ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আকাশভর্তি মেঘ। বুঝি একটিমাত্র টোকা পড়ার অপেক্ষায়। সামান্য বাতাসেও হয়তো খসে পড়বে বড়-বড় ফোটায় ধূলোমাখা সবুজ পাতায় বর্ষাধারায়। এমনই মেঘলাদিনে ফেসবুকে লগ-ইন করতেই কৃষ্ণচূড়ার রাঙা আভাময় দারুণ এক ছবির দেখা পাই। এবঙ শেয়ার করি ও নিজের ফাইলে সেভ করি। এমন পথে কবে হেঁটেছি মনেও নেই। অথচ ছবিটি দেখেই মনে হয় এ পথ অনেক সুপরিচিত আমারই বাংলার কৃষ্ণচূড়াময় আশ্চর্য আবাহনী। অনেক জখমিত মেঘের ভাষা আধেক বুঝি আর আধেক না বুঝেও আমরা যারা বাংলাপ্রেমী তারা কমবেশি সবাই তার রূপের ছটায় আশ্চর্য মুগ্ধ পথিক। ছবি যেন মনে পড়িয়ে দেয় জীবনান্দ-র কথা-ই –

” বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাইনা আর ”

আমার যেন বহুদিন-বহুকাল এমন করে বাংলার অরূপ মুখটি দেখাই হয়ে ওঠেনি। আজ ছবিটি এই মেঘলাদিনে হঠাত এসে আমায় মনে পড়িয়ে দিলো পথের ধারে রাঙা বিভায় ছড়িয়ে যাওয়া অপরূপ বাংলার মুখ। আমার অনেক-অনেকক্ষণ আর চোখ ফেরানো সম্ভব হয়না। আমি অপার মুগ্ধতায় চেয়ে থাকি প্রিয় বাংলার রাঙা মুখের পানে। গভীরে আহারে-আহারে করা কত না দুঃখভার সওয়া এই বাংলার মাটি। তথাপি সে যে –

“খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি”।

আমরা কত দর্পভরে তারই বুকের উপর স্টিমরোলার চালিয়ে তার বনবনানী-পাহাড়-কাটার ধুমে তাকে নিধন করে বুক ফুলিয়ে হাঁটি। বুটের দাপটে দাবড়ে বেড়াই ধরণী। স্বদেশের আভূমি ভিত্তিমূল নড়িয়ে দিই অবলীলায়। অতঃপর পিনকাটা রেকর্ড বাজাই –

“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি”।

কেন যে এমন জটিল আত্মঘাতি আমরা ! আবার এওতো ঠিক এত জটিল আবর্তে ভেসেও এই আমরাই পড়শিদের আনন্দ-দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে চেয়ে বড় দরদ দিয়ে গাই –

“এক-ই আকাশ এক-ই বাতাস
এক হৃদয়ের এক-ইতো শ্বাস।
দুঃখসুখে বুকের মাঝে এক-ই যন্ত্রণা
ও আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা-যমুনা”।

এই গানটি আমার বিষম প্রিয় একটি গান। কি সুরে কি বাণীতে অনন্য এক হৃদয় জাগানিয়া বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে যায় যখন-ই এই গানটি মনে আসে। মনের যত গ্লানিভার মেঘনা-যমুনার অথই ধারাজলে ধুইয়ে দিয়ে যায়। যদিও চারপাশভর্তি অসহ্য সব কান্ডকারখানায় যথারীতি হৃদয় জুড়ে নামে অঝোর অন্ধকার। তখন আবারও অনেক গ্লানিময় অধ্যায় জেঁকে বসে। ভুলতে বসি কে কবে বাংলার সহজিয়া-সবুজিয়া জলজ জনপদে হৃদয় দিয়ে বাজিয়েছিলো বাঁশি ..

“ও মা তোমায় ভালোবাসি ..”

আমরা আদতেই বাংলার আকাশবাতাসবাঁশি কি ভালোই না বাসি .. ভালোবেসে বাংলার মাঠের পারে মাঠ ভাসানো ঘাটে-ঘাটে পদ্মপাতায় জলের মতোই ঝরতে-ঝরতে মরি। মৃত্যুঞ্জয়ী যারা তাদের পাঁজরের অজর বেদনার ‘পরেই রাজ্যের দায়ভারজনিত অপরাধের গ্লানি জমতে দিই। জানিনা কোন যাদুবলে ঘোচাবো হৃদয়ের অজস্র গ্লানি, তবুও অজানিত গ্লানিমুক্তির পথটি আমার চাই। কোথায় পাবো তারে যদিও জানা নাই। তবুও চাই। আমৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা থাকবে আমার। যদি না পাই তারে কোনও এক আগামী এসে নিশ্চয় গ্লানিমুক্তির পথটি চেনাবে নতুন শিশুদের এই বিশ্বাসে বাংলার ছবিটি সযত্নে বাঁধাই করে রাখি। মেঘলাদিন কৃষ্ণচূড়াময় আভায় জ্বলে –

“আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে-অন্তরে আছো তুমি হৃদ্য় জুড়ে”-র মন্ত্রণা জ্বেলে। এই মন্ত্রণা আমায় দিয়ে লিখিয়ে নেয় যন্ত্রণাজাত শব্দাঞ্জলি .. এইমাত্রই জন্মেছে আমার শব্দগর্ভে .. শিরোনাম দিলাম –

আজন্ম বাংলা আমার মা
~ নুরুন্নাহার শিরীন
—————–
ও আমার প্রিয় বাংলা তুমি যে সইছো একা
এইসব শব্দগর্ভে অপার জীবন
ধকধকে ভস্মমাখা।
জানি তুমি সর্বংসহ মায়ের অধিক ধাত্রীমাতা।
মেঘাচারী আমারও দিনরাত্রি
তোমারই স্বপ্নমাখা।
আজ সেই স্বপ্নজাত রাঙা
কৃষ্ণচূড়ার আভায় ঠেকাই মাথা।

‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ‘পরে
ঠেকাই মাথা’
তুমি যে আমার রক্তে বাঁধা..
তুমি যে আমার রক্তে বাঁধা।
অধম সন্তানে অপরাধ নিওনা মা।
অধম সন্তানে অপরাধ নিওনা মা।

ঢাকা। বাংলাদেশ।