ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এ বিকেল ৪টা তিরিশ মিনিটে পাক হানাদার বাহীনি ঢাকার তৎকালিন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান তথা আজকের সরোয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বহিনীর নিকট আত্মসমর্পন করেছিল। এই আত্মসমর্পনের ঘটনাটি নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক আজও রয়ে গেছে। রয়ে গেছে কিছু অসত্য প্রচার। যারা আসলে বাংলাদেশের জন্ম মেনে নিতে পাওে নাই তেমন অপশক্তি কিন্তু আজও বাংলাদেশে সক্রিয়। যদিও হয়ত তাদেও বিষ অনেকটাই ক্ষয়ে আসছে বর্তমানে দেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সক্রিয় সচেতনতায়। এর পরেও সুযোগ পেলেই এ্ই শক্তি বাংলাদেশের আত্মসমর্পনটিকে ভারতের চক্রান্ত হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়। ব্যাপারটির জন্য অনেকাংশে বাংলাদেশের রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় নিতীনির্ধারকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। ১৯৭১ এ পকিস্থান হ্নাাদার বাহীনি ও বাংলাদেশ ভারত যৌথ বাহিনীর ভেতওে যে ঐ তিহাসিক আত্মসমর্পনের দলিল সাক্ষরিত হয়েছিল সেই দলিলের কোন কপি আজও বাংলাদেশের সংগ্রহে নেই। আমাদের যতদূর জানা আছে তাতে বলা যায় এই এতিহাসিক দলিলটির আসল অনুলিপি কেবল মাত্র দুটো এবং এর একটি রয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের৯কোলকাতার ফোার্ট উইলিয়ামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জিম্মায়) কাছে এবং অপর কপিটি ভারত বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর তৎকালীন সর্বাধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে। দীর্ঘ ৪০ বছরেও বাংলাদেশ এ দলিলের কপিটি নিজেদের সংগ্রহে আনতে সক্ষম হয় নাই। এটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটি গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই বলা যায়।

এই লেখাটি ন্যানো নিউজে লেখার আগে আগে এ সম্পর্কে ছোট্ট একটি ইতিহাস জুড়ে দিতে পারি। কদিন আগে ন্যানো নিউজের জন্য তথ্য সংগ্রহে অনলাইনে ঘোরাঘুরির সময় একটি পরিচিত ব্লগে আত্মসমর্পনের দলিলের উপর একটি ব্লগ ও তার সংশ্লিষ্ট আরও নান আলোচনা পড়লাম। আশ্চর্য হয়েছি ঐ ব্লগে যারা লেখালেখি বা কমেন্ট করেছেন তাদের কথাবার্তায় একটি জিনিস স্পষ্ট যে তারা ১৬ই ডিসেম্বর একাত্তরে মিত্রবাহিনীর কাছে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনকে পুরোপুরি ভারতীয় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। অনেকে এই বিষয় সম্পর্কে নানা মন্তব্যও করেছেন বিভ্রান্তিকর। অনলাইনের ব্লগিং এর যুগে এই ধরণের মুক্ত আলোচনা অবশ্যই একটি পজিটিভ বিষয় বলে আমি মনে করি। এবং এর উপর ভিত্তি করেই আজ ন্যানোনিউজ টুয়েন্টি ফোরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৪০তম বার্ষিকীতে ফিচার লেখার জন্য আত্মসমর্পনের এই বিষয়টি বেছে নিয়েছি। যেহেতু আমিও একজন মুক্তিযুদ্ধেও পরাবর্তী প্রজন্মেও মানুষ তাই এই ঘটনাবলীর অধিকাংশই আমার শোনা ও পড়া থেকে জানা যাচাই করা। তবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে জড়িত থাকা একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে এ সম্পর্কে চাক্ষুষ মানুষের বার্তা কিংবা সাক্ষ্যও আমার কম নেই। তাই নিজ দায়িত্বে ন্যানোনিউজের পাতায় এই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পনের কিছু ঘটনা যাচাই বাছাই করে নতুন প্রজন্মকে জানার জন্য উত্থাপন করছি। এখানে কারো কোন দ্বিমত বা মতামত থাকলে সেটি নিয়েও ন্যানোনিউজের পেজে আলোচনা হতে পারে। আমি সবাইকে এক্ষেত্রে আগাম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখছি।

একাত্তর সালের পাকবাহিনীর কোনঠাসা অবস্থার শুর হয়েছিল নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতের সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ড দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই পাক হানাদের বিতাড়িত করে চলছিল তীরের বেগে। এক্ষেত্রে মাঠের যুদ্ধেও বাইরেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তখন বাংলাদেশকে যথেষ্ঠ জটিল রাজনৈতিক খেলা অব্যাহত ছিল। পাকিস্থানের ক’টনৈতিক সহযোগী চীন ও আমেরিকা যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা করতে না পেওে জাতিসংঘকে ব্যবহার কওে যুদ্ধের ফলাফল পাল্টে দেবার ষড়যন্ত্র চালিয়েছে বহুবার। যেহেতু বাংলাদেশের তখনও কোন স্বীকৃতি আসেনি তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফর্মালি বাংলাদেশ তখনও পূর্ব-পাকিস্থান তথা পাকিস্থানের অংশ। তাই চীন ও আমেরিকা বার বার চেয়েছে কোন ভাবে এখানে একবার যুদ্ধবিরতি আনা সম্ভব হলে ভারতকে মুক্তিবাহীনিকে সহায়তা করার থেকে সরাসরি বিরত রাখা যাবে। এবং যেন তেন একটা রাজনৈতিক সমাধান করে পাকিস্থানও নড়বড়ে হয়েও টিকে যেতে পারবে। সত্যিকার অর্থে এই দুরভিসন্ধি বাস্তবায়ন হয়ে যেতেও পারত যদি এখানে তৎকালিন সোভিয়েত উইনয়ন তথা আজকের রাশিয়া এক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদে দৃঢ়তার সাথে বার বার যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে ভেটো না দিত। নিরাপত্তা পরিষদের নিয়মানুসারেই কোন প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদের একটি সদস্য ভেটো দিলেও তা বাস্তবায়িত হতে পারে না। নিরাপত্তা পরিষদে তখন আমেরিকা এবং চীন অন্ততঃ পাকিস্থানের প্রশ্নে একমত আর সোভিয়েত ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। ফ্রান্স ও বৃটেন এই প্রশ্নে ভোট দানে বিরত থেকেছিল্ আজকের প্রজন্মের যারা এখন আমেরিকার বাংলাদেশের প্রতি নানা সহায়ক ভুমিকা দেখে আমিরিকাকে গণতন্ত্র দরদী এক রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দেন তাদের জানার জন্য বলে রাখি নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্থানকে বাচাতে না পেরেও কিন্তু আমেরিকা হাত গুটিয়ে বসে ছিল না। বাংলাদেশের জন্ম মার্কিন প্রশাসনের জন্য এতো পীড়াদায়ক ছিল যে তারা সারসরি সপ্তম নৌবহরকে পাকিস্থানকে সহায়তা পাঠিয়ে দিয়েছিল বঙ্গোপসাগরে। আর এ খবর পাওয়ার পর রাশিয়াও তার রণতরী পাঠায় বাংলাদেশকে তার সহায়তার জন্য। তৎকালিন বিভিন্ন রেডিও মাধ্যমের খবরে যা বলা হয়েছিল তা ছিল এমন, “মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাকিস্থানকে সাহায্য করার জন্য দ্রুত বঙ্গোপসাগর অভিমুখে রওনা হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া ভারতকে আশ্বস্ত করেছে যে সোভিয়েত রণতরী তার পেছনেই অগ্রসর হচ্ছে।” ভাবতে অবাক লাগে চীন ও আমেরিকা যখন ভিয়েতনাম নিয়ে একেবারে মুখোমুখি তখনও তারা পাকিস্থান প্রশ্নে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে একমত। এই ছিল তৎকালিন বিশ্ব পরিস্থিত। এমতাবস্থায় পাকিস্থানের লক্ষ্য ছিল যে কোন ভাবে ঢাকাকে ধরে রাখা অন্যদিকে ভারতের লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব ঢাকাকে দখল করে নেওয়া। এখানে যে ব্যাপারটি ঘটে সেটি হলো মিত্রবাহিনী যতবারই পাকিস্থানী সৈন্যদের বিভিন্ন স্থানের উপর আঘাত হানতে থাকে ততবারই পাক হানাদাররা দ্রুত পালিয়ে ঢাকার দিকে ছুটতে থাকে। যদিও তৎকালিন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মিত্রবাহিনী এটিকে জয়ের লক্ষ্য পূলণ বলেই ধরে নিয়েছিল কিন্তু পাক হানাদারদের দ্রুত পশ্চাদপসরনে তাদের কমান্ড কাউন্সিলের কিছু পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশ লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে এই দ্রুত পলায়নে সক্ষম হবার কারণে মিত্র বাহিনীর উচ্চ পদস্থ ভারতীয় কমান্ডারদের মুক্তিবাহীনির পূর্ণাঙ্গ সহায়তা পাবার পরও পাক সেনাদের পশ্চাদপসরন থামাতে না পারায় ভারতীয় সেনা কমান্ডারদেও প্রতি বিরক্তি ও কেআষাভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে কামালপুর ঘাঁটি দখলের রক্তক্ষয়ী যদ্ধের কথা ক’দিন আগে যৌথবাহিনীর তৎকালিন কমান্ডার মেজর জেনারেল অরোরাকেও বাংলাদেশে আসার পর উল্লেখ করতে দেখা যায়।

যা হোক পাক হানাদারদের এই পলায়নের পর ঢাকা শহরে তাদের শক্ত অবস্থান গড়ার কাজটি অবশ্যই সহজ হয়েছিল। এবং এর প্রেক্ষিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে মাত্র একদিনে ঢাকা বিজয় ছিল অসম্ভব। কিন্তু পাক হানদারদের এই ইচ্ছা পূরণে সবচেয়ে বড় বাধ সেধেছিল বাঙালী দ;ুধর্ষ মুক্তিসেনারাই্ বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়ে পাক হানাদেও সুশৃংখল কমান্ড ঢাকার অদূওে টাঙ্গাইল পর্যন্ত পৌঁছাল তখনই তাদের সব লক্ষ্য নিমেষে হাওয়ায় উড়ে গিয়েছিল। এর কারণ আর কিছুই নয় তৎকালীর টাঙ্গাইল অঞ্চলে যুদ্ধরত দুধর্ষ কাদেরিয়া বাহিনী, যাদেও কমান্ডার ছিল স্বয়ং বাঘা সীদ্দিকী ওরফে কাদের সীদ্দিকী। মুক্তিযুদ্ধ সারা বাংলাদেশকে এগারটি সেক্টওে ভাগ করা হলেও কেবল টাঙ্গাইল অঞ্চলটি ছিল এর থেকে পৃথক একটি সেক্টর এবং মুজিবনগর সরকারের অধীনে থেকেই সেখানে যুদ্ধ চালাচ্ছিল কাদেরিয়া বাহিনী। এই কাদেরিয়া বাহিনী ভাওয়াল গড় এবং মধুপুর জঙ্গলে পশ্চাদপসরণ করে আসা পাক সেনাদের খুঁজে নিকেষ করে। আর যারাও বা তাদের হাত থেকে কোন মতে পালিয়ে বেচেছিল তারা যেভাবে ঢাকায় পৌছেঁছিল তাতে তাদের আর যুদ্ধ করার মতো অবস্থা ছিল না। এই অঞ্চলে সে সময় কাদেরিয়া বাহিনী এক রাতে আঠারটি সেতু ধ্বংস করে পাক সেনাদের পালাবার সমস্ত সোজা রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল। যে সব সেনাবাহিনীর গ্র“পগুলো গ্রাম গঞ্জের পথ দিয়ে এগুতে চেষ্টা করেছিল তাদের অবস্থা হয়েছিল আরও ভয়াবহ। কেননা স্থানীয় জনতা তখন তাদের প্রতিশোধ নিতে শুর করেছে। দীর্ঘ নয়মাসের তীব্র অত্যাচার তখন এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে পাকিস্থান বাহিনীকে তখন তাদের নিজ দেশেই শত্র“ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে স্থানীয় মানুষদের অসহোযোগীতায় নাকাল হতে হয়েছে। পাকবাহিনীর এমন একটি বিচ্ছিন্ন দল ঢাকায় পশ্চাদপসারণ করবার সময় তাদের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে গ্রামের যে পথ দিয়ে তারা অগ্রসর হয়েছে সে সমস্ত পথে থাকা একটি মানুষ তাদের খাদ্য বা আশ্রয় দেয়া দূরে থাক অর্থের বিনিময়েও তাদের কাছে কোন কিছু বিক্রী করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল্ বরঞ্চ তারা প্রতিনিয়ত এই সব পাক সেনা দের গতিবিধির খবর ধারে কাছে থাকা মুক্তিসেনাদের ক্যাম্পে পৌঁছে দিয়েছে। এর ফলে এই উপদলটি পথ চলতে চলতে ঘুটঘুটে আলোর মধ্যে যেখানেই এক ফোটা আলো দেখেছে ভয় পেয়েছে সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জন্য ওঁত পেতে রয়েছে। রাস্তার ধারের প্রতিটি ঝোপঝাড়ে তাদের মনে হয়েছে যে মুক্তিবাহীনির মৃত্যু সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমন উদভান্ত অবস্থায় দলগুলোর পাক সেনাদের মুখে তখন একটাই মাতম ছিল “মুক্তিকা পাস নেহি হিন্দুস্থানী ফৌজকি পাস সারেন্ডার কারুঙ্গা”।এ অবস্থায় যখনি তারা কোন ভারতয়ি বাহিনী তথা মিত্র বাহিনীর সন্ধান পেয়েছে তড়িঘড়ি তাদের কাছেই আত্মসমর্পন করেছে।

টাঙ্গাইলে কাদের সীদ্দিকীর সঙ্গে ছিলেন মিত্র বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল নাগরা। ভারতীয় এই জেনারেলই প্রথম ঢাকা দখলের কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন। জেনারেল নাগরার নিজের বক্তব্যে পাওয়া যায় যে কাদিরিয়া বাহিনীই তাদের সম্ভব অসম্ভব এমন সব পথ দেখিয়ে তাদের পাক হানাদারদের কাছে ুিনয়ে গেছে যে শত্র“ সেনা কল্পনাও করতে পারেনি যে সেই পথে তাদের উপর হামলা হতে পারে। প্রতিরোধ করার সামান্য সুযোগও তারা পায় নাই। এমনকি এই কাদেরিয়া বাহিনী টাঙ্গাইলে ভারতীয় বাহিনীর রসদ ও ছত্রীসেনা নামাবার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিত্যাক্ত এতটি বিমান বন্দরও মাটি ফেলে বিমান নামানার উপযোগী করে দিয়েছিল যার মাধ্যমে সেখানে ভারতীয় ছত্রীসেনারা তাদের রসদ সহ অবতরণ করে। অন্যদিকে পাকিস্থানী পক্ষ তখন বাইরের দেশের সাহায্য পেতে এতটাই .উন্মুখ যে ভারতীয় ছত্রী সেনা নামার দৃশ্যকে তারা চীনা সৈন্য অবতরণ করছে ভেবে তাদের রিসিভ করতে গিয়ে মিত্র বাহিনীর সাথে গোলাগুলীতে তাদের সকল সৈন্য প্রাণ হারায়।

জেনারেল নাগরা ছিলেন পাক সেনাদের কুখ্যাত কমান্ডার জেনারেল নিয়াজীর সহপাঠী। ১৬ই ডিসেম্বর কুয়াশা ভরা সকালে যখন নাগরা মিরপুর ব্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে তখন তার মনে শংকার ছায়া। ঢাকা নগরীর দখল কি নিতে পারবেন। কেমন করে পার হবেন মীরপুর ব্রিজ। অনেক ভাবনা চিন্তায় যখন তার মনে দোলচল চলছে তখন ভারতীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয় যে তারা শেষ রাত থেকে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর ওয়য়্যারলেস ম্যাসেজ ইন্টারাপ্ট করে জানতে পেরেছে যে সেনা সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর আগে অবশ্য অনেক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খেলা সংঘটিত হয়ে গেছে যা লিখতে গেলে একটি বইয়েও কুলোবে না। তাই এই বর্ণনা এখানে সংযুক্ত করতে চাইছি না। যা হোক জেনারেল নাগরার চিঠি নিয়াজীর কাছে পৌঁছানোর পর তার থলের বেড়াল বেরিয়ে যায়। তিনি নাগরা সহ ভরতীয় কমান্ডের দূতদের মিলিটারী সদর দপ্তরে স্বাগত জানান। মেজর জেনারেণল জামসেদ গিয়েছিলেন জেনারেল নাগরা সহ অন্যদের সদর দপ্তরে নিয়ে আসার জন্য। চমকপ্রদ ঘটনা হলো এই দলে ছিলেন তৎকালিন বাঘা সীদ্দিকী এবং যখন তার পরিচয় দেওয়া হলো নিয়াজী সহ অন্যান্য পাক সেনাদের সামনে তখন এই অল্প বয়সী অথচ দুর্ধর্ষ মুক্তিসেনার দিকে তারা অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছিলেন। এই কমান্ডারের বাহিনীই তাদের ঢাকা দখলে রাখার সমস্ত প্রচেষ্টা ভন্ডুল করে দিয়েছে তার সৈন্যদের ছিন্ন ভিন্ন করে। যখন জেনারেল নিয়াজী কাদের সিদ্দকীর দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন তখন কাদের সিদ্দীকি পরিষ্কার ইংরেজিতে বলেছিলেন, “যারা নারী ও শিশু হত্যা করেছে তাদের সাথে হাত মেলাতে পারলাম না বলে দুঃখিত। আমি আল্লাহর কাছে জবাবদিহিকারী হতে চাই না।”
এদিকে যখন এমন অবস্থা তখন কোলকাতায় মুজিব নগর সরকারের অফিসে তখন অন্য ব্যাস্ততা। জানা যায় ভারতীয় বাহিনী সকালেই মিত্র বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে কর্ণেল ওসমানীকে উপস্থিত হতে আমত্রণ জানায়। কিন্তু তাজউদ্দিন আহমেদ যখন কর্ণেল ওসমানীকে এ কথা জানান কর্ণেল ওসমানী যেতে অস্বীকৃতি জানান। সম্ভবত ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে তখনও তার বিকস্তারিত ধারণা না থাকা এবং সদ্য স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের এই সর্বাধিনায়কের অভাব ঘটলে যে গোলযোগ সৃষ্টি হতে পারে তাতে সেনাবাহিনী নেতৃত্ব শূণ্য হবার মতো দুর্ভোগ আসতে পারে এসব ভেবেই তিনি সে সময় সেখানে যেতে চাননি। এটি ভারতীয় কোন ষড়যন্ত্রের অংশ তো ছিলই না এমনকি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পনের ঘটনাটি মুজিবনগর সরকারের অনুমতিক্রমেই ঘটেছিল। একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে তখনও বাংলাদেশ বিম্বে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় জেনেভা কনভেশনে তাদের অন্তভুর্ক্তি ঘটেনি। আর আত্মসমর্পন শর্তের নিষ্পত্তি ঘটেছিল জেনেভা কনভেনশনের ণীতিমালা অনুসারে, তাই সেই দলিলে বাংলাদেশের কোন কর্তৃপক্ষ স্বাক্ষর করেনি। আর তাছাড়া ওসমানী সেখানে না গেলেও বাংলাদেশের মুজিব নগর সরকারে প্রতিনিধি হিসেবে সে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী লেঃ কঃ এ কে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন। আত্মসমর্পনে স্বাক্ষরের সেই ঐতিহাসিক ছবিতে সাদা কোর্ট পরা অবস্থায় পেছনে দাঁড়ানো একে খন্দকারের ছবিটি সেখানে থাকার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

আরও একটি বিষয় এখানে উলেÍখ করা দরকার আত্মসমর্পনের দলিলটি যখন কর্ণেল খেরা দীল্লি থেকে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর সদও দপ্তওে নিয়ে আসেন তখন পাকিস্থানের সেনা কমান্ডার গণ বাংলাদেশের নাম থাকার জন্য তাদেও আপত্তি প্রকাশ করে। তারা বলে আমরা তো বাংলাদেশ নয় ভারতের সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করব। কিন্তু ভারতের কাছে তাদের এই আপত্তি ধোপে টেকেনি। কর্ণেল খেরা সাফ জানিয়ে দেন এই দলিলটি দীল্লি থেকে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তৈরি হয়ে এসেছে এটিতে পরিবর্তনের কোন উপায় নেই। এই দলিলেই আত্মসমর্পন করতে হবে। সুতরাং এখনু পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনে যাদের ভারতীয় ষড়যন্ত্রের গন্ধ লাগে তাদের জন্য বলছি, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বও বাংলাদেশ লড়াই করেই জিতেছিল ভারতীয় পক্ষেও দয়ায় নয়। বরং ভারতয়ি সেনারা বাংলাদেশ পূর্ণ সামরিক শক্তি হিসেবে মেনে নিয়েই মিত্র বাহিনীর নামে যুদ্ধ করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর নয়। এটাও মনে রাখতে হবে কোন দেশেই যদি দেশেরমানুষের সমর্থন না থাকে তবে অন্য দেশে থেকে এসে সে দেশের উপর ছড়ি ঘোরানো যায় না বা তাদেও সাহায্য কাউকে পরাস্তও করা যায় না। ভারতীয় বাহিনী হয়ত শেষ মূহুর্তও সরাসরি যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করেছিল কিন্তু তার অনেক আগেই ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চই পাকিস্থান নামক দেশটির কবর রচনা হয়ে গিয়েছিল কেননা সেদিন থেকে প্রতিটি বাঙালী মনে প্রাণে লড়েছিল পূর্ব-পাকিস্থান চেয়ে নয় বাংলাদেশ চেয়ে। এর চাইতে বড় সত্য বিজয়ের জন্য আর কিছু হাবার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

***

এই পোষ্টটি ন্যানোনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কমে পড়ার জন্য ক্লিক করুন
আপনার এবং আপনার পাশের বাড়িরর খবরের জন্য ভিজিট করুন……….
www.nanonews24.com