ক্যাটেগরিঃ কৃষি

মহিলাদের কর্মসংস্থান : মহিলাদের কর্মসংস্থানের জন্য মাশরুম চাষ অনন্য। গৃহবধূ থেকে শুরু করে চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণী ও বয়সের মহিলারা পারিবারিক সব কাজকর্ম সেরে, সন্তান লালন পালন করে, পর্দা রক্ষা করে, মাশরুম চাষ করতে পারেন এবং সংসারের জন্য কিছু বাড়তি আয় করতে পারেন।

মাশরুম হলো একটি অসবুজ সবজি বা ব্যাসিডিওমাইসিটিস বা অ্যাসকোমাইসিটিস শ্রেণীর ছত্রাকের খাবার উপযোগী ফলনৱ অঙ্গ (Fruiting)। বাংলাদেশে এ ফসলটি অপ্রচরিত ও নতুন হলেও আসলে এটি অতি পুরাতন ফসল। পবিত্র কুরআন শরিফের সূরা আল বাকারায় ৫৭নং আয়াতে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ খাবার হিসেবে যে মান্নার কথা উল্লেখ রয়েছে মাশরুম আসলে সেই মান্না। ঋকবেদে উল্লিখিত সোমরস যা দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো তা ছিল আসলে মাশরুমের নির্যাস। প্রাচীনকালে গ্রিস, রোম ও চীনে মাশরুম ব্যবহারের বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। বর্তমানে বিশ্বে সব দেশেই মাশরুম একটি সমাদৃত খাবার।

মাশরুমের পুষ্টিগুণ : মাশরুম অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি খাবার। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন (৩০%)। এ প্রোটিনে আছে মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব এমাইনো এসিড। যার জন্য এ প্রোটিনটি প্রাণিজ প্রোটিনের মতো একটি সম্পূর্ণ প্রোটিন। কিন্তু প্রাণিজ প্রোটিনের মতো এতে কোলস্টেরল না থাকায় এবং ফ্যাট কম থাকায় মাশরুমের প্রোটিন হলো নির্দোষ, সমপূর্ণ প্রোটিন যা সব বয়সের মানুষের জন্য এবং রোগীদের জন্য আদর্শ খাবার। মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই২, নায়াসিন, ফলিক এসিড যার মাত্রা যথাক্রমে ১.৮-৫.১, ৩১-৬৫ ও ০.৩০-০.৬৪ মি. গ্রাম/১০০ গ্রাম। মাশরুম মিনারেলসের ও একটি ভালো উৎস। এতে পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও কপারের পরিমাণ যথাক্রমে ২৬.৭-৪৭.৩ গ্রাম, ৮.৭-১৩.৯ গ্রাম, ৪৭-৯২ মি. গ্রাম ও ৫.২-৩৫ মি. গ্রাম/কেজি (শুকনো ভিত্তিতে) যা মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ভিটামিন এবং সব মিনারেলসের জোগান দিতে পারে (Dutta, ২০০৭)।

পরিবেশ ও মাশরুম : মাশরুম চাষ করার জন্য কোন কীটনাশক, রোগনাশক এমন কি কোনো রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। এ ফসলটি চাষ করার জন্য প্রয়োজন হয় ফেলনা কৃষিজ বা বনজ বর্জ্য যেমন- ধানের খড়, গমের খড়, আখের ছোবা, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি যা যত্রতত্র পড়ে থেকে পরিবেশকে দূষিত করে। এসব ফেলনা বর্জ্য ব্যবহার করে পাওয়া যায় পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ওষুধি গুণসম্পন্ন খাবার মাশরুম। তাই এ ফসলটি চাষ করা পরিবেশবান্ধব কাজ।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও মাশরুম : বাংলাদেশে ২০০৩৪-২৬০৩৮ আংশের মধ্যে অবস্থিত। ঋতুভেদে এদেশের তাপমাত্রা ১৩ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সে.-এর বিদ্যমান থাকে যা অধিকাংশ নামিদামি মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সমপূর্ণ নিয়ন্ত্রিত Total Control) পরিবেশে মাশরুম চাষ করা হয় যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিন্তু আমাদের দেশে আংশিক নিয়ন্ত্রিত (Semi-control) পরিবেশে সারা বছর এসব মাশরুম চাষ করা যায় যাতে উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়।

কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতা ও মাশরুম চাষ : বাংলাদেশে মাশরুম উৎপাদনের কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে- ধানের খড়, গমের খড়, কাঠের গুঁড়া, আখের ছোবা, ফেলনা কাগজ, বিভিন্ন ঘাস ইত্যাদি। এর মধ্যে শুধু ধান ও গমের খড়ের কথাই যদি বিবেচনায় আনা হয় তাহলেই দেখা যায় যে, এ দেশে প্রতি বছর অনন্ত ৩.০ কোটি মেট্রিক টন ধান ও গমের খড় উৎপন্ন হয়। এর যদি এক দশমাংশও মাশরুম চাষে ব্যয় করা যায় তাহলে ৩০ লাখ মে. টন মাশরুম উৎপাদন সম্ভব। তাছাড়া আখের ছোবা, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি ব্যবহার করেও বিপুল পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন সম্ভব।

বাংলাদেশের জনসম্পদ ও মাশরুম : বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব বেশি। এ দেশে প্রতিবর্গ কিলোমিটারে ৯৫৩ জন মানুষ বাস করে (২০০৭)। এসব মানুষকে উৎপাদনমুখী কাজে নিয়োগ করার ক্ষেত্রের খুব অভাব। সে ক্ষেত্রে মাশরুম চাষ কর্মের দিগন্ত উন্মোচন করে দিতে পারে। কারণ মাশরুম চাষ একটি শ্রবঘন (Labour intensive) কাজ। এখানে অল্প জায়গায় অধিক লোকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। তাছাড়া এ দেশে বসবাসকারী অন্তত ২.৫ কোটি পরিবারের কিছু না কিছু জায়গা পড়ে আছে যেখানে কোনো ফসল বা যা কোনো কাজে আসে না। সেখানে অনায়াসে মাশরুম চাষ করা যায়।

শিল্প হিসেবে মাশরুম : মাশরুম একটি সুস্বাদু, পুষ্টিকর ও ওষুধিগুণ সম্পন্ন সবজি হওয়া এর চাহিদা বিশ্বের সবদেশেই রয়েছে। মাশরুম যদি এ দেশে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় তাহলে এটি হবে এমন এক শিল্প যা কোনো কাঁচামালই বিদেশে থেকে আমদানি করার প্রয়োজন হবে না অথচ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মাশরুম রফতানি সম্ভব হবে। কারণ বিশ্বের সব দেশেই এখন মাশরুম একটি জনপ্রিয় খাবার কিন্তু সে দেশের উৎপাদন খরচ আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

মাশরুম চাষের বিশেষ সুবিধা : মাশরুম চাষ করার জন্য কোনো উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না। বসতঘরের পাশে, গাছের নিচে, যেখানে সূর্যালোক পড়ে না বিধায় কোনো ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না, সেখানে মাশরুম চাষ করা যায়। মাশরুম তাকে তাকে বহুস্তরে চাষ করা যায় বিধায় এক টুকরো জমিতে বহুগুণে বৃদ্ধি করে ব্যবহার করা যায়, যা বিশ্বের আর কোনো ফসল দিয়ে সম্ভব হয় না। মাশরুম একটি দ্রত উৎপাদনশীল ফসল। অতি অল্প সময়ের মধ্যে উৎপাদিত হয় বিধায় উৎপাদনকারীর পুঁজি অল্প সময়ের মধ্যে ফিরে আসে। স্পন প্যাকেট (বীজ) কেটে দেয়ার পর ৬-৭ দিনেই ফসল চলে আসে। মাশরুম চাষ অনেকটা ঝুঁকি মুক্ত। ঘরের মধ্যে চাষ করা যায় বিধায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে খরা, বন্যা, শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি মাশরুমের কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

মাশরুম উপজাতের বিকল্প ব্যবহার : মাশরুমের উপজাত কৃষি উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালন করে। মাশরুমের স্পেন্ট সাবস্ট্রেট দিয়ে উন্নতমানের কম্পোস্ট তৈরি করা যায়। ধানের খড় মাশরুম উৎপাদনে ব্যবহার করা হলেও গোখাদ্য হিসেবে এর মান মোটেই নষ্ট হয় না বরং বেড়ে যায়। মাশরুম চাষের পর পড়ে থাকা খড় গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে এসব প্রাণির স্বাস্থ্য ভালো এবং উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে যায়। পরবর্তীতে এসব প্রাণির মলমূত্র থেকে কম্পোস্ট বিশেষ করে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে কৃষি জমিতে ব্যবহার করা যায়।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ কেন্দ্র সাভার ঢাকা অথবা দেশের বিভিন্ন সাব সেন্টারের সাথে যোগাযোগের জন্য পরামর্শ দেয়া হলো।

সুত্র: এখানে ক্লিক করুন

বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন: মাশরুম বিডি.কম (এখানে ক্লিক)