ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

সালটি ছিল ২০০৪। একঝাঁক পাখি উড়ে এসে জীবন গড়ার নীড় বাঁধে নিরিবিলি সবুজ এ ক্যাম্পাসটিতে। আনন্দ উল্লাসে সেদিন ক্যাম্পাসের প্রতিটি স্থান মাতিয়ে তোলে নিজস্ব কলকাকলিতে। আজ পাখিগুলোর নীড় ছাড়ার দিন। তাদের বিদায় জানাতে ক্যাম্পাস সেজেছে আলপনার সাত রংয়ে। চোখ ধাঁধানো হলুদ নীল বাতিতে ক্যাম্পাস রঞ্জিত। আমরা ব্যস্ত নিজ ঘর গোছানোর কাজে। এর পর কি কাজ করবো খুঁজে পাচ্ছি না।
বেতনার্ত আর্তনাদে এভাবেই কথাগুলো শুনা গেল হৃদ্যতার বন্ধনে আলোক শিখা জ্বালানোর প্রত্যয়ে জড়ো হওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ তম ব্যাচের বিদায়ী র‌্যাগ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া অর্থনীতি বিভাগের নিবেদিতা রায়ের কন্ঠে। শুধু নিবেদিতা নয়, এ বিদায় (র‌্যাগ) অনুষ্ঠানে প্রায় ছয় শতাধিক কণ্ঠে বেজে উঠেছে এমন বেদনার আওয়াজ। টিএসসিতে দাড়িয়ে কথা হলো বিদায়ী ব্যাচের মাসুম রেজা মেহেদীর সাথে জানালেন সংস্কৃতির নগরী জাবি ক্যাম্পাসের পুরো সময়টাতে অসংখ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন ও তাতে অংশগ্রহন করেছি। এ ক্যাম্পাসে এটাই আমাদের সর্বশেষ আয়োজন ভাবতেই মন কেঁদে উঠে। মেহেদী আরো জানান, ষড়ঋতুর চক্রাকার পরিবর্তনে ক্যাম্পাসের নবরূপ তার কাছে অবিরাম নতুন। তাই এখানকার মনোরম বিমুগ্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একবারে দেখে শেষ করার মত নয়।

শিক্ষা সমাপনী উৎসবের নিয়ম রক্ষার্থে র‌্যাগ রাজা ও রাণী নির্ধারণের কাজ শেষ অনেক আগেই। রাজা হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ফয়সাল ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রাণী নির্বাচিত হন উপমা। কনসার্ট শেষে কথা হল রাণীর সাথে, জানালেন, ব্যচের সর্বশেষ আয়োজন বলে কথা, আয়োজনটা তাই ছয়দিনের দীর্ঘ সময়ব্যাপী। সব বন্ধুদের একত্রে আড্ডা, গল্প, খুনসুটি, মজার এটাই শেষ সময়। কখন আবার পুনর্মিলনীর ডাক পরবে তাতে কেউ আসবে কেউ ব্যস্ততার অজুহাতে থাকবে চোখের অদৃশ্যে, তাই দেখা হওয়ার সম্ভাব্যতা অতি স্বল্প।

ব্যান্ড, সানাইয়ের সুরে বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে নতুন পুরনো সব ব্যাচের শিক্ষার্থীদের তা জানান দিতে প্রথম প্রহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে পাদদেশ থেকে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিন করে পরিবহন চত্বরে এসে শেষ হয় বর্ণাঢ্য একটি শোভাযাত্রা। টমটমে বসে থাক রাজা ও রাণী আর মস্ত বড় হাতির শূরের অভ্যর্থনা আনন্দের পরিমাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। ৩৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথে র‌্যালিতে অংশ নেয়া উপাচার্য ড. শরীফ এনামুল কবিরের কাছে র‌্যাগ স্মৃতি জানতে চাইলে হেসে জবাব দেন, আমি আজ হতে ৩৩ বছর পূর্বে র‌্যাগ অনুষ্ঠানে শামিল হয়েছিলাম। তখন র‌্যাগ রাজার মত কোন বিষয় ছিল না, ছিল র‌্যাগ মাস্টার। আমরা র‌্যাগ র‌্যালী করেছি একটি হাতি দিয়ে আর এখন দুটি হাতি পাঁচটি ঘোড়ার টমটম দিয়ে র‌্যাগ অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। তিনি ব্যাচের সকল র‌্যাগারদের সুন্দর ও সফল জীবন প্রত্যাশা করেন। বুধবারের প্রথম সন্ধায় সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে নিজেদের মত করে আয়োজন সেড়ে নেয়া হয় ঐ ব্যাচের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্ব-ব্যাচ রচিত ‘থিম সঙ’ পরিবেশনের মাধ্যমে। রাত ১১ টায় ক্যাফেটেরিয়া চত্বরে ক্যাম্প ফায়ার করে উৎসব উন্মাদে মেতে উঠে বিদায়ী শিক্ষার্থীরা।

পরের দিন নিজেদের স্মৃতি অম্লান করে রাখতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণ ও সেচ্ছায় রক্তদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়। শুক্রবার রাতে বিজলী চলে যেও না, ওরে ওরে হাওয়া, বিগি বিগির সুরে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘নগর বাউল’ মাতিয়ে তোলেন কনসার্টে অংশগ্রহন করা বর্তমান ও বিদায়ী সকল শিক্ষার্থীদের। বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে তিল ধারণের ঠাই ছিল না সেদিন। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনে এগিয়ে নিতে সুন্দরবনকে এসএমএসে ১০ হাজার শিক্ষার্থীর ভোট দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সেরে নেয়া হয় এখানে। পরের দিনের ট্রিপ ছিল নন্দন পার্ক ভ্রমণ। এক এক করে র‌্যাগ আড্ডা ও সর্বশেষ দিনের গ্রুপ ডিনার শেষে পরিসমাপ্তি ঘটে ছয়দিনের বিশাল এ আয়োজনের। মিডিয়া পার্টনার হিসেবে বসুন্ধরা গ্রুপ এবং প্রাণের সৌজন্যে ‘পাওয়ার এনার্জি ড্রিংকস’ সহায়তায় করছে এ উৎসবে।