাঙ্ক্ষা। আর সে সময়ই কেউ একজন তার জীবনে আষাঢ়ের বর্ষণ হয়ে অবিরাম জলধারায় তাকে সিক্ত করে দেয়। বেশিরভাগ সময়ই এ বয়সে যাকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা হয়, দেখা যায় সেই নির্বাচিত ব্যাক্তিটি তার সামাজিক ও ব্যাক্তিগত অবস্থানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অতুলনীয়। তবু মন তারই প্রতি নিবদ্ধ থাকে এবং তাকেই ভালবাসে।

কৈশোরের ভালবাসার একটি গতানুগতিক ও স্বাভাবিক পরিণতি হল বিচ্ছেদ। কারণ, বেশিরভাগ সময়ই অভিবাবকেরা অপরিণত সন্তানের নির্বাচনকে নির্বুদ্ধিতা হিসেবেই দেখে এবং সন্তানের দ্বারা তাদের নিজস্ব রুচিবোধ বাস্তবায়নের অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানহীন কিশোর/কিশোরী বিচ্ছেদে কেবল এক বুক যাতনাই ধারণ করে। কারণ, সঙ্গীকে স্বীকৃতি দানের মত কোন অবস্থান তার থাকে না যার উপর নির্ভর করে সে অভিভাবকদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে পারবে।

বিচ্ছেদের আরেকটি স্বাভাবিক কারণ হল অধিকতর উপযোগিতা প্রাপ্তি। পূর্বেই বলেছি, মন সর্বদা সর্বোচ্চ উপযোগিতা পেতে চায়। তাই বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে অধিকতর উপযোগিতাসম্পন্ন সঙ্গী পেলে মন মোহাবিষ্ট হয় নতুনের প্রতি। প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে পড়ে পল্কা কাঁচের মত।

এবার আসি উপযোগিতার কথায়। সঙ্গীর থেকে কি কি উপযোগিতা প্রাপ্তি হয়। প্রথমত; প্রধান ও চূড়ান্ত প্রাপ্তি শারীরিক সান্নিধ্য যা সম্পর্কের শুরুতে অধরা থেকে গেলেও এটাই চূড়ান্ত অভিলাষ। সঙ্গীর থেকে অন্যান্য উপযোগিতার মধ্যে রয়েছে শেয়ারিং,কেয়ারিং,নার্সারিং, এবং সর্বোপরি মায়া মমতার প্রাপ্তি। একজন মানুষ এমন একজন ব্যাক্তিকেই সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করতে চায় যার সাথে তার দৈনন্দিন আচার-আচারন, জীবন পদ্ধতি ও মনের চাওয়া পাওয়াগুলোর মিল রয়েছে। সে চায় তার সঙ্গী তাকে সর্বদা টেক কেয়ার করুক। সর্বোপরি তাকে মায়ার বাঁধনে আটকে রাখুক। এই মমত্ববোধ, এই উপযোগিতা প্রাপ্তি-এরই নাম তো ভালবাসা!

তাহলে প্রশ্ন আসে, ভালবাসা কি শুধুই প্রাপ্তির ব্যাপার? উত্তরে বলব-হ্যা । কারণ, আপনি যাকে ভালবাসেন তার প্রতিও একই আচরণ করেন। সেই আকাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিটির জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন, নিজের অনেক প্রয়োজন জলাঞ্জলি দিয়ে তার মনোবাসনা পূরণে সদা সচেষ্ট থাকেন। তার এক টুকরো তৃপ্ত চাহনির জন্য বুভুক্ষের মত তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু, কেন আপনার এত ত্যাগ,এত আয়োজন? কারণ, আপনি তাকে তৃপ্ত করতে চান। আর তাকে তৃপ্ত করে আপনি যে সুখানুভূতি লাভ করেন তা-ও এক প্রকার উপযোগিতা প্রাপ্তি। আপনি তাকে ভালবাসেন-কারন, তাকে ভালবাসার মাধ্যমে আপনি স্বীয় মনকে তৃপ্ত করেন!

এ ব্যাপারে জীবন থেকে নেওয়া একটি ঘটনা বলি। কৈশোরে আর দশজন কিশোরের মত আমারও একজন কিশোরের ভালবাসা স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই একাকী বেড়ে ওঠা সেই কিশোরটির মধ্যে এক ধরনের একাকীত্ব বিরাজ করত। মেয়ে সংক্রান্ত ব্যাপারে তার খানিকটা নাক সিটকানো ভাব ছিল। প্রেম,ভালবাসা ব্যাপারগুলো ছিল তার চোখে ন্যাকামি। অথচ বয়সকালে তারুন্যের প্রথমার্ধে সেই কিশোর এক কিশোরীর গভীর ভালবাসায় নিজেকে বিলীন করে দিল। কিশোরীটির উদাত্ত আহবানে সাড়া দিয়ে সে মত্ত হল কল্পবিলাসে। প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতাসম্পন্ন বালকটি আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করে শুরু করল একটি সুখী আটপৌরে সংসার জীবনের স্বপ্ন দেখা ! তার সমস্ত চিন্তা-চেতনা আবিষ্ট হতে থাকল শুধুমাত্র সঙ্গিনীকে ঘিরে।

নিয়তির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ অনুযায়ী অপরিণত বয়সের এই প্রেম স্বীকৃতি পেল না। সমস্ত সত্তা উজার করে ভালবাসা কিশোরটি সঙ্গিনীর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারল না। ‘নিজেকে উজার করে; ভালবাসার অমূল্যায়ন বাকিটা জীবন তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ফলে, মেয়েদের প্রতি সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং মেয়েদেরকে ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। মেয়েদের প্রতি এক ধরণের ঘৃণা ক্রমেই তার মনে দানা বাঁধতে থাকে।

একই রকম ঘটনা ঘটে থেকে কিশোরীদের ক্ষেত্রেও। প্রেম,ভালবাসাকে তখন এরা নতুনভাবে নিতে শুরু করে। আবেগ মুল্যহীন-ব্যাপারটিকে প্রথমবারের মত উপলব্ধি করতে শুরু করে। জটিলতায় পরিপূর্ণ সামাজিক বিধি-নিষেধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রেম-ভালবাসাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে শুরু করে।

এত কিছুর পরও এরা আবার প্রেমের কাঙাল হয়। কারণ একটাই-উপযোগিতা প্রাপ্তি। সঙ্গিহীন কিছুদিন পথচলার পর উপযোগিতার ঘাটতি এদের মনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। ব্যাথিত মন আবারো কারো ভালবাসা চায়,কাউকে ভালবাসতে চায়।

ভালবাসার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হেতু এরা নতুন স্টাইলে ভালবাসাবাসি শুরু করে। যে ভালবাসায় সিরিয়াসনেস হয় ম্রিয়মান, ঘাটতি থাকে পারস্পারিক বিশ্বাসের। বিশ্বাস ও সিরিয়াসনেসের ঘাটতির দরুন নতুন সঙ্গীর প্রতি তার আন্তরিকতা কখনোই আগের মত হয় না। তবুও কেন কাউকে ভালবাসা? হ্যাঁ,মন তবুও আবার কাউকে ভালবাসে। কারণ, সে নতুনের মাঝে প্রথম ভালবাসার ছায়া খুঁজে নেয়। এক কথায় বলা যায় এটা প্রথম ভালবাসার রিপ্লেসমেন্ট বা প্রক্সি।

কেউ কেউ আবার হারানো ভালবাসায় এতটাই হৃদয়াহত হয় যে দীর্ঘকাল আর অমুখো হয় না। বিরহ বেদনাকে সঙ্গী করে দীর্ঘকাল একাই পথ পাড়ি দেয়। কেউবা বিশ্বাসঘাতকতায় এতটাই ভীত ও মর্মাহত হয়ে পড়ে যে দ্বিতীয়বারের মত আর বেলতলায় যেতে চায় না। ভালবাসার নাম শুনলেই সে জলাতঙ্ক রোগীর মত শিউড়ে ওঠে।

ভালবাসাবাসি করে এক পর্যায়ে সময় আসে থিতু হওয়ার। সময় আসে জীবনের চূড়ান্ত সঙ্গী নির্বাচনের। এ পর্যায়ে কেউ কেউ ‘পারিবারিক বিয়ে’ নামক এক মান্ধাতা পদ্ধতিকে বেছে নিয়ে অচেনা এক মানুষের সাথে ঘর বাঁধতে চায়। যে মানুষটির মনের চেয়ে সে গুরুত্বারোপ করে সে মানুষটির সামাজিক,ব্যাক্তিগত ও অর্থনৈতিক স্ট্যাটাসকে এবং তার সাথে সে মানুষটির ‘স্যুইটিবিলিটি’ কে।

কেউ কেউ আবার শেষবারের মত একজনকে খুঁজতে থাকে যে কিনা তার সাথে লম্বা পথ পাড়ি দিবে। এক্ষেত্রেও মানুষ মন ও মননের চেয়ে গুরুত্বারোপ করে উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর। এ সময় সৃষ্ট কোন ব্যাক্তির ভালবাসা আসলে কোন ভালবাসাই নয়, শুধুই সঙ্গী নির্বাচন মাত্র!

সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ সংসারি মানুষ তার সাংসারিক জীবনকে এগিয়ে নিতে থাকে। ‘সেটেল্ড ম্যারেজ’ বা ‘লাভ ম্যারেজ’ – দু’টির যে কোনটির মাধ্যমেই হোক না কেন, অনেকেই সঙ্গীর প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। এর পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে উপযোগহীনতা ও ভুল সঙ্গী নির্বাচন। সেই মুহূর্তে অনেকে আবারো ভালবাসা খুঁজে ফিরে অন্য কারো মাঝে। নিজেকে জড়িয়ে ফেলে পরকীয়ায়।

আমৃত্যু মানুষ ভালবাসা খুঁজে ফিরে ভিখিরির মত। মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্তেও সে জানতে পারে না, কে ছিল তার সত্যিকারের ভালবাসা আর সে-ই বা কার ভালবাসা ছিল!

লেখনী ও লেখনীর স্বত্বাধিকার : মুনকির নাঈম সানি
সৃজিত হয়েছে : ১৪ অক্টোবর ২০১০
*লেখকের অনুমতি ব্যতীত লেখার কোন প্রকার অংশ গ্রহণ এবং প্রকাশ করা যাবে না ।

লেখকের অন্যান্য পোস্ট :
#দু মুহূর্তের অনুভূতি (ছোট গল্প )
#জীবন কড়চা (নিবন্ধ)
#ভালবাসায় ঠগবাজি এবং প্রাচ্য ভাবনা (নিবন্ধ)
#কিছু অমর সাহিত্যকর্ম