ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

পদ্মা সেতু লইয়া সরকারের কর্তা ব্যাক্তিরা যে বেসামাল হইয়া পড়িয়াছেন, তা কি লক্ষ্য করিয়াছেন? আমাদের নেতাজি কিন্তু আজকাল বিশ্বব্যাংকের মালকিন বনিয়া যাওয়ার সিড়ির শেষ মাথায় অবস্থান করিতেছেন। ‌নেতাজি (সুভাষ বসু নন) বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে যা বলেছেন তা একনজরে দেখিয়া নেওয়া যাইতে পারে।

তিনি বলিয়াছেন-
বিশ্বব্যাংককে দেখিয়া নেওয়া হইবে।
বিশ্বব্যাংককে জবাবদিহি করিতে হইবে।
তাহাদের অডিট রিপোর্ট জমা দিতে হইবে।
বিশ্বব্যাংক নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত। বিশ্বব্যাংকই দুর্নীতিবাজ, মহাদুর্নীতিবাজ।

বিশ্বব্যাংক দুর্নীতিবাজ কি না, সেইটা দেখিবার দায়িত্ব নেতাজি যেন নিজ স্কন্ধে স্বেচ্ছায় তুলিয়া নিয়েছেন। যদিও তিনি বাংলাদেশের মতো ঋণনির্ভর দারিদ্র্যপীড়িত দেশের প্রধানমন্ত্রী। নেতাজি হয়তো মনে করিয়াছেন- এটিও একটি গ্রামীণ ব্যাংক। ইচ্ছা করিলে তিনি বিশ্বব্যাংকের পেসিডেন্টকে যেকোনো মুহূর্তে কলমের এক খোঁচায় নোবেল লরিয়েটের মতো বাহির করিয়া দিতে পারিবেন। নেতাজির এসব কর্মকান্ডের পরিণাম কী হইতে পারে, অথবা এর ফলে বিশ্বের অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী রূপ দাঁড়াইতে পারে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট কোনো ধারণা আছে বলিয়া কিন্তু মনে হইতেছে না।

তবে আশার কথা হইলো- ‌এই পদ্মা সেতুর বিষয়ে অন্যান্য ইস্যুর মতো করিয়া সমগ্র দেশে শেয়ালের হুক্কা হুয়া ধ্বনির রব ওঠেনি। সাধারণত দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী সত্য-মিথ্যা যাহাই বলুন না কেন টেকনাফ হইতে তেঁতুলিয়া ব্যাপিয়া সবাই শতমুখে সেই কথার প্রতিধ্বনি ফুটাইতে থাকেন। এই যাত্রায়ই তাহার কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেল। এমনকি যেসব মন্ত্রী-নেতা তাদের বিভিন্ন মুখরোচক মন্তব্য করিবার জন্য বিশেষভাবে কুখ্যাতি অর্জন করিয়াছেন, তাহারাও বলিতে গেলে চুপ মারিয়া গিয়েছেন।

দুর্নীতির দায়ে মন্ত্রণালয় হারানো উজিরে খামাখাও কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। তিনি বলিয়াছেন- এডিবি, আইডিবি ও জাইকাকে সঙ্গে লইয়া নিজস্ব অর্থায়নে কালভার্ট তৈরি করা হইবে। আমরা সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখিতে চাই। অন্য দিকে রাবিশ খ্যাত আমাদের মাল প্রথম দিকে বলিয়াছিলেন, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই পদ্মা সেতুর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে ফয়সালা হইয়ে যাইবে। তারপর বলিলেন, পদ্মা সেতু ঋণ বিষয়ে বিশ্বব্যাংককে আর কোনো অনুরোধ করা হইবে না। ইদানিং তিনি বলিয়াছেন, বিশ্বব্যাংকের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রহিয়াছে, শিগগিরই তাদের ভুল বুঝতে পারিবে এবং অর্থায়ন চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করিবে। বিশ্বব্যাংকের কাছে ধরনা দেয়া হবে না মর্মে ঘোষণা দেওয়ার মাত্রক ছয় ঘণ্টা পরই জেলা প্রশাসক সম্মেলন থেকে বাহির হইয়া তিনি তিনি সাংবাদিকদের বলিলেন, ‘পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের বিষয় বিশ্বব্যাংককে আর অনুরোধ করা হইবে না এটা ঠিক নহে, আমরা এর পুনর্বিবেচনা চাহি।’ বুঝা যাইতেছে অন্য কোনো পন্থায় হইলেও বিশ্বব্যাংকের হাতে-পায়ে ধরা অদ্যবদি অব্যাহত রহিয়াছে।

এ দিকে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অবশ্য কখনো বলেননি যে, বিশ্বব্যাংককে একহাত নিয়ে নেবেন। তিনি বলেছেন, পুরনো গল্পই ‘এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে সিদ্ধান্ত হয়েছে তবে মালয়েশিয়াকে এখনো না বলা হয়নি। এ ছাড়া চীন থেকে প্রস্তাব এসেছে। সেগুলো বিবেচনা করা হবে।’ তার অর্থ তিনি স্পষ্টই বোঝেন, এই প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে করা সম্ভব নয়।

বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ায় সরকারের মন্ত্রীরা নতুন এক কল্প ফাঁদতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, দুর্নীতির প্রমাণ দিতে না পারলে বিশ্বব্যাংকের অর্থ সরকার নেবেই না। সরকার যোগাযোগ করতে শুরু করে মালয়েশিয়ার সাথে। মালয়েশিয়ার সরকারের অবকাঠামো বিষয়ক উপদেষ্টা সামি ভ্যলুকে দফায় দফায় দাওয়াত দিয়ে ঢাকায় এনে সরকার জানায়, আর কোনো চিন্তা নেই। পদ্মা সেতুর সব অর্থ মালয়েশিয়া দেবে। এ দেশের মানুষকে বোকা বানানোর জন্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মালয়েশিয়ায় গিয়ে স্মারক ও সমঝোতা কাগজ সই করে আসেন। সেটাকে আরো আশাপ্রদ করে তোলার জন্য এমওইউ স্বারের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাকের সাথে টেলিফোনে কথা বলেন।
অন্যদিকে যোগাযোগ মন্ত্রীর মালয়েশিয়া আর চীনা অর্থায়নের ঢোল কবেই ফাটিয়া গিয়েছে।
যে দুর্নীতি লইয়া এতো কিছু হইলো সেটার কিন্তু কোনো কূলকিনারা হইলো না।

[বিশেষ দ্রষ্ট্রব্য : নেতাজি শব্দটি ব্লগার ‘সত্য কথক’ এর লেখা থেকে ধার করিয়াছি।]