ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

নাজমুজ্জামান নোমান
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাঝে একমাত্র আবাসিক ক্যাম্পাস হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি রয়েছে। যাত্রার শুরু থেকে প্রতিবছর ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয় শিক্ষার পাশাপাশি আবাসিক সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তার কথা ভেবে। কিন্তু তাদের সেই নিজস্ব কক্ষ পাওয়ার স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যায়। বর্তমানে এ ক্যাম্পাস শুধু আবাসিক নামের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ৭০০ একরের এত বড় জায়গার মধ্যে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫০০০ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন সমস্যা থাকার কথা নয়। তাছাড়া ছেলেদের জন্য ৭ টি ও মেয়েদের জন্য ৫ টি হল বরাদ্দ থাকার পরেও আবাসিক সংকট থেকে মুক্ত হতে পাড়ছে না এখানকার শিক্ষার্থীরা।

নতুন হল নির্মাণের পাশাপাশি বিভাগগুলোতে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন বিভাগ খোলার কারনে আবাসন সংকট কোন ভাবেই দূর করতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফলে শিক্ষার্থীরা আবাসিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিয়মিত ঢাকা থেকে ৩০ কি.মি এর ৩ ঘন্টার দীর্ঘ পথ যাতায়াত করে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নানা রকমের জটিলতার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বাসের রুট কমে যাওয়া, বাসের আসন শিক্ষার্থীদের আসনের অর্ধেক ও প্রতি ঘন্টায় বাস না থাকাতে অনেক সময় অপচয় হচ্ছে তাদের।

এছাড়া নবনির্মিত শহীদ রফিক-জব্বার হল নির্মানের পরেও আবাসন সমস্যা থেকে নিস্তার পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। এর মূলে প্রতিটি বিভাগে আসন বাড়ানো, মাস্টার্সে সেশনজটের কারনে যে পরিমান শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন শেষ হচ্ছে তার চেয়ে বেশী শিক্ষার্থীর আগমন, শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরেও অবৈধভাবে মাসের পর মাস হলে অবস্থান, আসন বন্টনে হল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ না থাকা ও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রদের আসন বণ্টনকে দায়ী করছেন ক্যাম্পাসের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা।

ছেলেদের হলগুলোর দৃশ্য অবলোকন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায়। বেশ কিছু হলের ভেতর ঘুরে দেখা গেছে, ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে ডাবলিং করে থাকতে হচ্ছে এখনো। ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে দু’জনের কক্ষে থাকতে হচ্ছে ছ’জনকে ও চারজনের কক্ষে থাকতে হচ্ছে ৬ জন কখনও বা ৮ জনকে। সবচেয়ে করুণ অবস্থার মাঝে দিন কাটছে ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের। তাদের সকলের সম্মিলিত অবস্থান এখনো গণরুমের মেঝেতে। পরীক্ষা এলেই তাই তাদেরকে দেখা যায় সিঁড়িতে বসে পড়াশুনা করতে।
আবাসিক সুবিধা পেতে এ ক্যাম্পাসে যাদের ভর্তি হওয়া, তাদের সে স্বপ্ন এখনো অপূর্ণই রয়ে গেছে। তাছাড়া ছাত্র হলগুলোতে রাজনীতি করার সাথে সীট পাওয়ার সম্পর্ক জড়িত থাকাতে হলগুলোতে অনেককেই সমালোচনা করতে দেখা গেলেও ভয়ে নাম প্রকাশে ইচ্ছুক নয় কোন ছাত্র।

মেয়েদের হলগুলোও নেই এ সমস্যার বাহিরে। ছাত্রী হলে রাজনীতির প্রভাব না থাকলেও হল কর্তৃপক্ষ সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে পারছে না বলে জানায় অনেক ছাত্রী।
ছাত্রী হলের আবাসিক সমস্যা নিয়ে কথা হচ্ছিল প্রীতিলতা হলের আবাসিক ছাত্রী মুবাশ্বিরা বিনতে সাইদের সাথে। সে জানায়, এখনও অনেক ছাত্রীদেরকে সংসদ রুমে থাকতে দেখা যায়।
জাহানারা ইমাম হলের মিশকাত মোস্তাফী স্মৃতি বলেন আমাকে নিয়মিত হলে কষ্ট করে থাকতে হচ্ছে। অথচ অনেক রুম খালি পড়ে রয়েছে। নিয়মিত হলে উপস্থিত থাকার পরেও হল কতৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা মেয়েদের হলগুলোতে এ সংকটকে আরো তীব্র করছে বলে তার অভিযোগ।

আসন সংকটের কারন ও প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আনিসুর রহমানের মুখোমুখি হলে তিনি বলেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর সীট দখল করে রাখা ও কৃত্রিম সীট সংকট তৈরী করে নতুনদের সীট দেয়ার মাধ্যমে দলে আনার ব্যাপারটিকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন হল প্রশাসন যদি ছাত্র সংগঠনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে সকল ছাত্রের অধিকারের ব্যাপারে আন্তরিক চেষ্টা চালায় তবে এ সংকট থেকে উত্তোরণ সম্ভব।

এ ব্যাপারে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম মনে করেন দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এরকম আসন সংকট নিয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে থাকাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লজ্জাজনক অধ্যায়। তিনি অতি শিঘ্রই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সহ হল কর্তৃপক্ষকে হলের আসনের সাথে সমন্বয় করে বিভাগের আসন ঠিক রাখার দিকে সঠিক নজরদারির প্রত্যাশা করেন।

আবাসন সংকট সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যাবস্থা গ্রহন না করলে হয়ত বা অচিরেই হারিয়ে যাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক নামটি।