ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

এদেশের স্বাধীনতার অজর চেতনাধারী একজন শহীদ জননী-র জ্বলন্ত প্রতীকের নাম জাহানারা ইমাম। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৩ মে পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ-এর বনেদী বাঙালি মুসলিম পরিবারে। বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ আবদুল আলী, মা সৈয়দা হামিদা বেগম। ১৯৯৪ সালের এই দিন ২৬ জুন মিশিগান-এর ডেট্রয়েট শহরের সাইনাই হসপিটালে দূরারোগ্য ক্যান্সারে চিকিতিসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অনেক গূণী এমন জননী-র রূপ জগতে খুব কম-ই আছে।

জাহানারা ইমাম ১৯৪৭-এ কোলকাতার ব্রেবোর্ণ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন বাবার প্রেরণায়। পরবর্তীতে স্বামীর প্রণোদনায় বি-এড করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে। ১৯৬৪-তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন’ ডিগ্রী অর্জন করেন। এবঙ ১৯৬৫-তে বাংলায় এম-এ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ময়মনসিংহে তাঁর শিক্ষকতার শুরু। অতঃপর ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন। এরপরে প্রধান শিক্ষক ছিলেন বুলবুল একাডেমী কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক ছিলেন দুই বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটে খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন কিছুদিন।

অনমনীয় প্রখর ব্যাক্তিত্ব ও চেতনার অধিকারী এমন মহিয়সি জননী জগতে বিরল। স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল লেখনীশক্তিতে রচনা করেছেন অনেক গ্রন্থ। যাদের অন্যতম এই দেশের স্বাধীনতার দলিলসম এক অনন্য ডায়েরী-র প্রকাশ “একাত্তুরের দিনগুলি”। এই রচনা তাঁর ১৯৭১-এর একান্ত ডায়েরীতে ধারণ করা জীবন-এর কঠিনতম সময়ের বাস্তব অভিজ্ঞতাজাত লিপিকা। সেই সময় তিনি তাঁর বড় সন্তান শফি ইসলাম রূমী-কে জননী হয়েই অনুমতি দিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির তরে যুদ্ধে যেতে। যে যুদ্ধে শফি ইসলাম রূমী শহীদ হন। একাত্তুরের সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের জীবন্ত দলিল তাঁর “একাত্তুরের দিনগুলি। অপরিসীম ধৈর্যে অপেক্ষার প্রহর কেটেছে মায়ের .. কি জানি কখন আসে ছেলে .. অথবা ছেলের কোনও বার্তা .. কিংবা গোপনে আর কোনও মুক্তিযোদ্ধাদের দল .. যাদের তিনি সর্বোতঃ সহযোগ যুগিয়েছেন স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত। তাঁর সেই দলিল-এর সামান্য অংশ তুলে ধরছি ..

২০ নভেম্বরঃ
“আজ ঈদ। .. কিন্তু আমি ভোরে উঠেই সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রূমীর সহযোদ্ধা কেউ আসে এ বাড়িতে। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও কিনে লুকিয়ে রেখেছি।

১৭ ডিসেম্বরঃ
“আজ ভোরে বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয়। মঞ্জুর এসেছিলেন, বাড়িতে যারা আছেন, তারাও সবাই ছাদে উঠলেন। ২৫ মার্চ থেকে ফ্ল্যাগপোলটায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে আবার নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই ফ্ল্যাগপোলটাতেই আজ আবার সেদিনের সেই পতাকাটাই তুললাম।
সবাই কাঁদতে লাগলেন। আমি কাঁদতে পারলাম না। জামির হাত শক্ত মুঠিতে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
গত তিনদিন থেকে জামীকে নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তায় আছি। শরীফের মৃত্যুর পর থেকে ও কেমন যেন গুম মেরে আছে। মাঝে-মাঝেই খেপে ওঠে, চেঁচামেচি করে ছুটে বেরিয়ে যেতে চায়, বলে পাঞ্জাবি মারবে, বিহারি মারবে, আব্বুর হত্যার প্রতিশোধ নেবে। ওকে যত বোঝাই এখন আর যুদ্ধ নেই, যুদ্ধের সময় পাঞ্জাবি মারলে সেটা হত শত্রুহনন, এখন মারলে সেটা হবে মার্ডার- ও তত ক্ষেপে ওঠে। কি যে করি! ওর জন্য আমিও কোথাও বেরুতে পারছিনা। তাছাড়া এই যে গুষ্ঠি রয়েছে বাড়িতে! গতরাতেই হোসেন সাহেব ও আসলাম সাহেবরা নিজেদের বাড়িতে চলে গেছেন। কিন্তু বাকিরা নড়তেই চাইছেনা। কি এক দুর্বোধ্য ভয়, এই ঘরের মেঝে আঁকড়ে বসে আছে! আত্মীয়-বন্ধু পরিচিতজন কত যে আসছে সকাল থেকে স্রোতের মতো। তাদের মুখে শুনছি রমনা রেসকোর্সে সারেন্ডারের কথা, দলে-দলে মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকায় আসার কথা, লোকজনের বিজয়োল্লাসের কথা। এরই মধ্যে রক্ত-হিম করা একটা কথাও শুনছি। মুনীর স্যার, মোফাজ্জল হায়দার স্যার, ডাঃ রাব্বি, ডাঃ আলিম চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার এবং আরো অনেকেরই খোঁজ নেই। সাত-আটদিনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কারফিউয়ের মধ্যে এঁদের বাসায় মাইক্রোবাস বা জীপে করে কারা যেন এসে এঁদের চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে। বিদ্যুত ঝলকের মতো মনে পড়ল গত সাতদিনের যখন-তখন কারফিউ দেওয়ার কথা। কারফিউয়ের মধ্যে রাস্তা দিয়ে বেসামরিক মাইক্রোবাস ও অন্যান্য গাড়ি চলাচলের কথা। এতক্ষণে সব পরিষ্কার হয়ে উঠল।
বিকেল হতে-হতে রায়েরবাজারের বধ্যভূমির খবরও কানে এসে পৌঁছল। বড় অস্থির লাগছে। কি করি? কোথায় যাই, কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।
রূমী ! রূমী কি বেঁচে আছে?”

এমন সত্যচিত্র যাঁর হাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে, যা পড়তে গিয়ে বারংবার একজন জননীর আকুল উতকন্ঠার মধ্যেও এদেশের যুদ্ধদিনের অকৃত্রিম ছবিটি ঊঠে আসে, পাঁজর শিহরিত হয় চোখ ভরে যায় জলে .. যাঁর প্রিয় সন্তান শহীদ হয়েছে এদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে এবঙ স্বামীর মৃত্যুও ঘটে তারই প্রেক্ষাপটে, এদেশ তাঁকে কি দিয়েছে সেই প্রশ্নটি আসে।

এদেশে তিনি-ই প্রথম ১৯৯১-র ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম বিরোধীতাকারী গোলাম আযম-কে জামায়াত দলের আমীর করা হলে জনমনে যে বিক্ষোভের জন্ম হয় তারই সূত্রে নেতৃত্ব দেন ১০১ জন সদস্য নিয়ে “ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি”-র ১৯৯২-র ১৯ জানুয়ারীতে। তিনি ছিলেন কমিটির আহবায়ক। তারপর-ই গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মঞ্চ এবঙ ৭০টিরও বেশি সংগঠনের জোটবদ্ধ “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তুরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় কমিটি”। ১৯৯২-র ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে এই জাতীয় কমিটি “গণ-আদালত”-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তুরের নরঘাতক গোলাম আযম-এর ঐতিহাসিক বিচার করে যাতে গোলাম আযম-এর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১০টি অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবঙ ১২জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত গণ-আদালত-এর চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযম-এর দশ-অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা দেন। তিনি গণ-আদালতের রায় কার্যকর করতে সরকারের কাছে দাবী জানান। কিন্তু সেই সময়কার বি-এন-পি সরকার ২৪জন বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গসহ জাহানারা ইমাম-এর বিরুদ্ধে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। অতঃপর হাইকোর্ট বিশিষ্টজনদের জামিন মঞ্জুর করেন। তারপর অনমনীয় জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২-তে গণ-আদালতের রায় কার্যকর দাবী সংবলিত স্মারকলিপি জাতীয় সংসদে পেশ করেন। ততকালীন বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা সহ ১০০জন সাংসদ সংসদে সেটি সমর্থন করেন। অথচ খালেদা-সরকার তা চরমভাবে অবজ্ঞাই শুধু না, তার পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দেন রাজপথে গণদাবীর পক্ষে দাঁড়ানো জাহানারা ইমামসহ আরও অনেক বিশিষ্টজনদের ‘পরে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পুলিশ শহীদ জননীকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে। আমরা সেই সংবাদে ক্ষোভে-লজ্জায় অধোবদন হই। অথচ আজতক এই জঘন্যতম কাজটির জন্য খালেদা ও তার দল বিন্দুমাত্র লজ্জিত নয়। উপরন্তু আজ যখন গোলাম আযম সহ চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীগঙ কাঠগড়ায় তখনও এই দলটি তাদের সপক্ষে। আজ শহীদ জননী-র মৃত্যুদিনে আমার কেবলই ঘৃণাময়-ধিক্কারময় কিছু শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে হৃদয় জুড়ে .. ‘আমরা কি কোনওদিনও ক্ষমা করতে পারি তাদের অপরাধ যাদের নির্দেশে পুলিশ-এর হাত উঠেছে শহীদ জননীর শরীরে???”

আজকের দিনে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম-এর অজর স্মৃতির স্মরণে জানাই হাজার সালাম, শ্রদ্ধাঞ্জলি।

২৬ জুন ২০১২ ইং ।