ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ফেসবুকে এক পাতাকুড়ানি মেয়ের মায়াবী ছবি দেখেছিলাম। দেখামাত্র আমার মন থেকেই উঠে আসে কয়েক ছত্র ..

পাতাকুড়ানি মেয়ে পাতা কুড়িয়ে খায় ..
কেউ কি তাহার পাশে থমকে দাঁড়ায় !
কেউ কি তাহার হাত দুখানা ধরতে যায় !
পাতাকুড়ানি মেয়ে পাতা কুড়িয়েই খায় ..
কেউ কি তাহারে বলে আয় ..
কেউ কি তাহারে ভাসায় ভালোবাসায় .. !

মনে হয়না। খুব মনে পড়ছে আমাদের পাড়ায় সেই প্রায় পঞ্চাশ বর্ষ আগে মেথরপট্টি থেকে মেথর-মেথরাণীরা এসে সবার ঘরে-ঘরে দাঁড়াতো। গড় হয়ে প্রণাম জানিয়ে তাদের মাসোহারা আদায় করার অদ্ভুত রেওয়াজ ছিলো। সবাই তাদের কিছু না দিয়ে বিদায় দিতো। তাদের মধ্যে বেশ সুন্দর এক মেথরাণী ছিলো শোভারাণী নামের। আমারা পাড়ার ক’জন একসঙ্গে দল বেঁধে হেঁটে স্কুলে যেতাম। পথে প্রায়ই দেখা হয়ে যেতো শোভারাণীর সঙ্গে। হাঁটু পর্যন্ত পাছাপেড়ে লাল-হলুদ শাড়িতে সে যেন ঝলোমলো করতো – হাতভর্তি লাল কাচের চুড়ি, খোঁপায় লাল জবা গোঁজা। আমার খুব ভালো লাগতো তারে। কিন্তু বন্ধুরা তাকে দেখলেই একটু সরে যেতো। কেউবা নাকে ওড়না দিতো। যা দেখে শোভারাণী ঝাঁঝিয়ে উঠতো –

“ও ভদ্দরনোকের কন্যে, গন্ধ লাগলে হাগিসনে .. হাগিস কেনে?” বলে। আমার মনে হতো – তা-ই-তো ! তা-ই- তো ! শোভারাণী তো ঠিক কথাই বলছে ! আজও শোভারাণীর উজ্জ্বল রূপ ভুলিনি ।

পাতাকুড়ানি মেয়ের কি নাম জানা নেই। রূপেও হয়তো ঘাটতি ঢের। তবুও কোথায় যেন আশ্চর্য মিল তাদের। মিলটি তাদের অবস্থানগত।

তাদের কথা যখন ভাবি – আমার তখন নিজের কথা – শিকড় জাগানিয়া মাঠের কথা – মাঠের ধারে রেললাইনের পলিথিন মোড়ানো বস্তিবাসি ছেলেমেয়ের কথা -নিজের আত্মজার কথা – মনের মধ্যে নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকে ..। আমার স্বদেশের এমনতর ছবির গল্পটি আদতে যে মোটেও গল্প না – জ্বলন্ত সত্য। এবঙ আমরা যে সত্যই মোটে দাঁড়াইনা তাদের পাশে – ধরতে যাইনা তাদের হাত .. তার কি কোনও জবাব আছে? তারা কি অচ্ছুত প্রজাতি? হাত ধরলে আমাদের জাত যাবে? অই যে পাতাকুড়ানি মেয়েটি পাতা কুড়িয়েই খায় .. তারওতো আমার মতোই দেশের ‘পরে জাতিগত অধিকার রয়েছে। কিন্তু জন্মসূত্রে সে বস্তিবাসি বলেই তার অধিকারের জায়গাটি এতই কম যে তা নিয়ে ভাববার প্রয়োজনও যেন পড়েনা কারও। যদি বা পড়ে তা শুধু ছবি হয়েই। শুধুই কবিতায়-লেখায়-শিল্পে-নিউজে। অথবা কাজের জন্য। সে কিন্তু তেমন করে জানেওনা যে এই দেশ তারও। তারও রয়েছে আমাদের মতোই জাতিগত একান্ত অধিকার। কারণ সেও নাগরিক বলেই ভোটের সময় তার ভোটটি জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিষম দামী হয়ে দাঁড়ায়। তখন তাদের পদধূলি পড়ে বস্তিবাসির দোরে। সেই ভেবেই লিখেছিলাম আমার “পড়েছো জানালাগান?”-এ

“.. ভেজামাঠে-ধূলোঘাসে
কুঁকড়ানো যে শিশুরা স্বপ্ন ভালোবাসে
ইস্কুল তাদের চিরকালের প্রান্তর।
আনন্দ তাদের অন্ধকারের ভিতর।
ওরা বোঝেনা ডিজিটালের মানে।
ওরা শুধু ভোটের সময়
মেতে ওঠে শ্লোগানে-শ্লোগানে।”

অথচ স্কুল-কলেজের শিক্ষার কথা দূরে থাক তাদের জীবনমানের উন্নয়ন-এর কথাটি ভুলেই যাওয়া হয় ভোটপর্বের পর। এমন কেন হয় তাদের বেলায় ! যাদের জন্য জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েই কাজ করা উচিত .. কিন্তু উচিত কাজটি তখন আর মনেই নেই ভোটজয়ী প্রার্থীর। তিনি তখন নিজের স্বার্থের উন্নয়ন কাজেই নিবেদিত। এমন অবস্থার বদলে যাওয়ার ছবিটি আমরা যতই দেখবো ভেবেই প্রতিনিয়ত লিখি-বলি .. সেসব কেবল কথার কথাই। বদল আর আসেনা। কাল থেকে কালাতিকাল যায় কালের গর্ভে .. ছবিটি যেমন তেমন-ই রয়ে যায়। হাজার মাল্টি স্টোরেজ হাইরাইজ ভবন-মার্কেট-রেঁস্তোরা-ব্রীজ-কালভার্টের নীচে অন্ধকারের থাবায় জীবন্ত ভাসমান উদ্বাস্তুর চালচিত্র .. এই জীবন আমাদের চারপাশের হলেও আমরা উদাসীন নহতেই ভালোবাসি। সেসব জীবনের পাশ কাটিয়ে হেঁটে বেড়াই। আমরা কি আদতে স্বদেশকে ভালোবাসি ! যদি ভালোইবাসি তবেতো স্বদেশের সকল ম্লানমুখকেও একইভাবে ভালোবেসে তাদের মুখের হাসির জন্য কাজ করতাম আমরা। তবেতো এমন পাতাকুড়ানি মেয়ে ছবি হয়ে দিতোনা ধরা আমাদেরই ক্যামেরায় !

কলেজদিনে আচমকা হয়তো স্বদেশের সবুজ গন্ধে আপ্লুত হয়ে লিখেছিলাম –
“অভিমান নেই স্বদ্শের সাথে” ..
আজও অনেক জটিল ধূলোম্লান ধূসর বেলায় সবুজ-এর গন্ধ ভেসে আসে বলেই লিখি বটে .. কিন্তু আজকের লেখায় একইসঙ্গে নিজের বিবেকের সুতীব্র প্রশ্নবিদ্ধও হই। সেই জবাবদিহিতার মুখে নিজের স্বদেশের শিকড়ে জখমিত মেঘের মতোই দাঁড়ায় এসে পাতাকুড়ানি মেয়ের মলিন মুখখানি !
দেখে যেন মনে হয় চিনি ..
আমারই পড়শি .. বস্তিবাসি ..
পাড়ায় হেঁটে যেতেই দেখি ..
আমি কি চিনি উহারে !

১৪২১ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।