ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর ছবি। ফেসবুক থেকে শেয়ারকৃত।

জন্মমৃত্যু জগত-এর এক অমোঘ নিয়ম। এবঙ তার নিয়ন্ত্রণাধীন সকল মানুষ। রোজ যেমন জন্ম নিচ্ছে অগণিত নতুন শিশু তেমনি মৃত্যুদূত কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য জীবন। আমরা জগতবাসি স্মরণ করি কারও জন্মদিন, কারও মৃত্যুদিন। আজ বাংলাদেশ-এর জনপ্রিয় প্রধান কবিদের অন্যতম এক কবি নির্মলেন্দু গুণ-এর আটষট্টিতম জন্মদিন। ষাটের দশকের এই কবির জন্ম নেত্রকোণার বারহাট্টা উপজেলার কাশতলা গ্রামে ১৯৪৪ সালের ২১ জুন। কবির বাবা সুখেন্দু প্রকাশ গুণ চিত্রশিল্পী ও কাব্যপ্রিয় ছিলেন। বাবার মুখে কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি শুনে শিশুকালেই কাব্যের সঙ্গে আত্মিকযোগ ঘটেছিলো। মাত্র চার বছর বয়সে হারান মা বীনাপাণি-কে। বাবা আবার বিবাহ করেন চারুবালা-কে। নতুন মায়ের হাতেই হয় কবির লেখাপড়ার হাতেখড়ি। এবঙ স্কুলদিনে শ্রেণীকক্ষেই প্রথম ছড়া রচনা করেন কবি স্কুল নিয়ে। ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই নির্মলেন্দু গুণ-এর প্রথম কবিতা প্রকাশ হয় নেত্রকোণার “উত্তর আকাশ” পত্রিকায়। কলেজ জীবনে জড়িয়ে যান ঢাকার প্রায় সব জাতীয় পত্র-পত্রিকার সঙ্গে। ১৯৬৫ তে ঢাকার সাপ্তাহিক “জনতা”-য় প্রকাশ হয় তাঁর রচিত “কোনও এক সংগ্রামীর দৃষ্টিতে”। সেই সময় নিজেও সম্পাদনার কাজ করেন “সূর্য ফসল” সংকলন-এর। যাতে মুখবন্ধ লেখেন কবি সিকান্দর আবু জাফর। সংকলন-এর কবিতাগুলোতে গ্রন্থিত হয় শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে মেহনতী মানুষের বিদ্রোহের ডাক। যা সে সময়ের পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে। কবির বিরুদ্ধে মামলা হয় এবঙ জারী হয় গ্রেফতারী পরোয়ানা। মাথার ‘পরে হুলিয়া নিয়ে কবি ফেরেন এক জায়গা থেকে অন্যত্র। অই অবস্থাতেও কাজ করেন আবদুল্লাহ আবু সাঈদ-এর “কন্ঠস্বর” পত্রিকায়। কবি আবুল হাসান তখন সার্বক্ষণিক বন্ধু তাঁর। অবশেষে মামলা প্রত্যাহার হবার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হবার সুবাদে সহপাঠি হিসেবে পান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা-কে। তখন ৬ দফা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে পূর্ব বাংলায়। সেই সময় সংবাদ-এ প্রকাশ হয় শেখ মুজিব-কে উতসর্গীত কবির কবিতা “প্রচ্ছদের জন্য”। তখন প্রায় সব জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত কবির কবিতা , কলাম প্রকাশিত হচ্ছে। এমন এক দিনেই তরুন কবিদের কবিতা পাঠের আসরে কবি পাঠ করেন তাঁর “হুলিয়া” কবিতাটি। যা তাঁকে তরুণ সমাজে জনপ্রিয় আর খ্যাতির আসনে বসিয়ে দেয়। পশ্চিম বঙ্গের প্রখ্যাত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় “পূর্ব বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা”-য় গ্রন্থভুক্ত করেন “হুলিয়া” কবিতা। খান ব্রাদার্স থেকে সেই সময় প্রকাশিত হয় কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “প্রেমাংশুর রক্ত চাই”। বাংলাদেশ-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে কোলকাতার আকাশবাণী ভবনে “বেতার জগত” পত্রিকার সম্পাদক ডাঃ গাঙ্গুলী-র সহযোগী সম্পাদক-এর দায়িত্ব পালন করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সে সময় কবিতা-ই হয়ে ওঠে শাণিত অস্ত্রসম হাতিয়ার। এ নিয়ে কবির কথা “কবিতা আমার নেশা , পেশা , প্রতিশোধের হিরন্ময় হাতিয়ার”।

এযাবতকালে দেশপ্রেমময় সাহিত্য-র স্বীকৃতি রূপে অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমী পুরষ্কার , একুশে পদক , আলাওল সাহিত্য পুরষ্কার ও কবি আহসান হাবিব পুরষ্কার। নিজের গ্রাম কাশবন-এ প্রতিষ্ঠা করেছেন “কাশবন বিদ্যা নিকেতন” নামের নাধ্যমিক বিদ্যালয়। কবির ঠাকুর্দা রামসুন্দর-এর নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন “রামসুন্দর পাঠাগার”। এমন একজন কবির আজ ৬৮ তম জন্মদিন , কবি নির্মলেন্দু গুণ যিনি আমাদের অনেকের “গুণদা” যিনি আজও কবিতা ও গদ্যে সমভাবে সক্রিয় তাঁর শত বর্ষের আয়ু প্রার্থনা আজকের দিনে এবঙ কবির জন্য লাল গোলাপ শুভেচ্ছা ও সালাম।

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সংগ্রহ-অনলাইন-নিউজ

এই একইদিন আমাদের বাংলাদেশ-এর আরেক ক্ষণজন্মা নক্ষত্রসম কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মৃত্যুদিন।
বরিশাল-এর বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার মিঠেখালি গ্রামে ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবরে জন্ম তাঁর। সত্তুর-আশির দশক-এর প্রিয় কবির তালিকায় লিপিবদ্ধ একটি নাম কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। কবিকন্ঠে কবিতাপাঠে শ্রোতাপ্রিয় একজন কবি ও গীতিকার তিনি। তাঁরই সুর করা লোকগান

“ভালো আছি ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো”

আজও বাংলার আকাশবাতাসহৃদয় জুড়ে আছে। তারণ্যদীপ্ত দ্রোহী এক কবির প্রতীক কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ক্ষণজন্মা জীবনে রচেছেন সাতটি কাব্যগ্রন্থ সহ গল্প, কাব্যনাট্য ও অর্ধ শতাধিক গান। তাঁরই কবিতার লাইন

“জাতীর পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরনো শকুন”

আজও অবিস্মরণীয় এবঙ আশচর্য প্রযোজ্য এই সময়ে। এরকম আরও প্রচুর পঙক্তিমালা তাঁকে পাঠকপ্রিয়তায় অনন্য করে রেখেছে। “সোনালি শিশির” তাঁর একমাত্র গল্পের বই। এবঙ নাট্যকাব্য “বিষ বিরিক্ষির বীজ”। মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৮০ সালে। বিবাহ করেন ১৯৮১ সালে আলোচিত নারীবাদী কবি-লেখিকা তসলিমা নাসরীন-কে। ১৯৮৮-তে তাদের সাত বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। এবঙ কবির ধরা পড়ে দূরারোগ্য বার্জার রোগ। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই জীবনাবসান হয় ক্ষণজন্মা এই দ্রোহী কবির ১৯৯১-র ২১ জুন। আমরা সমসাময়িক কালের। কবির মৃত্যুর স্বল্প আগেই তাঁর সঙ্গে আমার দ্যাখা হয়েছিলো ইন্ডিয়া-হাইকমিশন-এর “ভারত বিচিত্রা” অফিসে। আমি তখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলেই ধানমন্ডিস্থ “ভারত বিচিত্রা” অফিসে যেতাম সম্পাদক কবি বেলাল চৌধুরী-র সঙ্গে দ্যাখা করতে (তিনি আমার প্রিয় বড়চাচা)। সেই সময় সেদিন আমিও গেছি তার অল্প পরেই হাসোজ্জ্বল মুখে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-ও এসেছিলেন, কবি বেলাল চৌধুরী পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, আজও খুব করেই মনে আছে। মোটেও বোঝা যাচ্ছিলোনা যে কবি বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীরে দূরারোগ্য অসুখ ! তার অল্প ক’দিন পরেই পেয়েছি তাঁর মৃত্যুসংবাদ ! সেই সময় চট্টগ্রাম-এর দৈনিক পূর্বকোণ-এ কবিকে নিয়ে লিখেছিলাম। আজ আবার বহুবর্ষ শেষে কবির ২১ তম মৃত্যুদিন-এর স্মরণে লিখতে বসেছি। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আদতেই এক মৃত্যুঞ্জয়ী কবির নাম, কবি-র জন্য লাল সালাম, শ্রদ্ধাঞ্জলি।

২১ জুন ২০১২ ইং