ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

তখন ঘড়িতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা। বটতলায় (খাবার দোকান) বসে চা খাচ্ছিলাম। পাশেই কথা বলছিল মাওলানা ভাসানী হলের কিছু শিক্ষার্থী তাদের আলোচনার বিষয় পাশ্ববর্তী রুম গুলোতে কি হয় সারাদিন তা নিয়ে। একজন বলছিল আমার পাশের রুম থেকে গাজার গন্ধে রুমে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আরেকজন বলছিল আমার ব্লকটিতে একই রকম অবস্থা। বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক দ্রব্য সংগ্রহ করে বহু রাত জেগে একত্রে এসব সেবন করছে ঐ রুমের বাসিন্দারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে ও মেয়েদের হলগুলোতে এখন রাত জেগে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবন করে সময় কাটছে শত শত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর। যাদের পড়াশুনা শেষ করে ততক্ষণে ঘুমিয়ে পরার কথা। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের প্রায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের বিশাল একটা সময় মাদক সেবনে খরচ হচ্ছে। যে সময়ে তারা গড়তে পারে তাদের উজ্জল ভবিষ্যত।

জাবি ক্যাম্পাসের ছেলে এবং মেয়েদের বেশ কিছু হল থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ক্যাম্পাসের প্রায় ২৫ ভাগ শিক্ষার্থী হলগুলোতে মদ, গাজা, ঘুমের ঔষধসহ এধরনের আরো অন্যান্য নিষিদ্ধ মাদক সেবন করে চলছে নিয়মিত। অথচ যাদের কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বে ধূমপান পর্যন্ত করতো না। এখানে এসে যাদের নেশার হাতেখড়ি শুরু হয়েছে শুধুমাত্র সিগারেট দিয়েই। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এসব শিক্ষার্থীদের জীবন তাই হয়ে পড়েছে সংকটাপন্ন ও অনিশ্চিত। নেশা করতে টাকার সংগ্রহে অনেকেই জড়িয়ে পরছে ক্যাম্পাস পাশ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজির মত অনৈতিক কর্মকান্ডে। নিয়মিত মাদক দ্রব্য সেবনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জন্য থাকে আলাদা ড্রিংস করার বাজেট। বেশ কিছু অনুষ্ঠানে বহুবার অনেককে মাতলামি করে মাটিতে হেলে পড়ে যেতে দেখে এর সত্যতা মিলেছে। এতো গেল ছেলেদের হলের অবস্থা। মেয়েদের হলগুলোও নেই মাদকের ছোঁয়ার বাইরে। অনেক ছাত্রী নিয়মিত নেশা করে থাকেন হলগুলোতে, এমন তথ্য মেলল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইংরেজী বিভাগের এক ছাত্রীর কাছ থেকে। হরদম ভাবে এসকল মাদকের উপকরন বিক্রি হচ্ছে ক্যাম্পাসের মাঝেই। নিরাপত্তা কর্মী ক্যাম্পাস জুড়ে টহল দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বাঁধা দেয়ার লোকের অভাব রীতিমত অবাক করছে সচেতন মহলের শিক্ষার্থীদের।

মাদক সেবন কারী কয়েকজনকে অনুসন্ধান করে জানা গেলো কোত্থেকে আসে এসব মাদক? বিশ্ববিদ্যালয় ট্রান্সপোর্ট চত্ত্বর সংলগ্ন চায়ের দোকানের আশে পাশে বাইরে থেকে মাদক দ্রব্য এনে ব্যবসায়ীরা ঘুরে ঘুরে গাজার প্যাকেট বিক্রি করছে ৩০ টাকায়। যা দিয়ে তৈরী করা সম্ভব তিনটি স্টিক। এসকল অবৈধ দ্রব্যের পাশাপাশি ঘুমের ঔষধ খেয়ে অনেকে নেশা করে বলে জানিয়ে তাদের রুমমেটরা। শিক্ষার্থীরা মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে অনায়াসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিসের আশপাশ থেকে সংগ্রহ করে মাদক সামগ্রী। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিশমাইল এলাকার যাত্রী ছাউনি, গেরুয়া, আমবাগান, ইসলামনগর, কলাবাগান ও সাভারের অনেক এলাকায় হাত বাড়ালেই সহজে মেলে নানা প্রকারের মাদক। ক্যাম্পাসের আড্ডার স্থান টারজান পয়েন্টেও বিক্রি হয়ে আসছে এসব দ্রব্যাদি।

মাত্র কিছু দিন পূর্বে আ.ফ.ম কামালউদ্দিন হলের দুই ছাত্রকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগের মুখে হল থেকে বের করে দিতে বাধ্য হয়েছিল হল কর্তৃপক্ষ। তারা রাত ৩ টার পর নেশা করে বিভিন্ন রুমে গিয়ে মাতলামি ও কক্ষের মালামাল চুরি করতো বলে অভিযোগ ঐ হলের শিক্ষার্থীদের। বর্তমানে খবর নিয়ে জানা গেছে ইয়ার লসের কারণে এখন ছাত্রত্ব হারাতে বসেছে ঐ শিক্ষার্থীদ্বয়। ফলে ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার যে স্বপ্ন বাবা মা দেখেছিলেন তা ভেঙ্গে গেছে।

যারা ভবিষ্যত দেশ গড়ার কারিগর তাদের জীবনের এরকম অস্তমিত অবস্থা অপ্রত্যাশিত। যাদেরকে এ বয়সে মাদককে না বলার স্লোগান মুখে নেয়ার কথা। তারাই মাদককে হ্যাঁ বলে মুখে নিচ্ছে। তাহলে দেশের ১৫ কোটি জনগন কোন দিকে তাকিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশে বসবাসের আশা বুনবেন? তাই এ ব্যাপারে ক্যাম্পাস ভিত্তিক সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে কাজ করার প্রয়োজনীতা রয়েছে। এজন্য হলের দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষকদের সঠিক নিয়ম পালনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ দিকে সুদৃষ্টির অভাব রয়েছে বলে আমি মনে করি।

নেশার রাজ্যে ক্যাম্পাস গদ্যময়