ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

মহান শিল্পীদের তুলিতে ক্যানভাসে জীবন্ত হয় জগত-জীবনের কত না অসামান্য প্রকৃতি। যুগে-যুগে শিল্পীর হাতে সামান্য বিষয়াদি আশ্চর্য জলরঙে অসামান্যতা নিয়ে যখন ফুটে ওঠে মূর্ত-বিমূর্ত সৌন্দর্যে তখন সামান্যই বড়ো বিমুগ্ধ অসামান্যতায় কথা বলে। যদিও আমি মোটেও শিল্পের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রঙ-রেখা-র প্রয়োগ বিষয়ে ধারণাও রাখিনা। কিন্তু যে কোনও শিল্পিত সহজাত সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়েই দেখি। তা নিয়ে দু’চার ছত্র লিখতে মন যায়। কালি ও কলম ম্যাগাজিনের এই চিত্রটি সহ আরও অনেক দারুণ কিছু শিল্পিত জলরঙ আমায় এতটাই মুগ্ধতা ঘোরে বেঁধেছে যে তা নিয়ে কিঞ্চিত না লিখে পারছিনা। প্রাচীন কালেও মানুষ কিন্তু নিজের শিল্পজ্ঞান নিজেই প্রকাশ করেছে পাথরের গায়ে কি পোড়ামাটিতে খোদাই করে আঁকার প্রয়াস থেকেই। সেইসব প্রাচীন নমুনা আমরা যাদুঘরে দেখতে পাই। কালের পরিক্রমনে শিল্পের অগ্রসরমানতায় শিল্পীরা এ যাবত কত কি পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী কাজ চালিয়ে আধুনিক চিত্রকলায় রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছেন সেসব আমরা বিভিন্ন প্রদর্শনী হতেই জানছি এবঙ দেখে আশ্চর্য বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হচ্ছি। ক্যানভাসের জীবন্ত রঙের কারুকাজ মনকে বিমোহিত করার সঙ্গে কিছু বার্তাও কিন্তু দেয়। সেসব বার্তা এক-একজনের কাছে এক-একেক রকমভাবেই আবেদন জানায়। বোদ্ধা-বিজ্ঞজন যেভাবে বিশ্লেষণ করেন আর স্বয়ং শিল্পী কি ভেবে ক্যানভাসে রঙের সমারোহ ঘটিয়ে কোন বার্তাটি দিতে চাইছেন সে অনেক-ই ব্যাপক চিন্তা-চেতনার খোরাক নিশ্চয়। আমরা যারা নিতান্ত সাধারণ দর্শক মাত্র, আমরা মুগ্ধ হই আদতে উজ্জ্বল রঙের সুবিস্তৃত ফুটন্ত রূপটিতে। সে যদি খুব পরিচিত জীবন থেকে নেয়ার মতো কোনও মুখ-নিসর্গকলা-নদী-মানুষ-বৃক্ষ-উদ্যান-ফুল-লতাপাতাও হয় তার-ই প্রকাশের রূপরেখায় সে যখন সুন্দর-এর বিমূর্ত উন্মোচন ঘটিয়ে ফেলে তখন তা এক-ই সঙ্গে মনকে বশ-বিবশ করে কোনও এক ভাবের ডানায় ওড়ায়। তখন-ই সে এক একজনের কাছে এক একটি বার্তা হয়েই জলরঙের ভাষায় কথা কয়। আমার এমন-ই অভিজ্ঞা।

কবিগুরু বিস্তর ছবি আঁকার কাজ করতে গিয়ে নিজের “আত্ম-প্রতিকৃতি” অঙ্কন করেছেন। যা সত্যি জীবন থেকেই নেয়া তাঁর-ই প্রতিকৃতি-র বিমূর্ত রূপ। আবার তাঁর কবি সত্ত্বার চিত্রায়ন ঘটেছে অনেকটা অজান্তে খেরোখাতার পাতায়, বহু কবিতা জুড়ে কাটাকুটির কাজের ভিতর। যেন কাটাকুটি-ই এঁকেবেঁকে নদীময়তা সৃষ্টি করেছে। অনেক কবিতায় এমন করেই চিত্রিত ভিন্ন মাত্রার এক ভুবন। যার মানে সৃজনশীল যে কোনও মাধ্যমে অজান্তেই লূকিয়ে রয় কোনও না কোনও ভাবের চিত্রকলা। যে দেখে অথবা যে পড়ে সে কেবল নিজের অনুভবের অনুরণন থেকে সূন্দর-এর বার্তাটি বুঝে নেয় আপন দৃষ্টি দিয়েই।

তেমন-ই দেখেছি বাংলার মহান পটুয়া কামরুল হাসান-এর অনন্য চিত্রকর্ম “তিনকন্যা”- যেন বা বাংলার চিরন্তন তিন রমনীরূপ। দেখেছি শিল্পের আশ্চর্য জীবন্ত চিত্র বিরল শক্তিমান চিত্রকরের হাতে বাঙ্ময় হয়ে উঠতে। বাংলাদেশের আরেক অনন্য অসামান্য চিত্রকর সূলতান। তিনি অজস্র রঙে-রেখায় ধারণ করেছেন জীবনের-ই অনেক আশ্চর্য শক্তিমন্ত প্রকাশ। যেন মনের যত শক্তিমত্ততা স্বপ্ন হয়েই রয়, তার-ই আত্মপ্রকাশ অপরূপ চিত্রকলায়। শিপাচার্য জয়নুল আবেদীন তো এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের জন্মদাতা এদেশে। যাঁর হাত ধরেই আজকের চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকাল সূচিত হয়েছিলো। যেখানে আজ একঝাঁক নবীন চিত্রকর রোজ-ই বিকশিত হবার স্বপ্নবান রঙ-রেখার খোঁজে নিমগ্ন।

শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক ম্যাগাজিন কালি ও কলম-এ প্রকাশিত অনন্য এক জলরঙের চিত্র - শিল্পী কিবরিয়া-র আঁকা।

এই মুহূর্তে মনে পড়ছে আমি যখন চট্টলায়, তখন প্রায়-ই যেতাম ব্যাতিক্রমী একটি শিক্ষালয় ফুলকি-র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। সেখানে শিশুদের আর্টের ক্লাশ নিতো আমার খূব প্রিয় মানুষ (পড়শি-ও) শিল্পী দিলারা বেগম জলি, শিল্পী ঢালি আল মামুন-এর স্ত্রী। আমার প্রথম প্রত্যক্ষ রঙের কাজ বিশাল ক্যানভাসে শিল্পীর আঁকাআঁকি দেখা জলি ও মামুন ভাই-র বাসায় গিয়েই। সে সময় জলি-র একটি একক ছাপচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে ফুলকি। উদবোধন দিনে একটি ছাপচিত্র কিনেছিলাম তার হলুদ আর নীলের অপূর্ব উপস্থাপনে মুগ্ধ হয়েই। তার অনেক পরে ঢাকার দৃক গ্যালারি আয়োজিত আমার আরেক প্রিয় শিল্পী উত্তম সেন-এর জীবনান্দ থিম-এর “কুড়ি-কুড়ি বছরের পর” কবিতা নিয়ে অসাধারণ জলরঙের ছবিটি কি ভালোই না লেগেছিলো যে অনেকক্ষণ মুগ্ধতাঘোরে আটকা পড়েছিলাম। আরও একজনের কথাও মনে পড়ছে – এস এম সাইফুল ইসলাম। তখন চারুকলার নবীন চিত্রকর সে, মাথায় ওয়েস্টার্ণ স্টাইলে হ্যাট পরতো বলে সকলে তাকে ডাকতো “কাউবয়”। একটি অনুষ্ঠানে সাইফুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দিনেই সে আমাকে “খালামনি” ডাকায় আমার বিষম ভালো লাগে তার আন্তরিকতা। অনুষ্ঠানে বরেন্য কবি শামসুর রাহমান-কে আনা-নেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে সাইফুল। অনুষ্ঠানের শেষে যে গাড়ি কবিকে এনেছে সেটি খুঁজে না পেয়ে উদ্যোক্তারা আমায় অনুরোধ জানায় কবিকে আমার গাড়িতে নামিয়ে দেয়া সম্ভব কি না। আমিতো একবাক্যে রাজী। কবির সঙ্গে গাড়িতে সঙ্গী সাইফুল-ও। যেতে-যেতেই কত কি আলাপচারিতায় সাইফুল আমার বাসায় আমার পোট্রেট আঁকার ইচ্ছে জানায়। তো, আমি অপারগতা জানিয়ে বলি যে ঘন্টাব্যাপী সিটিং অসম্ভব আমার পক্ষে। তখন সে একদিন নিজের জুমলেন্স ক্যামেরা নিয়ে হাজির। বিকেলের পড়ন্ত রোদে আমার বেশ কিছু ছবি ওঠায় ছাতে। অতঃপর আবার একদিন হাজির, হাতে অনুষ্ঠিতব্য পোট্রেট প্রদর্শনীর আমন্ত্রণপত্র। সপরিবারে আমি বিষেশভাবে আমন্ত্রিত। সেটিও দৃক গ্যালারিতেই। উদবোধনী দিনেই আমি স্বামী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে গিয়েতো হতবাক। আমার একখান উজ্জ্বল রোদেলা রঙের পোট্রেট দেয়ালে শোভা পাচ্ছে অনেক খ্যাতিমান ব্যাক্তিবর্গের পোট্রেটের সঙ্গেই ! তলায় শিল্পীর নামটি লেখা – সাইফুল ইসলাম। তারপর অনেক কাল সাইফুলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলোনা। আমি অনেক রোগাক্রান্ত থাকায় এবঙ পুরোনো মোবাইল নষ্ট হওয়াতেই যোগাযোগও বিনষ্ট হয়। হঠাত ফেসবুকে আবার যোগাযোগ হয়েছে অল্পদিন আগের এক ফ্রেন্ড-রিকোয়েস্টের বদৌলতে। সাইফুল লিখেছে – “খালামনি ক্যামন আছো? কতকাল দেখিনি তোমায় …” সে এখন একটি মিডিয়ার আর্টিস্ট। সে আমায় আমার সেই রোদেলা রঙের পোট্রেট-এর ছবিটি টাইমলাইনে আমায় পাঠায়। আজ শিল্পের কথা লিখতে বসে ছবিটি শেয়ার করাই হয়তো শিপীর প্রতি একটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ-এর সুযোগ ভেবে শেয়ার করলাম। উল্লেখ্য, আমি মোটেও এখন ছবির মতো দেখতে নই। এখন আমি ছাপ্পান্ন অতিক্রমণের একজন প্রবীন নারী। বুড়োই বলা যায়। হা-হা-হা …এও কি জীবন-এর অপর এক শিল্পিত রূপ কি না জানিনা। হয়তো তা-ই এই ভেবেই খানিক সান্ত্বনা পুরষ্কার পাবার মতো অনুভূতি জাগাতে চাইছি আর কি !

২০ সেপ্টেম্বর ২০১২ ইং