ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

অস্বীকার করবার জো’ নেই যে একদা একদিন বিস্তর শুধু নয় নিরন্তর-ই প্রয়াস ছিলো কি করে কবিতারে ধরা যায়। তো, আজ এই অর্ধজীবন-এর অধিক পার করেই বেশ বুঝেছি এই আমি আদতে বড়ো অর্বাচীনের মতোই সময় কাটিয়েছি ডায়েরীভর্তি বড়-বড় কবিদের হাজারবার লিখে যাওয়া শব্দান্তের-ভাবান্তের ভাবের ঘোরে। আদতে আমার ভিতর তত কবিত্ব নেই যত হলে কবিতা জন্ম নেয় শব্দকে ছাড়িয়ে অনন্য সুন্দরের গর্ভে। যখন তাকে দেখামাত্র শক্তিমান কবির হাত লেখে –

” সুন্দরের হাত দুটি বেঁধে দাও, সময় হয়েছে। ”

এমনতর কবিতার তরেই বর্ষ-বর্ষ সাধনা চলে। আমার তেমন সাধনা এ জীবনে করাই হয়নি যা কবিত্ব বলে চালিয়ে দেয়া যায়। শব্দরা হয়তো তা জানে বলে আমায় দিয়ে লিখিয়ে নেয় রাজ্যের যত চর্বিত-চর্বন জাতীয় শব্দ। হ্যাঁ, শুধু অগণিত কালো-কালো পোকার মতো নাছোড় শব্দ। এতই নাছোড় যে আমি যতই আজ কবিতা নামের ঘোর-কে ছেড়ে দেয়ার অন্তিম চেষ্টায় আছি ততই নতুনের মলাটবদ্ধ ত্যাঁদর শব্দরা যে কোনও ছুতোনাতায় ভিড় জমায় আমারই অবকাশের অবেলায়। অগত্যা ঘুমে আঠা হয়ে আসা দুপুর পায়ে ঠেলেই পা ছড়িয়ে বসতে হয় কম্পিউটারে। এই ছাপ্পান্ন অতিক্রমণের কালেও যে আমি ধরতে পারলাম না কবিতা কারে কয় ! তো, আমারতো বলাই উচিত নিশ্চয় – “কবিতা তোমাকে চাইনা আজ”।

অথচ এই কবিতার জন্যই কি না কালিদাসের কাল থেকে আজকের নতুনতম কবি প্রাণান্ত মনভুবনান্ত চষেই ফসলিত করছে ভুবনের ঊষর মাঠ। আমার মাথায় আসেনা কবিগুরু কি করে অসাধ্য সাধন করে শত-শত কবিতা জন্ম দিলেন ! কি করে নজরুল সৃষ্টি সুখের উল্লাসে – “বিদ্রোহী” কবিতারে ভূমিষ্ঠ করালেন ! সত্যন্দ্রনাথ কি করে – “দূরের পাল্লা” রচলেন ! সুকান্ত কি করে সুতীব্র “ছাড়পত্র” ক্ষুধার রাজ্যে ঝলসে গিয়েও লিখতে পারলেন ! জীবনান্দ কি করে এমন করে – “থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন”-কে বানালেন ! শামসুর রাহমান কি করে – “স্বধীনতা তুমি”-কে তুলে দিলেন মানুষের করতলে ! ভাবতে গিয়ে আমার মাথা নত হয়ে আসে এমন কবিদের কবিতা ছুঁয়ে। যে হাত এমন কবিতা রচে আমার সে হাতে সকল কাঁটা ধন্য হওয়া গোলাপের তোড়া তুলে দিতেই ইচ্ছে ধায়। ইচ্ছের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়ে ভাবি, তবেতো জীবনানন্দ-র কথাটি-ই সত্য যে, সকলেই কবি নয় কেউ-কেউ কবি ! আমার কিন্তু কেউ-কেউ হবার সাধ কিংবা সাধনা কোনওটি কোনওকালেই এতটা তীব্র ছিলোনা যারে কবি ও কবিতার পর্যায়ে ফেলা যায়। তাহলে এ্যাদ্দিনে নিশ্চয় কবিতায় খ্যাতিমানের তালিকায় দাঁড়িয়ে পড়তাম। আমার আজ অভিজ্ঞা এই যে আদতে আমি কেবল শব্দ লিখি। এবঙ আমি হয়তো যে কোনও একটি উছিলায় শব্দের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসি বলেই শব্দ আমায় ছাড়বেনা আমৃত্যু। বহুবর্ষ আগের এক শব্দঘোরেই নিতান্ত অর্বাচীনের মতো লিখেছিলাম – “জেদ” শিরোনামের কিছু পঙক্তি .. মনে পড়ে গেলো আবার ..

ওই কুয়াশার কালো মুখে ভেটো দেবো ঠিক।
দেখে নিও আবার সুনীল হাতে
ওড়াবো কার্তিক।
জানি, পথে চূর্ণ চিতা, স্বপ্নগুলো তাড়া করবেই
পুরনো ভাষায়, কবিতা তবুও
পরিণত তোমাকে আমার চাই।

আজ সেই আমি-ই কবিতারে বলছি – করজোড়ে –
“কবিতা তোমাকে চাইনা আজ”।
কেননা বুঝেছি অনেক ঠেকে, কবিতা অনেক কঠিন সাধনার কাজ। আমার সাধনায় সাধ নেই। আমি যে শব্দ লিখি সেই আমার প্রিয় কাজ, সেই আমার শ্রেয় কাজ। প্রিয় ও শ্রেয় শব্ধাঞ্জলির খোঁজে হাঁটতে যেন পাই যোজন-যোজন পথ। পুরনো ডায়েরীটা মলাটবদ্ধ পড়ে থাকুক একদা এক কালের কবিতার ঘোরেই। পাতায়-পাতায় ধূলো জমুক। তারে কেবল ঝেড়েমুছে আবার তাকে তুলে রাখাই ভালো। কেউ পড়বে কি না, ভুলেও সেই ভাবনাটিও ভাবতে রাজী নই। আজ যে শব্দ লিখেই ভালোলাগা .. তার-ই জন্য আমায় যত দূরে ঠেলে দিক কবিতা, তাতে আপত্তি নেই। এ কিন্তু বিন্দুমাত্র রাগ-বিদ্বেষজাত ভাবনা নয়। ভালোবেসেই লিখলাম অভিজ্ঞালব্ধ ভাবনা। শব্দ-র সনে আমার বিন্দুমাত্র অভিমান নেই। যেমন নেই স্বদেশ-এর সনে। কবিতা থাকুক দূরের বনে-বনে .. স্বদেশ থাকুক আমার শব্দে .. আমার মনে।

ঢাকা। বাংলাদেশ।