ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বন্যরা বনে সুন্দর চিরন্তন গ্রামবাংলার ছবি

সম্প্রতি অনলাইন সংবাদপাঠে জানতে পাই বাংলাদেশ-এর শ্রীমঙ্গলের প্রাণীপ্রেমী সিতেশ বাবুর কর্মকান্ডের কথা। তাঁর বর্তমান বয়স ষাটের কোঠায়। সিতেশ রঞ্জন দেব তরুণ বয়সে ছিলেন দারুণ শিকারী। তখনও দেশে শিকার নিষিদ্ধ হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি যখন দেখেন যে এদেশে ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গল ক্রমশঃই কমতে থাকায় বিপন্ন বন্য প্রাণীরা, তখনই বিপন্ন-বিলুপ্ত-প্রজাতি প্রাণীর জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিপন্ন করে ছোটেন বিরলপ্রজ সিতেশ বাবু। সম্প্রতি অনলাইন নিউজে তাঁর কথাটি পড়ামাত্র আমার মনে হয়েছে এই বিরলপ্রজ মানুষটির কথা ছড়িয়ে দেয়া উচিত। যাতে জীবপ্রেমীরা তাঁর কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণীর জীবন রক্ষায় সহায়ক হতে পারেন।

বিগত চল্লিশ বছরে প্রায় কয়েক হাজার প্রাণীকে উদ্ধার করার কাজটিতে আত্মনিবেদিত সিতেশ বাবু। আশপাশে কি দূর-দূরান্ত হতেও যদি কোনও বিপন্ন প্রাণীর খবর পান অমনি নিজের যানবাহন নিয়ে ছোটেন প্রাণীটিকে উদ্ধার করে সেবা-সুশ্রূষা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে। নিজের বাড়িতেই গড়েছেন বিভিন্ন প্রজাতির বিরল-বিপন্ন-বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীর জন্য সেবাশ্রম। এ কাজে আজ তাঁর ছেলেমেয়েরা বাবার সঙ্গেই সহায়ক হিসেবে কাজ করছে দিনরাত। যা দেখে এলাকার মানুষ তাঁর বাড়িকে বলে “সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা”। বিগত চল্লিশ বছরে কয়েক হাজার প্রাণী উদ্ধার করেছেন সিতেশ বাবু। উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের চোখ-মুখ-শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে তবুও প্রাণীটিকে উদ্ধার না করে ফেরেননি। এখন বয়সজনিত কারণেই খানিক ক্লান্ত হলেও ব্যায়-সাপেক্ষ সেবাশ্রম-এর কর্মকান্ড থামেনি। এলাকাবাসির দাবীতেই বিগত দশ বছর প্রাণী সংক্ষরণ সংশ্লিষ্টদের বরাবরে একাধিকবার আবেদন করেন তাঁর বাড়িতে রাখা প্রাণীগুলোকে নিয়ে একটি বৈধ চিড়িয়াখানা চালুর অনুমতি দেয়ার জন্য। অথচ অনুমতি মেলেনি। এতগুলো প্রাণীর দায়িত্ব সামলে চলেছেন একাই। ব্যায়বহুল বলেই হিমসিম অবস্থা সত্বেও প্রাণীসেবায় নিবেদিত আজও।

ঠিক এইসময়ে তাঁকে অবাক করে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্ণর ডঃ আতিউর রহমান। তাঁর-ই পরামর্শে সিতেশ বাবু গড়ে তোলেন “বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন”। আর গভর্ণরের অনুরোধে দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও সহায়তা দেয় ফাউন্ডেশনে। গভর্ণর নিজেও শেলটেক থেকে পাওয়া তাঁর এ্যাওয়ার্ড-এর এক লক্ষ টাকা দান করেন। ফলে সিতেশ বাবু নব উদ্যোম পান। তাঁর ফাউন্ডেশনে শুধু প্রাণীসেবাই নয় সেবার পরে প্রাণীকে অবমুক্ত করার কাজটিও চলছে। কেননা সিতেশ বাবু “বন্যরা বনে সুন্দর” এই নীতিতে প্রাণীসেবা করেন। যার নজির দ্বিতীয়টি নেই এদেশে। সম্প্রতি বিলাস নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া অর্ধমৃত একটি হনুমান বাচ্চাকে উদ্ধার করার পরে সনাক্ত করেন যে এটি বিলুপ্ত প্রজাতির চশমা পড়া হনুমান ছানা। অতঃপর দ্রুত তাঁর সেবা ফাউন্ডেশনে নিয়ে গরম কাপড় পেঁচিয়ে বাচ্চাটিকে তা দেন। মুখে দেন ড্রপারে করে কুসুম গরম দুধের ডোজ। ঘন্টা দুয়েক এইভাবে শুশ্রূষা পেয়ে হনুমান ছানাটি নড়েচড়ে সাড়া দেয়। এখন সেটি সিতেশ বাবুর ফাউন্ডেশনে তাঁর কন্যা সুমনা-র কোলে মানব শিশুর মতোই মাতৃস্নেহে দুধ খাচ্ছে .. ভাবা যায় ! দৃশ্যটি দেখে ফাউন্ডেশন-এর অন্যান্য বানর খুশিতে লম্ফঝম্প করছে ..! হনুমান ছানার নতুন নামকরণ করেছে সুমনা, বাচ্চাটিকে ফাউন্ডেশন-এর সবাই “মনু” নামে ডাকছে !

সর্বশেষ সংবাদ এই যে শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা বাগানের কারেন্ট-এর তারে আটকা পড়া একটি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার পেয়েছে সিতেশ বাবুর দ্রুত ছুটে যাওয়ায়। বানরটির শরীরের অনেকাংশ পুড়ে যাওয়া সত্বেও সিতেশ বাবু অত্যন্ত দ্রুত পল্লী বিদ্যুত-এর মাধ্যমে বিদ্যুত লাইন বন্ধ করাতে সক্ষম হন। নইলে এই বিরল প্রজাতির বানরটির বাঁচার সম্ভাবনাই ছিলোনা। মৃতপ্রায় বানরটিকে উদ্ধার করেই সিতেশ বাবু আপ্রাণ সেবাদানে সুস্থ্য করেন। সিতেশ বাবুর মতো বিরলপ্রজ প্রাণীপ্রেমী মানুষটির কর্মকান্ডে প্রাণীপ্রেমীরা সম্পৃক্ত হলেই এইদেশ একটি বন্য প্রাণী রক্ষায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রূপে বিবেচ্য হবে বিশ্বে আমার একান্ত বিশ্বাস। সিতেশ বাবু শাস্ত্রীয় বাণী “জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” -এর অনন্য একজন ব্যাক্তিত্ব। তাঁকে জানাই হাজার সালাম।


১০ জুলাই ২০১২