ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

কারো মনেই আনন্দ ছিল না তিন দিন ধরে, প্রিয় বন্ধুকে মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় হারিয়ে বাকরুদ্ধ সবাই। তার উপর এসে হাজির হয়েছে সে দিনটি, যে দিনে আজ থেকে ঠিক দু’বছর পূর্বে হারিয়ে যাওয়া বন্ধু সহ ৩৮ তম ব্যাচটির আবর্তন হয়েছিল সবুজ এ ক্যাম্পাসে। বন্ধুকে ছাড়া কি করে ব্যান্ড পার্টির সাথে আনন্দ উচ্ছাসে ক্যাম্পাস মাতাবে তার সহপাঠিরা? তা কি করে সম্ভব? আর তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ তম ব্যাচের ২য় বর্ষপূর্তি সকল বিভাগ, অনুষদ, হলের ঐ ব্যাচের আট শতাধিক শিক্ষার্থীকে দেখা গেছে আনন্দ র‌্যালির পরিবর্তে কালো ব্যাচ ধারন করে বিশাল শোক র‌্যালিতে অংশ নিতে। শোক র‌্যালি শেষে নিরাপদ সড়কের দাবিতে গণস্বাক্ষর দিতে দেখা যায় সকলকে। পরে বিভাগীয় উদ্যোগে পালন করা হয় বর্ষপূর্তি।

রোটন ক্যাম্পাসে ভর্তির পরেই স্বপ্ন দেখেছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাসেই আমাদেরকে ওর স্বপ্নের কথা জানিয়েছিল। একাডেমেকি পড়ালেখায় ও খুব মনোযোগী ছিল। প্রথম বর্ষের ফলাফল ফাস্ট ক্লাস। দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ করে তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ। ২য় বর্ষের রেজাল্ট হবে, কিন্তু সে রেজাল্ট কোন কাজে আসবে না রোটনের। রোটন নেই বিশ্বাস করতে পারছিনা। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে প্রিয় সহপাঠী সম্পর্কে এভাবেই বলছিন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাবেয়া বশরী রিমি, সুবর্না নাসরিন, মঈনুল ইসলাম দ্বীপ ও ইকবাল হোসেন সৈকত। রোটনের সেই স্বপ্ন পুরন হতে দিলোনা ঘাতক বাস। নিভিয়ে দিলো রোটনের জীবন প্রদীপ। রোটন আর কোন দিনও ফিরে আসবেনা বন্ধুদের মাঝে। হাস্যজ্জ্বল রোটনকে আর দেখা যাবে না সরকার ও রাজনীতি বিভাগের কোরিডরে। বন্ধু হারানোর চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের আহমদুল হাসান আশিক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত। আর কোন রোটনের জীবন যেন অকালে ঝড়ে না পরে।

আ.ফ.ম কামালউদ্দিন হলের ২২৯ নম্বর কক্ষের রোটনের সহপাঠী সোহাগ বলে, বর্ষপূর্তি আয়োজনের দায়িত্বে ছিল রোটন। অনুষ্ঠানের আগেই চলে গেল সবাইকে ছেড়ে। তাই তার স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল দিয়ে পালন করা হল দিনটি।

আমার ছেলে আর আমাকে মা বলে ডাকবেনা, আমাকে আর রাত ভর সেবা শশ্রুষা করবেনা। চাইবেনা আমার কাছে আর ভাত খেতে। বলে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে রফিকুল ইসলাম রোটনের মা। রোটনের সহপাঠিদের দেখে আরও সে আবেগ আপ্লুত হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে খুঁজতে থাকে আদরের রোটনকে। কিন্তু সে চলে গেছে চিরদিনের জন্য। ঘাতক বাস তরতাজা প্রানকে কেড়ে নিয়েছে। সে আর কখনও তাদের মাঝে ফিরে আসবেনা। সারা বাড়িতে কেউ কারোর সাথে কথা বলছেনা। সবাই যেন পাথর হয়ে গেছে তাকে হারিয়ে। রোটন ছিল ৫ ভাইয়ের মধ্যে ৩য়। প্রখর মেধাবী ও বন্ধু পরায়নতার কারনে পরিবারের সকলের নিকট সবচেয়ে বেশি আদরের ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর মায়ের মনটা খারাপ হয়ে যায় আদরের ছেলেকে সব সময় কাছে পাবেনা বলে। কিন্তু কখনও এ দুঃখকে বুঝতে দিতনা রোটন। মাঝে মধ্যে মায়ের ডাকে চলে যেত বাড়িতে। রোটনের মা প্রলাপ করছিল আর একথা বলছিল। বাবা ছিলেন একদম নিশ্চুপ। যেন তিনি কথা বলতে ভুলে গেছেন।

বর্ষপূর্তিতে তার ব্যাচের সকলের একটাই দাবি রোটনের স্মৃতি অম্লান করে রাখতে যাতে রোটন চত্ত্বর ঘোষনা করা হয়। তাহলে আজীবন সে হয়তো বেচে থাকবে সকলের মাঝে।