ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমাদের কালে ঈদের অনেক আগেই ঈদ বিষয়ে উত্তেজনা-আয়োজনের রোমাঞ্চিত অধ্যায় ছিলো। আজ যা একদম নেই-ই বলা যায়। রমযান-এর শুরুতে একধরণের পবিত্র আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় সবার ঘরে চলতো। আমাদের বাড়িতে মায়ের বিষম কড়া নিয়ম ছিলো। প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজ আদায়ে মায়ের সাথে সারি বেঁধে দাঁড়াতে হতো। এবঙ আদায় করতে হতো। এশার নামাজের সঙ্গেই তারাবীর বিশ রাকা’ত নামাজও পড়তেই হতো। কত যে মনোযোগ দিয়েই মুখস্ত করেছি তারাবীর নামাজ-এর দোয়া –
“সুবহানাযিল মুলক ওয়াল মালাকুত সুবহানাযিল ইজ্জাতে ওয়াল আজমাতে ওয়াল হায়বাতে ওয়াল কুদরাতে ওয়াল কিবরিয়ায়ে ওয়াল জাবারুত …” –
আজও পড়ি বটে একাকী নিজ ঘরেই … কিন্তু মায়ের সঙ্গে সেই যে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় – সেই চিত্রটি আজকের ঘরে কি আছে আগের মতো … মনে হয়না। আজকের মেয়েরা পড়া-কাজবাজে অনেক বেশি ব্যাস্ত বলেই, আবার অনেকে পড়ার জন্যই হয়তো অনেক দূরে হোস্টেল জীবন কাটায় … মোদ্দা কথা আগের অবস্থাটি আজ নেই-ই প্রায়। হয়তো সময়ের আর কালের পরিবর্তনেই এমন ঘটা বিচিত্র কিছু নয়। তবুও কেন যেন মনটা সেইসব কালের রমযান মাস ও ঈদ-এর নির্মল সমারোহচিত্রে বারবারই ফিরে যায় !

তখন রমযান-এর আগেই আমাদের পাড়ার সুবিখ্যাত দারোগাবাড়ি-র মসজিদ নতুন শাদা রঙের উজ্জ্বলতা ছড়াতো। বহু দূর-দূরান্ত হতে দারোগাবাড়ির মসজিদ সংলগ্ন মাজারে অনেক মানুষ আসতো। আজ সেটি মাজার-বাণিজ্যেই পরিণত। রমযানের চাঁদ দেখা গেলেই মসজিদে সাইরেন বাজতো। আমরা মাঠের পারে ছুটে যেতাম চাঁদ দেখার জন্য। দেখতে না পেলেও আনন্দের কমতি থাকতোনা। সেদিন সেহরির আগেও সাইরেন বাজতো মসজিদে। আবার টিন বাজানো দল পাড়ার রাস্তায় বেরুতো – “উঠুন সবাই রোজা রাখুন”
ইত্যাকার ঘোষণা সুরেলা গলায় টিন বাজিয়ে গাইতো। এবঙ শেষ রোজায় বাড়ি-বাড়ি গিয়েই টাকা চাইতো। সকলেই তাদের খুশি হয়েই বকশিষ দিতো। তখন রমযানে এক মাসের বেশি ছুটি থাকতো স্কুল-কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ রোজার দিন থেকেই প্রতিটা মার্কেট আলোকসজ্জায় ঝলোমলো হাতছানিতে ডাকতো সবার হৃদয়কে। হরেক রঙের মরিচবাতি জ্বলা-নেভার দৃশ্যটি দেখতেই ভালোলাগায় মন ছেয়ে যেতো। মা তাঁর জমানো টাকা গুণতে বসতেন। কেননা, বাবা ঈদ-বোনাস পেতেন ব্যাংক-এর নিয়মানুযায়ী অনেক দেরীতে। তা-ই সবার আগে মা নিজের জমা টাকায় হাত দিতেন। আমাদের নিয়েই বেরুতেন। কাজের লোকের শাড়ি-জামাটি সবচে’ প্রথমেই কিনতেন। মায়ের কথা কাজের লোকজন-এর হকটি সবার আগেই। কারণ সারা বছর জুড়ে তারা সবার মন যুগিয়ে কাজ করে। তো, তাদেরই প্রথমে খুশি করতে হবে। মায়ের এই কথাটি আজও ভুলিনা বলে আমিও প্রথম কেনাকাটাটি করি কাজের লোকজন-এর জন্যই। সত্যি সবচে’ আগে নতুন শাড়ি-জামা-চুড়ি-স্যান্ডেল পেয়ে কাজের লোকজন-এর মুখের হাসির তুলনা আর কিছুতে পাওয়া যায়না মনে হয়।

যাহোক, আমরা তখন লিস্ট বানিয়ে রাখতাম, মায়ের সঙ্গে বসেই কেনাকাটার বাজেট বানাতাম। বাবা যেদিন বেতন-বোনাস নিয়ে অফিস থেকে আসতেন সেদিন আমাদের অনেক আনন্দের দিন। সেদিন বাবার সঙ্গেই বেরুতাম আমরা। আহ, সেসব দিন বড়ো মধুরতম দিন – ফিরে আর পাবোনা কোনওদিন-ই। তবু স্মৃতিতে অমলিন আজও। মনে পড়ছে যেবার ঈদের এক বাড়তি আনন্দন হয়েই আমাদের ঘরে এসেছিলো প্রথম রেডিও। বাবার হাতে বিরাট বাক্স – এবঙ আমরা বিষম উতসাহে খুলতে দেখছি বাবার হাতে – খানিক বর্গাকৃতির দারুণ কফি-কালার-এর তেঁতুল কাঠ রঙের চারপাশ আবার চারপাশেই সোনালি বর্ডার এবঙ ততোধিক উজ্জ্বল কফি-কালার-এর আশ্চর্য সব নব ! ঢাউস সাইজের একটি বাক্সমতো ব্যাটারি। তাতে তারের সংযোগ দিতেই বেজে ওঠা ! আমরা অভিভূত ! বাড়ির পুরনো কাজের বুয়া হাসুর মায়ের বিস্ময় মাত্রাছাড়া – অবাক এতটাই নিজের হা মুখ, গালে হাতটি দিয়ে হাসুর মায়ের প্রথম কথা – “বাবায় একখান যাদুর বাক্স অানছে !!! একটুক বাক্সের ভিতরে এ্যাত্তো মাইনষের কথা, খবর, গান, নাটক ! অাল্লারে ক্যামনে করে ! ” অামরা সবাই হাসতে-হাসতে বিষম খাই হাসুর মায়ের বিস্মিত মুখের অভিমতটি শুনে।

সেবারে অই ঈদের আনন্দন অনেকগুণ বেশি হয়েই আমাদের হৃদয়জয়ী স্মৃতির রৌদ্রে জীবন্ত। সেই ঈদের চাঁদরাতে আমার ভাই মুনীর (বর্তমানে ডঃ কাজী মুনীর, আইটি কন্সালট্যান্ট) কাগজের ঠোঙ্গাকে চোঙ্গা বানিয়ে জানালার কার্নিশে দাঁড়িয়ে ঘোষনা করে –

“ভাইসব, আজকের বিশেষ-বিশেষ খবর – শিরীন-হাসিন-মহুয়া জামা-জুতো-চুড়ি-ক্লিপ কিনেছে এবঙ মুনীর-এর আব্বা রেডিও কিনেছে”।

আমরা সহ আশপাশের পড়শিরা হাসতে- হাসতে বিষম খাওয়ার দশায়। আহ, কিসব অমল-মধুর ঈদ-এর স্মৃতিরা এসে ভিড় করছে !

২৯ রোজা হবে – না কি ৩০ রোজা – সেও আরেক উত্তেজনাময় অপেক্ষা। রেডিওর সংবাদ ও মসজিদ থেকে মাইকে কি ঘোষণা আসে – সে এক অসীমামানন্দময় আগ্রহ – ক্লান্তিহীন। যখন চাঁদ দেখার সংবাদ ঘোষিত হতো – সেদিন চাঁদ দেখার জন্য সে কি চেষ্টা-প্রচেষ্টা ! যদি একফালি অতি সরু বাঁকানো চাঁদের ঝিলিকটুকু দেখতে পেতাম সে এক মাত্রাছাড়া আনন্দ বটে ! মা মোনাজাত ধরতেন। মায়ের সঙ্গে আমরাও। চাঁদরাতেই বাবা ঈদের কাঁচাবাজার করতেন – মায়ের লিস্ট মতোই। মা-কে আমরা যথাসাধ্য সাহায্য করতাম – ঘরদোর গোছানো থেকে রান্নাবান্নায়। প্রায় রাত্রিভর জেগেই কাটাতাম। তথাপি ভোরের আজান শোনা মাত্র লাফিয়ে উঠে যেতাম। ঈদ-আনন্দ-আতিশয্য অনেক বেশি ছিলো বলেই মনে হয় সেকালে। হাসি পায় যে, সযতনে ঈদের নতুন জামা-জুতোর বাক্স নিজের বালিশের পাশেই রাখতাম। যেন বা চোখে হারাই এমন-ই অবস্থা ! উপরন্তু নতুন জুতাসুদ্ধো বাক্স-র গন্ধ সে যে কি হৃদয়হরণ তার কোনও তুল্য কি হয় কিছুর সনে ! এখনকার ছেলেমেয়েরা হয়তো এমনটি করেনা। তারা এখন ইন্টারনেটের শপিং-এ অন্যরকম থ্রিল প্রাপ্তির হাতের মুঠোয় বিশ্ব পাবার মহানন্দে সেকেলে সেন্টিমেন্ট জড়িত স্মৃতিকথা পড়তে গিয়ে হাসবে। তাদের হাসাই স্বাভাবিক।

সেকালে আমাদের পাড়ার মসজিদ ঈদের দিন ভিতরে-বাইরে-মাঠের পুরোটাই ভর্তি হয়ে যেতো। ঈদের নামাজের পরপর-ই শুরু হতো কোলাকুলির মনোরম দৃশ্যটি। আর সবার ঘরেঘরে অাপ্যায়নের আন্তরিক আনন্দ সমারোহ। সালাম করলেই মিলতো নতুন নোটের রোমাঞ্চিত সালামী। খাওয়া-দাওয়া হতো সেদিন রাজকীয়। পোলাও-রোস্ট-রেজালা-সেমাই-ফিরনী-জর্দা সব-ই থাকতো সেদিন। আহ , মায়ের হাতের অপূর্ব রান্না ! কি তার স্বাদ ! অনেক চেষ্টাতেও নিজের রান্না মায়ের মতোন হয়না। তাই সকল মায়ের হাতের রান্না তুলনাহীন।

আজকের ছেলেমেয়েরাও মায়ের হাতের রান্নার ভক্ত। ঈদের দিনে মায়ের রান্না খেয়েই বন্ধুদের অাড্ডায় অন্যতর আনন্দ-ঈদ-উদযাপনে বেড়িয়ে পড়ে। সেকালে অামরাও এমন করতাম। এখন আমি ছেলে-বউ-মেয়ে-জামাই-নাতি-নাতনীদের নিয়েই ঈদ-আনন্দ উপভোগ করি। তবুও সেকালের ঈদের স্মৃতিরা একান্তে অাজও অমল ছায়া ফেলে হৃদয়ে।

ঈদ যেন সার্বজনীন আনন্দের আবহ তৈরী করতে পারে সবার মধ্যে – বিত্তশালীরা যেন অধিক মনোযোগী হন চারপাশের সুবিধা বঞ্চিতদের প্রতি – রাষ্ট্রও যেন তা করে – আর সবার ক্ষুদ্র প্রয়াস যেন বিস্তার লাভ করে অারও – আজ আমার এই চাওয়া।

১৪২১ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।