ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

জাবিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় নদী মেলা-২০০১১

‘অসম্ভবের বিশ্বাস নিয়ে দৃষ্টিতে নদী যাক সাগরে’। জমজমাট একটি স্টলের পাশে দাঁড়িয়ে প্রামাণ্যচিত্র দেখে অর্থনীতি বিভাগের আশরাফুল আলম বাবুর মন্তব্য ছিল এরকম। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিহাব, কানন, রাকিব বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে সাজিয়ে রাখা বাহারি সব জাল, নৌকা, মাছ দেখছে। বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য জহির রায়হান মিলনায়তনের ভিতরেই এতো সব মনোমুগ্ধকর আয়োজন। ভিতরের সেমিনারে নদী নিয়ে হচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অঞ্চল ভেদে বক্তারা তাদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের নির্যাসটুকু যুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরছেন শ্রোতাদের নিকট। সূক্ষ্ম বিষয় বিশ্লেষণে উপাত্ত সমূহ বিশাল স্লাইডে (স্ক্রিনে) দেখানো হচ্ছে। ভিড়ের মাঝে কেউ কেউ ব্যস্ত শৈল্পিক ছবির ভান্ডার খুঁজতে, কেউ আবার পাঁচ হাত দীর্ঘ লাইনে মনের কথা ব্যক্ত করতে কমেন্ট লেখার জন্য দাঁড়িয়ে। সেরকম একজন মুবাশ্বিরা বিনতে সাইদ (বুশরা)। বুশরা তার কলমের কালিতে আঁকলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী মেঘনা’।

নয়নাভিরাম ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় নদী মেলার চিত্র এটি। কি মেলা হয়নি এখানে? দেশে অনুষ্ঠিত একমাত্র পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা সহ বেশ কিছু ভিন্নধর্মী মেলার আয়োজন ক্যাম্পাসকে ফুটিয়ে তুলেছে স্বাতন্ত্রিক পরিচয়ের এক উচ্চ মানদণ্ডে। যা দেখতে এসে মেলাতে ভীড় জমিয়েছিল হাজারো দর্শনার্থী।

৩৩ টি সরকারী ও বেসরকারী সংস্থা, উন্নয়নশীল এজেন্সির প্রয়াসে ‘নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে’ স্লোগানকে উপজীব্য করে গত বছরের ১৩ ও ১৪ এপ্রিল গাইবান্ধা শহরের স্বাধীনতা চত্ত্বরে নদী মেলার সূচনা। ধারাবাহিক পথ পরিক্রমায় দ্বিতীয় বারে এ মেলার স্লোগান নির্বাচন করা হয়-‘ছোট নদী ছোট নয়’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং ডিজেস্টার ফোরামের যৌথ উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী এ মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীর উৎস, গতি প্রবাহ, আদি ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধ্বংসের কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে যুগান্তকারী প্রস্তাব বিশেষজ্ঞরা তাদের উপস্থাপনায় তুলে ধরেন। নদী বাঁচানোর শপথের মাধ্যমে মেলার উদ্ধোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবীর। বিশেষ অতিথির মঞ্চ অলঙ্কৃত করেন মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী। বক্তারা বলেন নদী আমাদের ঐশ্বরিক উপহার। প্রকৃতির এই দানকে ভালোবাসতে হবে।

নদী বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা সরবরাহে বিভিন্ন নদীর নামে ২৪টি স্টল অংশ নেয় মেলাতে। তিন দিনের মেলায় প্রথম দিন চিত্রা, দ্বিতীয় দিন হালদা ও তৃতীয় দিন আদি যমুনা ও ইছামতি নদীর নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল।

বিভিন্ন সংস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদী এবং খালের আদি ও বর্তমান অবস্থার ওপর তাদের গবেষণালব্ধ বিভিন্ন তথ্যচিত্র, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সিইজিআইএস এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ অফিসার ড. মমিনুল হক সরকারের গবেষণা প্রবন্ধে বাংলাদেশের নদী ইতিহাস রূপ ধারন করে। চিত্রে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে ২৫০টি নদীর অস্তিত্ত্ব রয়েছে। চিত্রা নদী বাচাঁও আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ও রুপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ এবং প্রকল্প সমন্বয়ক জনাব ফারুক আহমেদ ওই নদীর বর্তমান চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। ইউল্যাবের একটি প্রতিনিধি দল আলোক চিত্রের মাধ্যমে হালদা নদীকে বাস্তব বিম্বে প্রতিফলন করেন। এর আগেই ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ‘হালদা দিবসের’ কার্যক্রম শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নদী প্রেমিক পরিবেশ সচেতন মানুষ এবং গবেষকগণ ছিলেন অনুষ্ঠানের মূল প্রেরণাতে। নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের একটি দল নদীর সার্বিক পটভূমি তুলে ধরে মুকাভিনয় ও পরে পট গান পরিবেশন দিয়ে।

মানবদেহের প্রাণ সঞ্চারের জন্য যেমন শিরা উপশিরায় বহমান রক্তের বিকল্প নেই। তেমনি দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় নদী বারিধারার সম্পূরক নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে ছোট-বড় ১২০০ নদীর ৯০০ বিলুপ্তি, এবং ৬৫টি মৃত্যুর মুখে। অথচ এই নদীই এদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই নদী গবেষকদের পেশকৃত সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করে শিল্প কলকারখানার বর্জ্য নিক্ষেপ ও ভূমি দস্যুদের হাত থেকে নদীকে রক্ষা করে বিলীন হওয়ার হাত থেকে উত্তরণের পথ হয়তো নদী মেলাতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন আয়োজক কমিটি ও অংশগ্রহণকারীরা নদী প্রেমীরা।

নদী মেলার মূল ছবি।

নানান ইভেন্ট দর্শনার্থীরা এভাবেই ঘুরে ঘুরে দেখেছেন।