ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

“জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে” কবির এই কথাটি এক অমোঘ সত্য রূপেই আসে মানুষের জীবনে একদিন। সেদিন চলে যেতে হয় একদম একাকী দোসর বিহীন। জীবনের সমস্ত প্রিয় অর্জন-বিসর্জনগুলোকে জগতলোকে ফেলেই চলে যেতে হয় অচিন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশ-এর অত্যন্ত জনপ্রিয়-নন্দিত কথা-সাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন আহমেদ ক্যানসারের সঙ্গে অনেকদিন যুদ্ধ করেই বিদায় নিয়েছেন সকল ফেলে একলা – একদম দোসরহীন। এই অমোঘ মৃত্যুর নিয়ম।

হুমায়ুন অাহমেদের কথা লিখতে বসে আমার খুব মনে পড়ছে – যেদিন প্রথম পড়ি তাঁর প্রথম উপন্যাস – “নন্দিত নরকে” অনেকক্ষন আমি চোখের জল মুছেছি উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র রাবেয়া-র মর্মস্পর্শী বেদনাগল্পে। যেন রাবেয়া খুবর কাছের কেউ পাড়ার কেউ। নিজেকেও রাবেয়া চরিত্রে কল্পনা করে আরও হাপুস অঝোর কান্না পেয়েছে। বয়সটা তখন তেমনই ছিলো। বইটি পড়ে ডঃ আহমদ শরীফ-এর মন্তব্য –

“বাঙলা সাহিত্যে এক সুনিপুন শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার লগ্ন যেন অনুভব করলাম।”

আবুল ফজল-এর মন্তব্য –

“এত অল্প বয়সে রচনার এমন সংযম খুব কম দেখা যায়। তোমার লেখনী জয়যুক্ত হোক।”

তাঁদের কথা যে কতটা সত্য তা আজ বলার অপেক্ষা রাখেনা। তার অল্প পরেই প্রকাশিত – “শঙ্খনীল কারাগার”।
অতঃপর – “তোমাদের জন্য ভালোবাসা।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থাতেই একের পর এক লেখার মাধ্যমে ক্রমেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছান। যে যা-ই বলুক বাংলাদেশের বইবিমুখ অসংখ্য মানুষকে হুমায়ুন আহমেদ করতে পেরেছেন তাঁর পাঠক। প্রজন্মের একটি বিশাল অংশকে তিনি বইমুখি করার দাবীদার। বইমেলায় আমি স্বয়ং দেখেছি ক্রেযি তারুণ্য তাঁর নতুন বই কিনছে একরকম হুমড়ি খেয়েই। তিনি যেদিন স্টলে আসেন অটোগ্রাফ-এর উপচে পড়া ভিড়ের চাপে গলদঘর্ম অবস্থাটি সামলাতে মেলা কর্তৃপক্ষকে যথেষ্টই বেগ পেতে হয়েছে। আমি আবার ভিড়ভাট্টায় অভ্যস্ত নই বলেই কখনও তেমন কাছে ভিড়িনি। উপরন্তু আমার কুনো স্বভাব বরাবর আমাকে জনপ্রিয়দের নিকট হতে দূরে-দূরেই রেখেছে আজও। হুমায়ুন আহমদ-এর বাবার পোস্টিং এর সুবাদে তাঁরা যখন কুমিল্লার একটি ছোট ভাড়াবাড়িতে থাকতেন, আমার এক প্রিয় বন্ধুর বাড়ি ছিলো তারই পাশে। কলেজে তখন বন্ধুরা বেশ আগ্রহ নিয়ে “নন্দিত নরক”-এর রচয়িতার কথা জানতে চাইতাম ববি-র (বন্ধুর নাম) কাছে। ববি-র ততো আগ্রহ ছিলোনা। তবুও আমরা জানতে চাইতাম। অথচ কোনওদিনই পরিচিত হবার বিষয়টি ভাবিনি। আমাদের সময় আবার এসবে গুরুজনদের যথেষ্ট বাধানিষেধ ছিলো। যাহোক, আজ যথেষ্টই খচখচানি অনুভব করছি এই ভেবেই, আমি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রচুর বই পড়েছি কিন্তু কোনও আলোচনা লিখিনি, তাঁর জীবনাবসানে লিখছি .. বেঁচে থাকা জীবনে আমরা আদতে এমনই করি .. যদিও হুমায়ুন আহমেদ এমন খ্যাতিমানতার শিখর ছুঁয়েছেন জীবদ্দশাতেই, যে সেই খ্যাতি জীবনভর সাধনাতেও অনেকেরই মেলেনা। তবুও সত্য এই যে মৃতের কি যায় আসে জীবিতদের সহস্র কথায় ! তবু চলে যাওয়া মাত্র অজস্র লেখায়-কথায় ভরে যায় জীবিতদের চারপাশ ! আমিও আজ জীবিতদের একজন বলেই না লিখে থাকতে পারছিনা ! এ এক অদ্ভুত স্বভাব জীবিতের !

হুমায়ুন আহমেদ-এর একটি নাটকের গান মনে পড়ছে –

“আসমান ভাইঙ্গা জ্যোতস্না ঝরে
আমার ঘরে জ্যোতস্না কই
আমার ঘরে একহাঁটু জল
পানিতে থইথই”

গানটি আমার অনেক ভালোলাগা গানের একটি, মাঝেমাঝেই গুনগুনাই। আজ গুনগুনানির বদলে ভারাক্রান্ত হয়েই ভাবছি হুমায়ুন আহমেদ প্রথম জীবনে অনেক ভালোবেসে কিশোরী প্রায় গুলতেকিন-কে ঘরে তুলেছিলেন। গুলতেকিন-এর কথা তাঁরই বই থেকেই পড়া। পরবর্তীতে পড়েছি তাঁর বিষম প্রিয় কন্যাদের কথাও। তাদের অশ্রুজলের কথা তিনিতো আর জানবেন না ! তারা যেন তাঁর সকল অপরাধ ক্ষমা করতে পারে .. হৃদয় হতে উঠে আসায় এই কথাগুলো না লিখে পারছিনা।

সকল ফেলে ঊর্ধ্বলোকে চলে যাওয়া হুমায়ুন আহমেদ লিখেছিলেন –
“আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই” – নামের বই। বইটি তার প্রচ্ছদে চুপচাপ মলাটবদ্ধ পড়ে আছে। কেবল যিনি রচনা করেছেন তিনি-ই নেই। নিজেকে আর খুঁজিয়া বেড়াতে কলম ধরবেন না কোনওদিন।

২০ জুলাই ২০১২ ইং
(*প্রয়াত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যক, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার হুমায়ুন অাহমেদের প্রয়াণে লিখেছিলাম।*)

ঢাকা। বাংলাদেশ।