ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

শান্তি পরিবহনে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে সকাল সকাল যাত্রা। আগের রাতেই লিজাকে বলে রেখেছিলাম সঙ্গে যেতে হবে। মাকে ম্যানেজ করে সকালেই আমার হোটেল লবিতে শুভ্র সাদা পরী হাজির। জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে যাওয়া যায়। গাইড হিসাবে আমি থাকতে কোন চিন্তা নেই। আমরা একসাথে থাকতাম। ওর আব্বুর বদলীর কারনে চট্টগ্রামে চলে আসা। ছোটবেলা থেকেই এক জায়গায় অনেক দিন ছিলাম। দুষ্টু মেয়ে, মাথার ভিতর সব সময় মানুষকে বোকা বানানোর চিন্তা কিলবিল কিলবিল করে। ছোট বেলার লিজার ও আমার অনেক স্মৃতি মনে ভাসছে। তা নিয়ে কথা বলতে বলতে সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে অগ্রসর হচ্ছি। দুই ধারে পাহাড় মাঝে মাঝে বাড়িঘর। এখন ফেব্রুয়ারী মাস প্রকৃতিতে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গাছ তার পাতা ঝরিয়ে নিজেকে হালকা করে নিয়েছে। ফলে পাহাড়গুলোকে ন্যাড়া লাগছে। শহর এলাকা পেরিয়ে আমরা মূল পাহাড়ের দিকে যাচ্ছি। উচু-নিচু আঁকা-বাঁকা রোমাঞ্চকর সব রাস্তার বাকের মুখোমুখি হচ্ছি। মাঝে মধ্যে কিছু সেনাবাহিনীর ক্যাম্প চোখে পড়ছে। পাহাড়ি বাঙ্গালী দুই স¤প্রদায় একাকার হয়ে বসবাস করছে এই অঞ্চলে যুগের পর যুগ। শান্তি চুক্তির আগে এখানে মাঝে মধ্যে অশান্তি তৈরী হত। পর্যটক হিসাবে আশাটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এখন সেই শঙ্কা নেই বললেই চলে। মাঝে মধ্যে রাস্তার দুই ধারে পাহাড়ে, বাজারে, দোকানে আদিবাসীদের চোখে পড়ছে। পাহাড়ের কাছে আসলে মন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এখানের গ্রামগুলো ছবির মত সুন্দর। প্রকৃতি ও আদিবাসীরা যেন প্রকৃতির একটা অংশ। মনে হচ্ছে খাগড়াছড়ি শহরের কাছা কাছি চলে এসেছি। সমতল ভূমি থেকে কয়েক হাজার ফুট উপরে। দূর থেকে খাগড়াছড়ি শহর দেখা যাচ্ছে সমতল। ছবির মত একটি শহর। আমরা নামার জন্য প্রস্তুতি নিলাম সামনে একটি স্পট আছে আলুটিলা। শহর থেকে ৮-৯ কিলোমিটার আগে।

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নেমে পড়লাম আলুটিলায়। উদ্দেশ্য আলুটিলার সুড়ঙ্গ দর্শন। দর্শনীর বিনিময়ে প্রবেশ করলাম। সঙ্গে সুড়ঙ্গ পথের প্রস্তুতি হিসাবে কিনে নিলাম বোম্মা। যা বিশেষ কায়দায় আগা বাঁশের মাথায় কেরোসিনে ভিজানো পাটের দড়ি দিয়ে তৈরী মশাল বিশেষ। স্থানীয় নাম (বোম্মা)। সিঁড়ি দিয়ে নামা শুরু করলাম সুড়ঙ্গ পথের উদ্দেশ্যে। নিরব, নিস্তব্ধ, পাখির কিচিরমিচির ও গাছের পাতার ঝিরিঝিরি বাতাস ছাড়া আর কিছুই শোনা জায়না। লিজার ভাষ্যমতে আলুটিলা সুড়ঙ্গটি শান্তি চুক্তি হওয়ার পর আবিস্কৃত হয়েছে। এর আগে শান্তিবাহিনীর লোকজন এটি ব্যবহার করতেন। অবশেষে গুহার মুখের কাছে পৌঁছলাম। গাছ ও পাহাড়ের ছায়ায় আলো স্বল্পতায় অন্ধকার হয়ে আছে। আমার ভয় করছে। লিজাকে বললাম গুহায় না প্রবেশ করলে হয় না? লিজা রহস্যজনক ভাবে হাসতে থাকে। মনের ভয় আরো বেড়ে যায়। সত্যিই ভয় লাগছে মনে। নিজের বাহাদুরী দেখানো ও সুড়ঙ্গ না দেখার অতৃপ্তি থেকেই রাজি হয়ে গেলাম। বর্ষাকালে নাকি পানি জমে ভরে যায়। শীতকালে আবার শুকিয়ে যায়। সুড়ঙ্গ পথে হাঁটু পানি চামচিকা ও বাদুরের আনা গোনাতে এক ভূতুড়ে পরিস্থিতি পিচ্ছিল কাঁদা পানি ও জোঁকের ভয়।

প্রস্তুতি নিলাম ভিতরে যাওয়ার ব্যাগ থেকে লাইটার বের করে বোম্মা ধরিয়ে নিলাম। একজন আরেক জনের হাত ধরে হাটা শুর“ করলাম ভিতরের দিকে। দুজনে কথা বলে ভিতরের ভয় দূর করার চেষ্টা করছি। অমসৃণ পথ, উঁচুনিচু গর্তে ভরা। ভয়ে ভয়ে হাঁটছি আর পিছলা খাচ্ছি। মনে হচ্ছে পথ শেষ হচ্ছে না। বুক দূর“ দূর“ করছে হঠাৎ লিজার হাতে থাকা বোম্মা নিভে গেল এবং মানুষের চিৎকার । ভয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরলাম। বুঝা যাচ্ছে না কোন দিকে যাবো। মনে হচ্ছে গুহার মাঝ খানে এসেছি। আমরা কেউ কাউকে দেখছিনা। একজন আরেক জনকে ধরে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। এক সময় দেখি আলো দেখা যাচ্ছে। দ্রুত আলোর দিকে অগ্রসর হয়ে গুহা অতিক্রম করলাম। সবই ছিল ওর পরিকল্পনা, দুষ্টু মাথার দুষ্টুমি। ভয়কে জয় করে ও আজ আমার সহযাত্রী। ওর শুভ জন্মদিনে অনেক ভালবাসা।