ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

একটি বয়সে এলেই মনে হয় স্মৃতির দিনগুলি বারংবার যে কোনও উছিলায় ঢুকেই পড়ে। এবঙ সেইসব আনন্দদিন মুহূর্তেই বাঙ্ময় হয়ে সজোর কড়া নাড়ে মনন জুড়ে। তখন যারা লিখিয়ে তাদের না লিখে উপায়ই থাকেনা। অর্ধ-জীবন-এর কত না অগণিত আনন্দ-বেদনার মুহূর্ত ! সব হয়তো তেমন মনেও নেই, তারই মধ্যে অনেক আবার আশচর্য তরতাজা। যখন-তখন সতেজ একইরকম। মানুষের বয়স বাড়ে। স্মৃতির ছবিদের বয়স বাড়েনা। হয়তো বাস্তবের কঠিন ধাক্কায় তাদের আজ বেহাল দশা, তবুও ছবিতে ভঙ্গিমা সেই আগের মতো। একদমই চিড় না ধরা। নিশ্চয় এই ছবির মূল্য অপরিসীম।

আমার আজকাল মাঝেমাঝেই প্রিয় শহর আর উড্ডীন বয়সের দিনলিপির ছবিময় প্রহর মনে এসেই যায়। হয়তো এই বয়সে এই হয়। তখন আমরা ক’জন বন্ধু রোজই রাণীর দীঘির পাশ দিয়েই কলেজ যেতাম। কি আশ্চর্য সৌন্দর্যে বহমান দারুণ রূপবতী এক দীঘির দুধারে চমতকার শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের চারপাশেই রাস্তা-বসতি। এই দীঘির পারেই ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজ। অন্য পারের রাস্তা ধরে একটু এগুলেই ‘কুমিল্লা মহিলা মহাবিদ্যালয়’। আমার প্রথম কলেজ জীবনের মধুর দিনগুলি কেটেছে সেইখানে। তখন বাবা পূবালী ব্যাংক হেড-অফিস থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ভিক্টোরিয়া কলেজ ব্রাঞ্চে সেকেন্ড-অফিসার হিসেবে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত। আমরা বন্ধুরা কত যে ক্লাশ ফাঁকি দিয়েই হানা দিয়েছি বাবার অফিসে .. বলতাম ‘এখন আমাদের কোনও ক্লাশ নেই’ .. আসলে আমাদের তখন বাবার অর্ডারে কলেজের ক্যান্টিন-এর সিঙ্গারা খাওয়ার লোভেই যাওয়া .. বাবাও বুঝতেন, অর্ডার দিতেন ক্যান্টিনে আমাদের সবার জন্য সিঙ্গারা আর চায়ের। আহ কি আনন্দময় দিন-ই না ছিলো ! ফিরে আর আসবেনা কোনও দিনও। তবুও স্মৃতি আজও অমলিন।

বাড়ির একদম পাশেই না হলেও কলেজ খুব দূরের পথ ছিলোনা। হেঁটেই যাওয়া-আসার পথে কিংবা অফ-পিরিয়ডের কোনও-কোনওদিন আমরা যার যা জমানো পয়সায় ‘হোটেল সালাউদ্দিন’-এ খেতে যেতাম। দারুণ খাসির পদ থাকতো সালাউদ্দিন হোটেলে ভাতের সঙ্গে। বেশতি পয়সা বাঁচলে খাওয়ার পরে গরম রসগোল্লাও অর্ডার করতাম। আবার হোটেলের মালিক উপস্থিত থাকলে আমাদের সবার জন্য একটা করে রসগোল্লার সাপ্লাই ফাউ দিতেন। কলেজের ছাত্রীদের সন্মানার্থেই। অই হোটেল আজ আর আছে কি নেই জানিনা। আজকের মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রীরা দল বেঁধে এমন সস্তা হোটেলে যায় কি না তাও জানিনা। আমাদের কালে তখন ক্লাশ পালিয়ে খেতে যাওয়া এক দারুণ রোমাঞ্চিত বিষয়। ততোধিক রোমাঞ্চ হতো সামান্য ফাঁকিঝুঁকির প্রহরে গোল হয়ে কলেজ-এর হোস্টেল সংলগ্ন মাঠের সবুজ ঘাসের ‘পরে বসে মুখর আড্ডাবাজি। বিকেল না গড়ানো পর্যন্ত হুঁশ হতোনা।

আরও এক মজার বিষয় এই যে, আসা-যাওয়ার পথেই রাণীর দীঘির পারে ছোট্ট একটি চিলতে বারান্দাঘেরা বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকতোই শ্যামলা একজন পড়ুয়া, বন্ধুদের বিশ্বাস অই পড়ুয়া না কি আমায় একনজর দেখার জন্যই বই হাতেই বারান্দার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতো ! বন্ধুদের এমন ধারণার জন্যই আমি ভুলেও না তাকিয়ে যতটা শক্তমুখ করেই চলে যাওয়া যায় .. তেমন করে চলে যেতাম। একদিন সে কথা ভুলে হঠাত বন্ধুদের কারও মজার কথায় জোরে হাসছিলাম .. ‘বাহ, হাসতে তাহলে জানেন’ শুনে আমিতো হতভম্ব ! কথাটি বলে পড়ুয়া হয়তো নিজেও লজ্জা পেয়েই ঘরে পালায়। তারপর অনেকদিন আর সামনে দাঁড়ায়নি। অনেকদিন পর একদিন আবার আসে, এবঙ সরাসরি আমায় থামতে ইশারা করে, আমরা থেমে যেতেই দ্রুতপায়ে এগিয়ে করজোড়ে আমার সামনে দাঁড়ায় – ‘আপনাকে দারুণ ভালোলাগে, আপনি প্লিজ এতটা রাগ করবেন না, আমি আজই বাড়ি ছাড়ছি, পড়াশোনার কারণে এই ভাড়াবাসায় দুই বছর কাটালাম, এবার স্কলারশিপ পেয়েছি, আমেরিকায় পড়তে যাচ্ছি, জীবনে আর কুমিল্লা আসা হবে কি না জানিনা, ক্ষমা না করা পর্যন্ত যাবোনা’। প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলেই চলে যাওয়া .. আমি সেই প্রথম পড়ুয়ার দিকে তাকাই বাধ্য হয়েই আর বলি যে – ‘খুব বড় অন্যায় কিছ করেন নি আপনি, আর আমার আদতে কোনও রাগ নেই আপনার ‘পরে-‘ .. আমার কথাটি বলার পরে হাসতে থাকি সবাই মিলে .. পড়ুয়া চলে যায়। সেদিন থেকে কোনওদিন আর দেখিনি তারে। হয়তো বড় স্কলার হয়ে কোনও পদে আসীন বিদেশ-বিভুঁই-এই। কলেজদিন-এর স্মৃতির ঝুলি থেকেই আজ আবার এই অর্ধ-জীবন-এর স্মৃতিচারণায় বেরিয়ে এলো।

আরেকজন ছিলো পাগলপারা, জামিল নামের একজন, আলালের ঘরের দুলাল টাইপের, হোন্ডাওয়ালা, কিছুদূর গিয়েই হোন্ডা থামিয়ে হোন্ডার প্যাডেল চেপে অপেক্ষা করতো কখন হেঁটে যাবো পাশ কাটিয়ে ! বিরক্তির চরমে পৌঁছে নালিশ জানাই পাড়ার দাপুটে মোর্শেদ চাচার কাছে। তাতক্ষণিকভাবে খবর নিয়ে মোর্শেদচাচা জানান ‘আরে জামিল, খারাপ না, বাপের পয়সায় হোন্ডা চালায়, গানবাজনা ভালোবাসে, আমি তারে ডেকেই মানা করে দিবো, দেখিস আর বিরক্ত করবেনা’। করেনি আর। কিন্তু প্রতিবেশিকে দিয়ে বাবার কাছে জামিল-এর বাবা প্রস্তাব পাঠিয়েছে ! এবঙ সেই প্রতিবেশির মারফত আমার কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখিত গোটা-গোটা অক্ষরে লম্বা একটা পত্র ! আমি মোটেও সাড়া দিইনি, মন চায়নি। আর মা-বাবা-মোর্শেদচাচাকে কড়া করেই জানিয়েছি আমার মোটেও পছন্দ না। মজার এই বিষয়টিও কলেজদিন-এর কথায় উঠে আসলো।

অন্য আরেক আনন্দ দিনের কথা লিখছি, তখন আমরা মাঝেমাঝে বন্ধুরা গ্রুপে এবঙ একা বিভিন্ন পোজে কুমিল্লা শহরের বিখ্যাত ‘চিত্ররেখা’ স্টুডিওতে ছবি তুলতে ভারি ভালোবাসতাম। আমরা এগারোজন বন্ধুরা মিলে একটি গ্রুপ ছবিতে বাঁধা পড়েছিলাম। সেই ছবিটি চিত্ররেখা স্টুডিও বেশ সুন্দর করে বাঁধাই করে গিফট করেছিলো। আজও খুব মনে পড়ে ছবিটি যত্ন করেই তুলে রেখেছিলাম বহুকাল। এখন ফাঙ্গাস ধরায় জীর্ণদশা তাহার। তবু ফেলতে মন চায়না বলে রেখেই দিয়েছি পুরনো এ্যালবামে। কলেজদিন, রাণীর দীঘি ও বন্ধুদের অজস্র স্মৃতিবাহী আমার প্রিয় শহর কুমিল্লার কাহিনী, যেইখানে আজও সারি-সারি উড্ডীন আমার একান্ত স্মৃতির দিনগুলি আমার স্মৃতিপটে .. শেয়ার করলাম আজ আবার এই বরষাঘন দিনে।

১৮ শ্রাবণ ১৪১৯