ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

একটি বিদ্যালয়ের ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহিত।

একসময় পাঠশালায় শিক্ষক-এর বত্রাঘাত ছাত্রের পিঠে পড়েনি এমন দিনের কথা ভাবা যেতোনা। তাই পাঠশালায় না যাওয়ার কত যে ছলছুতো খুঁজতো সেকালের ছাত্রছাত্রীরা .. কিন্তু আবার এও ঠিক যে গুরু-শিষ্যের এক সস্নেহ সম্পর্কও যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান ছিলো সেই আমলে ছাত্র-শিক্ষক-এর। এখনকার আধুনিক কালের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটি তেমন আর নেই-নেই করেও খানিকটা কিন্তু আজও আছে বলেই মনে করি। নইলে শিক্ষকের উপর ছাত্রছাত্রীর শ্রদ্ধাবোধ-ই থাকতোনা। পারস্পরিক স্নেহ-শ্রদ্ধার সম্পর্ক ছাড়া গুরু-শিষ্যর সম্পর্কটি নিরেট শিক্ষা-বাণিজ্য হয়ে দাঁড়ায়। যাতে প্রকৃত শিক্ষায় ঘাটতি রয়ে যায়। ফলতঃ বিদ্যাশিক্ষা হয়তো হয়, হয়না কেবল বিদ্যালয়ের অন্যতম শিক্ষাটি। যেটি অন্তর আলোকিত করেই শিক্ষার্থীকে শিক্ষক দান করেন। যাতে শিক্ষার্থী গড়ে উঠতে পায় একজন আলোকিত মানুষ রূপে। বিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এই। অথচ বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষা-বাণিজ্য গেড়ে বসেছে এমন-ই যে তার জন্য আইন প্রণয়ন করতে হচ্ছে।

যাহোক, আমি আসলে শিক্ষা-বাণিজ্য তথা কোচিং-বিজনেস বিষয়ে লিখতে বসিনি। আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাইছি, এককথায় যেটি অমানবিক। ইদানিং মাঝেমধ্যেই সংবাদে অনেক অমানবিক-নির্মম ঘটনার কথা প্রকাশ হয়, যা পাঠে শিক্ষক না জানোয়ার ভেবে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। এমন একটি নির্মম সংবাদ পাঠেই আমার আজকের লিখতে বসা। ঘটনাস্থল মির্জাপুর উপজেলার হিলড়া আদাবাড়ি মোকছেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়। গণিত ক্লাশে শিক্ষক জয়নাল আবেদীন অঙ্ক কষতে দিয়েছেন। ১৫ বছরের সাবিহা অঙ্কে সমীকরণ-এর সূত্র না দেয়ার অপরাধে শিক্ষক জয়নাল আবেদীন মহাক্ষিপ্ত হয়ে সাবিহা-কে বেত্রাঘাত করেন নির্মমভাবেই। অতঃপর পুনরায় অঙ্কটি করার নির্দেশ দেন। পিটুনি খেয়েও সাবিহা শিক্ষকের নির্দেশ মেনে পুনরায় অঙ্কটি কষে খাতা দেখাতে গেলে খাতাটি শিক্ষকের গায়ে লাগার অপরাধে শিক্ষক ক্ষেপে আগুন হয়ে ছাত্রীর চুল টেনে ধরে বেঞ্চে শুইয়ে বেদম বেত্রাঘাতে পিটিয়ে অজ্ঞান করেন। তারপর অই অবস্থায় রেখেই ক্লাশ থেকে বেরিয়ে যান। ভীত সহপাঠিরা শিক্ষকের বেরিয়ে যাবার পরেই সাবিহার মাথায় পানি ঢেলেও জ্ঞান ফেরাতে ব্যার্থ হলে অন্য দুজন শিক্ষকের সহায়তায় সাবিহাকে শিক্ষক-মিলনায়তনে রাখার বন্দোবস্ত করেই সতীর্থরা সাবিহার বাড়িতে খবর দিলে অভিভাবকরা ছুটে আসেন। এবঙ অবস্থা দেখে সাবিহাকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাস্পাতালে নিয়ে যান। ঘটনার সঙ্গেসঙ্গেই যেটি বিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষের করণীয় ছিলো। বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যখন ছাত্রীকে বেত্রাঘাতে অজ্ঞান করে ফেলেন তখন ছাত্রীর জরুরী চিকিতসার দায়িত্বটি কার ? নিশ্চয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। সাবিহার ক্ষেত্রে যা পালন করেনি তার স্কুলের শিক্ষকরা। বর্তমানে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে চিকিতসাধীন সাবিহার অবস্থা গুরুতর সঙ্কাটাপন্ন। বেদম বেত্রাঘাতে হাই-ফিভার সহ ভয়ে বারবারই জ্ঞান হারাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে বিদ্যালয় কমিটি এমন শিক্ষক-এর নিয়োগ দেন কিভাবে ??? এই শিক্ষক নামধারী জানোয়ার কি বাড়িতে তার মা-বোন-কন্যার গায়েও এইভাবে হাত ওঠান তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে ???

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহি প্রধান (ইউএনও) শাহানারা বেগম-এর বরাত দিয়ে সংবাদে প্রকাশ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষক-এর বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরাও চাই অবিলম্বে এমন শিক্ষকের দৃষ্টান্তময় শাস্তিবিধান। সেই সংবাদ পাঠের জন্যই অপেক্ষা আজ .. সাবিহা সুস্থ হলেও এই জীবনে তার শিক্ষকভীতি দূর হবে কি ? এই প্রশ্নটি অবধারিতভাবেই এসে দাঁড়াচ্ছে .. জবাবটি খুঁজতে আমাদের নিশ্চয় সামাজিক অবক্ষয়ের মূলে গিয়েই কুঠারাঘাতে উপড়ে ফেলা দরকার সকল অমানবিক-নির্মমতার নপুংসক বীজ। আমরা আমাদের পুত্রকন্যাকে বিদ্যালয়ে শিক্ষিত হতেই পাঠাই। এমন অমানবিক-নির্মমতার শিকার হতে নয় নিশ্চয়।

একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহিত।


২৯ জুন ২০১২ ইং