ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

কৌশল-দুই
বন্ধুদের কখনই খুব বেশি বিশ্বাস করবেন না, শক্রদের কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটা শিখুন: বন্ধুদের থেকে সাবধানে থাকুন-তাঁরা আপনার সঙ্গে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। তাঁরা নষ্ট এবং অত্যাচারীও হয়। কিন্তু পূর্ব শত্রুকে কাজে লাগান। যেহেতু তাঁকে কাজ দেখাতে হবে তিনি বন্ধুর থেকে বেশি অনুগতও হবেন। আসল কথা, আপনাকে শত্রুর চেয়ে বন্ধুকে বেশি ভয় করতে হবে। যদি কোনো শত্রু না থাকে, তৈরি করুন। আপনার যখন দরকার তখন আপনি বন্ধুদেরই কাজে নিযুক্ত করুন। দুনিয়াটা একটা কঠিন জায়গা এবং বন্ধুরা সেটাকে অনেকটা সহনশীল করে। তারপর আপনি তাঁদের জানেন। যখন কোনো বন্ধু হাতের কাছে আছেন তখন কেউ অজানা লোকের ওপর নির্ভর করতে চায় না। সমস্যা হচ্ছে, প্রায়শই দেখা যায়, আপনি আপনার বন্ধুকে যতটা জানেন মনে করেন, বাস্তবে ততটা জানেন না। তর্ক এড়াতে বন্ধুরা প্রায়শই অনেক ব্যাপারে একমত হয়ে যান। একে অপরকে আঘাত না করার জন্য নিজেদের খারাপ গুণগুলো ঢেকে রাখেন। তারা একে অপরের রসিকতায় কষ্ট করে হলেও হাসে। যেহেতু সততা খুব কম সময়ই বন্ধুত্বকে শক্ত করে সেহেতু আপনি কখনও জানতে পারবেন না, বন্ধু সত্যিকার কীরকম ভাবে। বন্ধুরা আপনার কবিতা পছন্দ করেন, গানের প্রশংসা করেন, আপনার পোশাকের রঙ পছন্দ করার হিংসে করেন। হতে পারে তাঁরা সত্যিই করেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই তা করেন না। যখন আপনি কোনো বন্ধুকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন তখন আপনি আস্তে আস্তে তাঁরা যে গুণাবলি গোপন রেখেছিলেন সেগুলো জানতে পারেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, আপনার দয়ার্দ্র ব্যবহার সবকিছুকে ভারসাম্যহীন করে তোলে। মানুষ ভাবতে চায়, তাঁরা তাঁদের ভালো অবস্থার যোগ্য। অনুগ্রহ পাওয়া অতি পীড়াদায়ক হতে পারে; এটার অর্থ বন্ধু বলে আপনাকে নেওয়া হয়েছে, যোগ্য বলে নাও হতে পারে। বন্ধুকে কাজে লাগানোর মধ্যে সর্বদা একটা পৃষ্ঠপোষকতার ভাব থাকে যা তাঁদের গোপনে খোঁচায়। বন্ধুকে কাজে লাগানোর সমস্যা হচ্ছে, তা অনিবার্যভাবে আপনার মতাকে সীমিত করে। যদিও দতা এবং পারঙ্গমতা বন্ধুত্বের অনুভূতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যে বন্ধুকে কাজে লাগানো হয় তিনি খুব কম ক্ষেত্রেই আপনাকে সাহায্য করার পক্ষে যোগ্যতম লোক। কাজের পরিস্থিতি মানুষে মানুষে এক ধরনের দূরত্ব দাবী করে। আপনার উদ্দেশ্য কাজ, বন্ধুত্ব করা নয়। বন্ধুত্ব (যথাযথ বা অযথাযথ) এটাকে অস্পষ্ট করে। কাজেই সব অবস্থায় কে আপনার স্বার্থ সবথেকে ভালোভাবে রা করতে সমর্থ সেটা বিচার করার সামর্থ্যই ক্ষমতার চাবিকাঠি।

শত্রু দ্বারা উপকৃত হওয়া : তাঁর এক শত্রুর সঙ্গে কথা বলার সময় রাজা হিযেরাকে বলা হলো যে তাঁর নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ। রাজা মনে কষ্ট পেলেন। বাড়িতে ফিরেই রানিকে প্রশ্ন করলেন যে, ‘তুমি এ কথাটা আমাকে বলনি কেন?” রানি খুবই সাধাসিধে, সতীসাধ্বী মহিলা ছিলেন। তিনি বললেন, “মহারাজ, আমি ভেবেছিলাম, সব পুরুষের মুখের গন্ধই ওরকম হয়।” এ থেকে পরিষ্কার যে, আমাদের ছোটো বড়ো যেসব কুখ্যাত দোষ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায় সেগুলো বন্ধু ও পরিচিত জনদের থেকে শত্রুদের কাছ থেকে তাড়াতাড়ি জানতে পারি। অন্যদিকে আপনার শত্রুরা অব্যবহৃত স্বর্ণখনি। আপনাকে তাঁদের ব্যবহার করতে শিখতে হবে। ১৮০৭ সালে নেপোলিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ট্যালের্যাঁ যখন সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁর ওপরওয়ালা ফ্রান্সকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সময় এসেছে তখন তিনি সম্রাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার বিপদের কথা বুঝেছিলেন। তাঁর একজন বন্ধুর দরকার ছিল, একটা গাঁটছড়া এই পরিকল্পনায় তিনি কার ওপর আস্থা রাখতে পারেন? তিনি তার সবথেকে ঘৃণিত শত্রু গোপন পুলিশ বাহিনীর প্রধান, এমনকি যিনি তাঁকে হত্যা করার পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন, সেই ফৌচেকে পছন্দ করেছিলেন। তিনি জানতেন যে, তাঁদের পূর্ব শত্রুতা তাঁদের পুনর্মিলনের আবহ তৈরিতে সাহায্য করবে। তিনি জানতেন যে ফৌচে তাঁর থেকে কিছুই প্রত্যাশা করে না এবং ট্যালর্যাঁ যে যোগ্য লোককেই পছন্দ করেছেন সেটা প্রমাণ করার জন্য তিনি কাজ করবেন। যে মানুষ কিছু করে দেখাতে চায় তিনি আপনার জন্য পাহাড় সরাতে পারে। সবথেকে বড়ো কথা, তিনি জানতেন যে, ফৌচের সঙ্গে তার সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বারা কলুষিত হবে না। নির্বাচনটা ছিল উত্তম। যদিও ষড়যন্ত্রকারীরা নেপোলিয়নকে সরাতে পারেননি, শক্তিশালী এবং আপাত অসম্ভব সহযোগীর মিলিত হওয়া এই ব্যাপারটার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে সম্রাটের বিরোধিতা আস্তে আস্তে বিস্তারলাভ করতে শুরু করে এবং তখন থেকে ট্যালের্যাঁ এবং ফৌচের মধ্যে একটা বিশ্বস্ত কাজের সম্পর্ক ছিল। যখনই সম্ভব, পুরোনো শত্রুর সঙ্গে শত্রুতা মিটিয়ে তাকে নিজের কাজে ব্যবহার করতে শুরু করুন। শত্রুর উপস্থিতি যেন আপনাকে বিহ্বল বা বিপন্ন না করে। আপনার প্রকৃত শত্রু কে সেটা না জানার থেকে দুয়েকজন ঘোষিত বিরোধী থাকা ভালো। ক্ষমতাবান লোক বিরোধকে স্বাগত জানান, শত্রুকে নিজের সুনাম ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করেন, যাতে করে অনিশ্চয়তার সময়ে তাঁর ওপর নির্ভর করা যায়, এমনটা প্রচারিত হয়ে পড়ে।

উপমা: কৃতঘ্নতার চোয়াল। সিংহের মুখে আঙুল দিলে কী হবে সেটা জানেন বলে তার থেকে দূরে থাকেন। বন্ধুদের ব্যাপারে এই সাবধানতা থাকে না এবং যদি আপনি তাঁদের কাজে লাগান, তাঁরা কৃতঘ্নতার সঙ্গে আপনাকে শেষ করে ফেলবে।

মহাজনবাণী: নিজের স্বার্থে কীভাবে শত্রুকে ব্যবহার করতে হয়, তা শিখুন। আপনি কখনই তরবারির ফলা ধরতে যাবেন না। গেলে আহত হবেন। হাতল ধরুন। যাতে তরবারিকে নিজের রায় ব্যবহার করতে পারেন। একজন মূর্খ তাঁর বন্ধুর দ্বারা যতটা উপকৃত হয় একজন বুদ্ধিমান তাঁর শত্র“র দ্বারা তার থেকে বেশি উপকৃত হয়।

(বাপ্টসর গ্রেসিয়ান, ১৬০১-১৬৫৮)

মানুষ উপকারের চেয়ে অপকারের প্রতিদান বেশি করে দিতে ভালোবাসে। কারণ কৃতজ্ঞতা বোঝার মতো, প্রতিশোধ সুখকর। (টাসিটাস, আনুমানিক ৫৫-১২০ খ্রি.)। চলবে…

***
আত্ম-উন্নয়ন: সফল হতে হলে পর্ব-১