ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আগামীকাল ১৪ ফেব্রুয়ারি। শাহবাগ আন্দোলন গড়াবে দশম দিনে। তরুণ প্রজন্ম এখনো ক্লান্তিহীনভাবে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি নিয়ে শ্লোগানের আওয়াজে উত্থাল করে রেখেছেন শাহবাগ সহ গোটা দেশ।

এদিকে আগামীকাল এদেশের জন্য একটি প্রতিবাদ প্রতিরোধের দিন।১৯৮৩ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দী মুক্তি ও জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে ছাত্র-জনতা মহানগর ব্যাপী এক ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শুধু মহানগর ব্যাপী ১০ জন শহীদ হন ও শতাধিক আহত হন। বুকের রক্ত ঢেলে জীবন দিয়ে সেদিন ছাত্র-জনতা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার্থে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং স্বৈরাচারী সরকার ও প্রশাসনকে বাধ্য করেছিল এ বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি স্থগিত করতে।

কিন্তু এ প্রতিবাদী দিনটির বিপরীতে এদেশে আমদানী করা হয় ‘ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস’ নামে একটি দিন। যে দিনের মাধ্যমে এদেশের তরুণদের ভুলিয়ে দেয়া হয় এই স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসকে। ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় শাসক-শোষকের অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংস্কৃতিকে। যে সংস্কৃতি লালনের মাধ্যমে এদেশ একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হয়েছিল। যার ফলে, প্রতিরোধ দিবস পালনের বদলে তরুণরা এদিন মজে থাকে ভালোবাসা দিবসের আনন্দ স্ফুর্তি নিয়ে। এ ভিনদেশী সংস্কৃতির করাল গ্রাসে এদেশের তরুণ সমাজ যেন গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যেতে বসেছে।

আমরা দেখতে পাই, স্বৈরাচারী এরশাদ এখনো সরকারের মধ্যে থেকে বেহায়া মুখটি দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই ১৪ ফেব্রুয়ারির খুনের জন্য তার কোন অনুশোচনাও নেই। এদেশের ক্ষমতার স্বাদ পেতে তিনিও এখন মরিয়া হয়ে এই জোট, ঐ জোটে দৌঁড় লাগাচ্ছেন। তরুণ প্রজন্মকে এই বেহায়াদের এবং যারা তাদের কোলে ভিড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসতে চায় তাদের মুখোশও উন্মোচন করে দিতে হবে।

আগামীকালের স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসে শাহবাগের প্রতিবাদী তরুণ প্রজন্ম কিসের আওয়াজ তুলবে জানি না। তবে আন্দোলনের মঞ্চ থেকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে জেনে খুব ভালো লেগেছে। আমাদের সকলের মনে রাখা প্রয়োজন, এদেশে স্বৈরাচার বার বার এসেছে। স্বৈরাচারের ভুত এখনো লুকিয়ে আছে এদেশের মাটিতে। তাই, আমি মনে করি এই ভ্যালেন্টাইন ডে’র সংস্কৃতি থেকে এদেশের তরুণ সমাজকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশকে সত্যিকার একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

আর এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের ফাঁসি হলেই এদেশ সত্যিকার অর্থে একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। এদেশের সংবিধান থেকেই সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে হবে। ’৭২ সাল থেকে যারা এদেশ শাসন-শোষণ করে আসছে তারা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচয় দিলেও তারাই সংবিধানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষটি রোপন করে পরিচর্যা করে আসছে ৪১ বছর ধরে। ফলে এদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো বার বার মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে। কাজেই যতক্ষণ না রাষ্ট্রের ভিতরে রোপিত সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষটি সমূলে উৎপাটন করা যাবে না ততক্ষণ পর্যন্ত এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনীত মানুষ, সংখ্যালঘু জাতি ও জনগণ প্রকৃত অর্থে একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাদ পাবে না।শাহবাগের সূচিত তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের গতি এই লক্ষ্য অর্জনের দিকেও অগ্রসর হবে এটাই আশা রাখি।