ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

“শ্রাবন মেঘের দিন” নামের অনন্য একটি ছায়াছবি বানিয়েছেন যিনি, নিজেই আজ এমন শ্রাবন দিনেই ফিরলেন নিজের প্রিয় বাংলাদেশে … জীবিত না … মৃতের দলভুক্ত হয়েই, বিপুল নন্দিত আর বিপুল খ্যাতিমান রূপকার হুমায়ুন আহমেদ। বাংলাদেশ হতে জীবিত গিয়েছিলেন … সম্পূর্ণ সেরে ওঠার কাঙ্ক্ষা নিয়েই … ক্যান্সারযুদ্ধে হেরে গিয়েই আজ স্বদেশ ফিরলেন কফিনবদ্ধ লাশ হয়ে। বন্ধু-স্বজন-পরিবার-ভক্তকুলের আশা ছিলো যে আবার বরেণ্য রূপকার সৃষ্টিকর্মযজ্ঞের মাঝে স্বপ্নের হাত ধরে এগিয়ে নেবেন সকল অসমাপ্ত স্বপ্নকে … সেটি আর হলোনা … কিন্তু হবেনা এমন ভাবতে সত্যি বিষমভাবে কেঁদে উঠছে আজ হৃদয় …

পড়েছি একজীবনে অনেক জীবনের কথা তাঁরই অজস্র লেখায়। তাঁর শৈশবকাল তাঁর তারুণ্যলাল জীবন গাথাও পড়েছি, উথালপাথাল প্রেমে পড়েই প্রথম বিবাহ এবঙ তিরিশ বছর পর বিচ্ছেদ। দ্বিতীয় জীবন। অতঃপর খানিক যেন গুটিয়ে চলা খোলসাবৃত শামুক-জীবন। সেই জীবনে শাওন-নিষাদ-নিনিত একান্ত সঙ্গী। অকস্মাত ক্যান্সার ধরা পড়ার সংবাদ। তাতেও বিচলিত হননি। যেন অত্যন্ত্য স্বাভাবিক বিষয় হিসেবেই চিকতসার জন্য বিদেশ যাওয়া। বারোটি কেমো-থেরাপির পরে স্বদেশ ফিরে আসা শেষবারের মতো। প্রিয় নুহাশপল্লী, প্রিয় গ্রামের বিদ্যাপিঠ, মায়ের সঙ্গে বন্ধুর সঙ্গে একান্ত সময় কাটিয়ে পুনরায় ক্যান্সার-এর সর্বশেষ চিকিতসায় যাওয়া অস্ত্রপচার-এর জন্য। সেই যাত্রাই শেষযাত্রা জীবিত হুমায়ুন আহমেদ-এর সে কথা কেউ ভাবেনি। হুমায়ুন আহমেদ নিজে কি ভেবেছিলেন সে কথা তাঁর শেষের লেখায় ঠিক-ই লিখে গেছেন স্মৃতিকথা হিসেবে –

“নোভা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছে। আমেরিকা থেকে পিএইচডি করে বর্তমানে দেশে ফিরেছে। আমি যখন নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছি তখনকার কথা। ইউনিভার্সিটি আমাকে বাগান করার জন্য দুই কাঠা জমি দিয়েছে। আমি মহা উতসবে শাইখ সিরাজ হয়ে গেলাম। খুন্তি, খুরপাই, কোদাল কিনে এক হুলুস্থুল কান্ড। মহা উতসাহে আমি কোপাই, পানি দেই। বীজ বুনি। আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী কন্যা নোভা। বিকাল পাঁচটায় ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে দেখি, বাড়ির সামনে খুরপাই ও কোদাল নিয়ে নোভা বসে আছে। প্রথমে জমিতে যেতে হবে, তারপর বাসায় ঢোকা। যেদিন ফসলে জমি ভরে গেল সেদিনের দৃশ্য- মেয়ে গাছ থেকে ছিঁড়ে টকটকে লাল টমেটো প্লাস্টিকের বালতিতে ভরছে এবং বলছে- ড্যাডি আই মেড ইট। মেয়ে তখনও বাংলা বলা শেখেনি। তার আনন্দে চোখ মুছি আমি।”

এ তাঁর বড় মেয়ের স্মৃতিকথা। তারপরই লিখেছেন দ্বিতীয় কন্য শিলা-র কথা –

“শিলা। শুরুতে ছিলো শিলা আহমেদ। স্বামী এসে স্ত্রীর নামের শেষে ঘাপটি মেরে বসে থাকা বাবাকে ধাক্কা মেরে দূরে ফেলে দেয়। এখন শিলার নামের অবস্থা কি জানিনা। এই মেয়াটিও বড় বোনের মতো মেধাবী। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স ও এমএ-তে ইকোনোমিক্সে প্রথম শ্রেণী পেয়েছে। তখন শিলার বয়স বারো কিংবা তেরো। সবাইকে নিয়ে লসএনজেলসে আসা। হোটেলে ওঠার সামর্থ্য নেই। ওঠা হলো বন্ধু ফজলুল আলম-এর বাসায়। আমি ক্যাম্পিং পছন্দ করি ফজলু জানে। সে বনে ক্যাম্পিংয়ের ব্যাবস্থা করল। আমরা জঙ্গলে এক রাত কাটাতে গেলাম। গভীর রাতে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙল। দেখি, শিলা বসে আছে। ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি বললাম, মা কি হয়েছে? শিলা জানায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, সে নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা। আমি বুঝলাম, এই মেয়ের কঠিন ক্লস্টোফোবিয়া। আসলেই সে নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেনা। আমি বললাম, গরম কাপড় পরো। তাঁবুর বাইরে বসে থাকব। সে বলল, একা একা থাকতে পারব না। ভয় লাগে। কিছুক্ষণ একা থাকতে গিয়েছিলাম। আমি বললাম, আমি সারা রাত তোমার পাশে থাকব। মেয়ে এক পর্যায়ে আমার কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাল। সকাল হল। মেয়ের ঘুম ভাঙল। সে বলল, বাবা, তুমি একজন ভাল মানুষ। আমি বললাম, মা! পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে, একজনও খারাপ বাবা নেই। এখন মনে হয় শিলা বুঝে গেছে পৃথিবীতে খারাপ বাবাও আছে। যেমন, তার বাবা।”

অতঃপর ছোট কন্যার কথা লিখেছেন –

“বিপাশা অন্যসব ভাইবোনের মতোই মেধাবী। (বাবার জিন কি পেয়েছে? হা হা হা। আমাকে পছন্দ না হলেও আমার জিন কিন্তু মেয়েকে আজীবন বহন করতে হবে।) এই মেয়ে ঢাকা উইনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিক্সে অনার্স এবং এমএ-তে প্রথম শ্রেণী পেয়ে আমেরিকায় কি যেন পড়ছে। আমি জানিনা। আমার ধারণা এই মেয়েটি অসম্ভব রূপবতী বলেই খানিকটা বোকা। তার বালিকা বয়সে আমি যখন বাইরে কোথাও যেতাম, সে আমার সঙ্গে একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশি দিয়ে দিত। এ শিশিতে নাকি তার গায়ের গন্ধ সে ঘষে ঘষে ঢুকিয়েছে। তার গায়ের গন্ধ ছাড়া আমি ঘুমোতে পারিনা বলেই এই ব্যবস্থা। যেদিন আমি আমেরিকা রওনা হব, সেদিনই সে আমারিকা থেকে তিন মাসের জন্য দেশে এসেছে। আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। একবার ভাবলাম বলি, মা, অনেক দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছি। ফিরব কি-না তাও জানিনা। এক শিশি গায়ের গন্ধ দিয়ে যাও। বলা হলনা।”

আরও কিছু কথা শেষ জীবনে লিখে রেখে গেছেন –

“আমার এখন চার নাতি-নাতনি। আমি যেখানে বাস করি তা তাদের জন্য নিষিদ্ধ বলে এদের আমি দেখিনা। ওরাও গ্রান্ড-পা ডাকার সুযোগ পায়না। আমার কর্কট রোগের সিলভার লাইনিং হল, এ রোগের কারণে প্রথমবারের মতো আমার তিন কন্যা আমাকে দেখতে তাদের সন্তানদের নিয়ে ‘দখিনা হাওয়া’য় পা দিল। ঘরে ঢুকল তা বলা যাবেনা। বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। সূর্যের চেয়ে বালি যদি গরম হয়- এই আপ্তবাক্য সত্য প্রমান করার জন্য মেয়েদের স্বামীরা মুখ যতটা শক্ত করে রাখার ততটা শক্ত করে রাখল। ঘরভর্তি মানুষ। মেয়েদের দেখে হঠাত যদি আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে কেঁদে ফেলি, সেটা ভাল দেখাবে না।”

মহাখ্যাতিমানের জীবনেও এমন কিছু লুকোনো গাঢ় বেদনা থাকে, লেখক বলেই অন্তিম জীবনের উপলব্ধিজাত কথা লিখে গেছেন। মন বলছে আজ তাঁর কন্যারা তাদের বাবাকে সর্বান্তকরণে অশ্রুজলে শেষবিদায় জানাচ্ছে নিশ্চয়। আশ্চর্যযোগ এই যে আজ আমেরিকা থেকে তাঁর প্রথম জীবনের ভালোবাসার স্ত্রী গুলতেকিন-ও ফিরছেন ! তিনিও মনেমনেই কাঁদছেন নিশ্চয়। শাওন-তো কাঁদবেই। নুহাশ-নিষাদ-নিনিত নিবেদন করবে বাবার কবরে শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলির মাটি।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর “শ্রাবন মেঘের দিন” ছায়াছবিতে সংযুক্ত করেছেন হৃদয়ভাঙা গান –

“মরিলে কান্দিস না আমার দায়”

বাংলাদেশ হৃদয় নিংড়ে কাঁদছে আজ … তিনি-ই শুধু দেখতে পাচ্ছেন না … আল্লাহ তাঁকে চিরশান্তিতে ঘুমোনোর তৌফিক দিন। শ্রাবনদিনে তাঁর এমন মহাপ্রয়ানের দিনে আমার একটি প্রস্তাব –

তাঁর প্রিয় নুহাশপল্লী আর গ্রামের বিদ্যাপিঠ নিয়ে অসমাপ্ত স্বপ্নকে যেন সর্বোত সহযোগ দিয়েই স্বপ্ন পূরণ-এর লক্ষ্যে এগিয়ে নেয় বাংলাদেশ সরকার।

(* প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ-এর ছবি সংযুক্ত করতে মন চাইছেনা আজ আমার … ব্লগ-টিম যদি কোনও ছবি যুক্ত করেই হাইলাইট করতে চান করবেন *)

২৩ জুলাই ২০১২ ইং