ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

এ কথা আজ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সংরক্ষিত যে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বময় উচ্চারিত হয়েছিলো এবং বাঙালি জাতির স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য পরিচালিত মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সর্বাত্মক মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের যে অমোঘ বাস্তবতা তা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। পৃথিবীর মাত্র দুটি দেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রয়েছে, একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র্রের অপরটি আমাদের বাংলাদেশের। জাতি হিসেবে আমাদের অমিত এই গর্বের বিষয়টি বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে সুনিশ্চিতভাবেই এক আপোষহীন অধিকারসচেতন গণতান্ত্রিক দৃঢ়চিত্ত জাতির পরিচয়ে।

আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে (Proclamation of Independence) উল্লেখ করা হয়েছে- “যেহেতু ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের জানুয়ারী পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হইয়াছিল, এবং যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়াছিলেন, এবং যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন, এবং যেহেতু উক্ত আহূত এই পরিষদ সভা স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন, এবং যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্র“তি পালন করিবার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সহিত পারস্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন, এবং যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান… ।” এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের রূপরেখা সৃষ্টি করেছিলো।

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনার অংশটিতে বিধৃত হয়েছে “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের১ মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা করিয়াছি” অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধারণাটি সাংবিধানিকভাবেই উচ্চারিত একটি বিষয়। এর কোনো ধরনের অবমাননা, অস্বীকার, বিরুদ্ধাচরণের অর্থ আমাদের পবিত্র সংবিধানের বিরোধিতা করা এবং বাংলাদেশকে বা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা। এই একটি সুস্পষ্ট সময় রেখা ও ধারণার ওপরে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ এই দুইই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ জার্মানির Frankfurter Allgemeine পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিল ‘East Pakistan is no longer East Pakistan- even if the West Pakistan Army puts down the Bengali rebellion by force, Bangladesh will not revert to East Pakistan. The East Pakistan idea is dead.’
২৮ মার্চ দি নিউইয়র্ক টাইমস ইউএসএ-তে মুদ্রিত হয়েছিলো- ‘The Pakistan Army is using artillery and heavy machine-guns against unarmed East Pakistani civilians to crush the movement of autonomy in this province of 75 million people. Some fires were still burning and sporadic shooting was continuing early this morning when 35 foreign newsmen were expelled from Dacca.’

আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত “পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি পালন করিবার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সহিত পারস্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা” ছিলো মূলত এদেশে দখলদার পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণকারীদের পরিকল্পিতভাবে এদেশের স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা ও ধ্বংস করা। যার সূচনা হয়েছিলো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা ২৫ মার্চের শতাব্দীর ঘৃণ্যতম গণহত্যার মাধ্যমে।

পাকিস্তানি শাসক সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতাসীনরা যে প্রকট এবং শোষণের বৈষম্য বাস্তবায়ন করেছিলো তা ছিলো পৃথিবীতে নজিরবিহীন। “দীর্ঘ ২২ বছর পরও (পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার) সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে …কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরীতে বাঙালিদের সংখ্যা ছিলো শতকরা ১৫ ভাগের কম এবং দেশরক্ষা সার্ভিসে ১০ ভাগেরও কম। এই বৈষম্যের কারণে বাংলার অর্থনীতি আজ ভেঙে পড়েছে। … নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে পূর্ববাংলায় শতকরা ৫০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি। পূর্ববাংলায় ১ মণ মোটা চাউলের মূল্য ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, পশ্চিম পাকিস্তানে ২০ থেকে ২৫ টাকা” (বাংলাদেশ ডকুমেন্টস, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১০৫-১১২)। “ ব্যাংকিং সম্পদের শতকরা ৮০ ভাগ এবং বীমা সম্পদেরও শতকরা ৭৫ ভাগ তাদের দখলে (পশ্চিম পাকিস্তানিদের)। এইভাবে এদেশে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক শোষণ চলেছে। গত ২০ বছরে সরকারের মোট রাজস্ব ব্যয়ের ১৫০০ কোটি টাকা (মোট ব্যয়ের এক পঞ্চমাংশ মাত্র) পূর্ববাংলায় খরচ করা হয়েছে। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ করা হয়েছে ৫০০০ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ৩০০০ কোটি টাকা (অর্থাৎ মোট পরিমাণের এক তৃতীয়াংশ মাত্র) পূর্ববাংলায় খরচ করা হয়েছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ করা হয়েছে ৬০০০ কোটি টাকা। এই ২০ বছরে পশ্চিম পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে ১৩০০ কোটি টাকা, অথচ পশ্চিম পাকিস্তান এই সময়ে ৩০০০ কোটি টাকারও বেশি পণ্য আমদানি করেছে। পূর্ববঙ্গে আমদানির জন্য যা খরচ হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে হয়েছে তার তিনগুণ। পশ্চিম পাকিস্তান মোট ২০০০ কোটি টাকা আমদানি খাতে ব্যয় করেছে। এই অর্থের পরিমাণ হচ্ছে তার নিজস্ব রফতানি আয়ের চেয়ে ৫০০ কোটি টাকা বেশি। এই অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা পূর্ববাংলার আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রা এবং মোট প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়।”২

বাংলাদেশের মানুষদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের ২৩ বছরের সর্বাত্মক শোষণ যখন চরমে উঠেছিলো এদেশের আপামর মানুষ তারই প্রত্যুত্তর দিয়েছিলো ৭০-এর নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে। এই সংগ্রামী ও স্বাধীনতা প্রত্যাশী বাঙালিরা যখন গণতান্ত্রিক পন্থায় তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে একটি শাসনতন্ত্রর প্রত্যাশায় ছিলো ঠিক সেই সময়টি অর্থাৎ ১৯৭১ সালের পূর্বাহ্নে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি ক্ষমতা দখলদাররা “ন্যায়নীতি বহির্ভূত বিশ্বাসঘাতকতামূলক” ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়।

তথ্যপঞ্জী

১. বাঁকা হরফের অংশটি ১৯৭৮ সালের ২য় ঘোষণাপত্র আদেশ বলে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের’ স্থলাভিষিক্ত
২. ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ভাষণ