ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

বাংলাদেশে এখন বর্ষার ভরা মওসুম। এবঙ বর্ষা মানেই যেন একথাল শাদা যুঁইফুল সদৃশ ভাতের পাশেই সেই দারুণ ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ … প্রবাদসম সেই বাক্যটি মনে আসছে – “ঘ্রাণে অর্ধভোজন” … এই প্রবাদ বাংলাদেশের ইলিশের বেলায় যত প্রযোজ্য আর কিছুতে যেন ততোটা নয়। অথচ আজ কিন্তু মোটেও ইলিশের সেই এক বাড়িতে ভাজা কিংবা রাঁধা হলে সাত বাড়িতে সুঘ্রাণ ছড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটেইনা বলা যায়। বানানো কথা না, এ আজ সকলেই স্বীকার করেন, ইলিশ যেন ক্রমেই হারিয়েছে নিজের সেই মনমাতানো ঘ্রাণ। কারণ? কারণটিও কমবেশি সবার জানা। পদ্মায় পড়েছে বিশাল চড়া, মেঘনা পার বিষিয়ে গেছে কারখানার বর্জ্যে। চাঁদপুরের বেলাতেও এক-ই চিত্র। তো, ইলিশের কি দোষ! উপরন্তু বিষিয়ে যাওয়া নদনদীতে নেই কাঙ্ক্ষিত ড্রেজিং। নেই নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য যথার্থ কর্মযজ্ঞ। ইলিশ তা-ই বিষম দুষ্প্রাপ্য একটি ঝকঝকে রূপালি ঝিলিকের মতোই যেন। বাজারে যদি মেলেও কিন্তু আকাশছোঁয়া দাম। ক্রেতার বাড়ানো হাতটি বাধ্য হয়েই গুটিয়ে নিতে হয় বিরস বদনেই। অথচ একদিন একদম-ই উল্টোচিত্র ছিলো এদেশে ইলিশের। আমরা বেশ সুলভে ইলিশ পেতাম। আমাদের শাদা যুঁই সদৃশ একথাল ভাতের পাশে বর্ষায় ইলিশ ভাজাও থাকতোই। অথবা সরিষাবাটা দিয়ে রাঁধা ইলিশ-এর বাটি টেবিলে আসতোই। এবঙ সে কি সুগ্রাণ ! “ঘ্রাণে অর্ধভোজন” বাক্যটি কেবল তার-ই জন্য রচিত যেন।

আমার আজ ইলিশ-এর কথায় মনে আসছে ছেলেবেলায় আমাদের বাড়ির চিত্র …
আমার একমাত্র ফুপা ছিলেন চাঁদপুরের মানুষ নূর মোহাম্মদ খান (প্রয়াত, তিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশ-এর ইলেকশন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন)। জাজ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় পোস্টিং হলেও আমাদের বাড়িতে যখনই আসতেন ঝুড়ি-ঝুড়ি ফলফলাদি নিয়ে এবঙ এসেই বাবাকে পাঠাতেন তাজা ইলিশ-এর জন্য বাজারে। বাজারের টাকাও বাবার পকেটে গুঁজে দিতেন। রাজগঞ্জ বাজার থেকে টাটকা ঝকঝকে রূপালি ইলিশের একটি-দুটি না, চার-চারটে কিনে নিয়েই ফিরতেন বাবা। দুখানা ডিম হয়নি এমন ইলিশ আর দুখানা ডিমওয়ালা ইলিশ আরও অনেক বাজার ব্যাগভর্তি। বাড়িতে যেন উতসবের আমেজ ছড়িয়ে যেতো। মা ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন রান্নায়। কত পদ যে রাঁধতেন, টেবিলভর্তি। দেখেই প্রাণ জুড়াতো। আর ঘ্রাণের কথা কি লিখি … প্রতিবেশি মোর্শেদ চাচা ঘ্রাণেই এসে যেতেন ! পাশের ডাক্তারবাবুর বাড়িতেও মা একবাটি পাঠিয়ে দিতেন। এমন-ই রেওয়াজ ছিলো তখন। আজকের এমন ভরা বর্ষায় ইলিশের দেখা নেই বাংলাদেশের নদনদীতে …
এ বড়ো কষ্টের।

শুনেছি আজকের বাংলাদেশের সাগর পারেও চলছে জেলেদের অনেক হাহাকার। ভরা বর্ষার মওসুমে জেলারা ইলিশ শিকারে গিয়ে ফিরছে শূণ্য হাতেই। জেলেদের জোরালো অভিযোগ, ভারত আর মিয়ানমার-এর জেলেরা বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ সীমান্তে অত্যাধুনিক জাহাজে ও মাদারবোটে করে এসেই তিন স্তরের জাল ফেলে ফিশিং বোট থেকেই যন্ত্রের সাহায্যে “লাশাজাল”-এ সীমান্ত সাগরের দেড়শো-দুশো কিলোমিটার আটকে ফেলেই ধরছে ইলিশ। এবঙ মাদারবোট ভরে নিয়ে যাচ্ছে। একটি চলে যাওয়ামাত্র আরেকটি মাদারবোট চলে আসছে। এভাবেই ইলিশ চলে যাচ্ছে বাংলাদেশ হতে পড়শি রাজ্যে। জেলেদের এমন অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চয় প্রণিধানযোগ্য। এখনই জরুরীভাবে সরকার-এর সংশ্লিষ্ট মহলের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত মনে করি।

একদা একদিন “মাছেভাতে বাঙালি”-র যে পরিচয় ছিলো বিশেষতঃ বাংলার বঙ্গোপসাগর পারের ইলিশ-এর খ্যাতি, পদ্মার ইলিশ, মেঘনা, চাঁদপুরের ইলিশ-এর খ্যাতি সে কি ক্রমেই ইতিহাস হিসেবে পড়বে আগামী ! একদিন পালাপার্বনে, বাড়িতে অতিথি সমাগমে, জামাই আপ্যায়নে, বর্ষায় একথাল শাদাযুঁই সদৃশ ভাতের পাশেই ইলিশভাজা অথবা ঝাঁজালো সরিষা-ইলিশের মনমাতানো গন্ধ … সেও কি হবে ইতিহাস !

ঢাকা। বাংলাদেশ।