ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আজ ১৬.১১.২০১১ বুধ বারের ইত্তেফাক সম্পাদকীয় পাতা

যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তার একান্ত কিছু সমস্যা নিয়ে এগিয়ে চলে। যা ফুটে ওঠে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে। অধিকার আদায়ের জন্য একটি শক্তিশালী প্লাটফর্মের গুরুত্বকে তাই ছোট করে দেখার উপায় নেই। আমাদের দেশে যে সব জাতীয় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার সবকটিই শিক্ষার্থীদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু এখানে ভর্তির পর থেকে শিক্ষার্থীদের কোনো সম্মিলিত অধিকার আদায়ের ঘটনা চোখে পড়েনি এখনো— এভাবেই বললো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিহাব উদ্দিন আল-আজাদ। দীর্ঘ ১৮ বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নিজস্ব অধিকারের কথাগুলো ভুলতে বসেছে তার মতো আরো অনেকেই। যারা জাকসুর কথা হয়তো নামেই শুনেছে।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সাকেন্দ্রের পাশে একইভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে নামেমাত্র এ ভবনটি। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পথ অবরুদ্ধ, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে না যোগ্য নেতৃত্ব। ফলে প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের নেতারা জড়িয়ে পড়ছে চাঁদাবাজি, ইভটিজিং ও মাদক সেবনের মতো নানা অপরাধ কর্মে। দূরত্ব বাড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রসংগঠনের। অচলাবস্থা বিরাজ করছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। বিগত বছরগুলোতে মৃতপ্রায় জাকসু সচলের দাবি উঠলেও তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। চলতি বছরের প্রথম সিনেট অধিবেশনে উপাচার্য জাকসু সচলের প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো অগ্রগতি নেই। প্রশাসনপন্থি ছাত্রনেতারা নির্বাচনে হারতে পারে এই ভয়ে নির্বাচন দিতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া বিরোধী ছাত্রসংগঠন নিরক্ষেতার অজুহাতে অংশগ্রহণে অনীহাও এর অন্যতম কারণ।

স্বাধীনতার সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অর্জন ছিল জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। নিয়ম রয়েছে ক্যাম্পাসের বৈধ সব আবাসিক শিক্ষার্থী এর সদস্য হতে পারবে। তাই শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে নয় জাকসু হল সংসদের মাধ্যমেও তৈরি করতো যোগ্য নেতৃত্ব। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে এ পর্যন্ত যত সফল আন্দোলন হয়েছে এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছে জাকসু। প্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেয়া হতো প্রতি বছরের নির্বাচনের মাধ্যমে। অথচ গত ৪০ বছরে জাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৯ বার। ১৯৯২ সালের নির্বাচনে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সংগঠিত অপ্রীতিকর ঘটনায় পণ্ড হয় জাকসু নির্বাচন। তারপর থেকে এ পর্যন্ত কোনো নির্বাচন হয়নি। কখনো হবে কিনা তাও জানে না ছাত্র-শিক্ষক কেউই।

জাকসুর কার্যক্রম দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে নিস্ক্রিয় থাকলেও প্রতিবছরের পরীক্ষা ও ভর্তির সময় এখাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় বড় অঙ্কের চাঁদা। আদায়কৃত অর্থ কী খাতে ব্যয় হয় এমন প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উঠেছে। জাকসুর প্রতিবছরের বরাদ্দকৃত অর্থ এর কার্যক্রম না থাকায় কোনো সুবিধাই ভোগ করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।

বিগত সময়ের র‌্যাগ উত্সবকে কেন্দ্র করে ছাত্রসংগঠনের সংঘর্ষে জাকসু ভবনটিতে ব্যাপক ভাংচুর চালানো হয়। ভবনটিতে বর্তমানে নেই পর্যাপ্ত আলোর সুবিধা, দরজা-জানালাসহ আসবাবপত্রগুলো বিলীন প্রায়। কার্যক্রম না থাকায় ভবনটির কয়েকটি কক্ষে বর্তমানে গড়ে উঠেছে প্রতিবন্ধী শিশুদের আনন্দশালা। প্রতিবছর শিক্ষা সমাপনী (র‌্যাগ) উত্সবের সময়ই কেবলমাত্র কয়েকদিনের জন্য ব্যবহূত হয়ে থাকে এ ভবনটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসু নির্বাচন হলে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সত্ ও যোগ্য ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি হবে। বিভিন্ন প্রশাসনিক নিয়ম-কানুনে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির গণতান্ত্রিক ধারা চালু হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও নিজস্ব মতামত প্রকাশের জায়গা হবে জাকসু।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসে ঘটেছে নানা ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা, গোলাগুলি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও। তবে এসব ঘটনার পেছনে সবসময় সরকারি ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষক রাজনীতি দায়ী ছিল বলে মনে করছেন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকেই। পাওয়া না পাওয়ার স্রোতে যোগ্য নেতৃত্বে তৈরি ও অধিকার সুনিশ্চিত করতে বর্তমানে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি এখন জাকসু নির্বাচন।