ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

মানব জন্মের অতীত ইতিহাসপাঠে আমরা জেনেছি – একদা কন্যাশিশু জন্মের সঙ্গেসঙ্গেই জীবন্ত পুঁতে ফেলার কথা। কন্যাশিশুর অধিকার ছিলোনা জগতের আলোবাতাসে মাতৃপিতৃস্নেহে বেড়ে ওঠার। ক্রমবিবর্তনে মানব সভ্যতার বিকাশকালে পুরুষ শাসিত সমাজ হয়তো নিজেদের স্বার্থেই কন্যাশিশুদের বাঁচতে দেয়। নইলে পুরুষ জন্ম-ই যে সম্ভব নয়, সত্যটি বুঝে বা না বুঝে। কিন্তু অাজও কন্যাশিশু মোটেও তেমন আদৃত হয়ে ওঠেনি এ জগতে। আজও কন্যাশিশুজন্ম ততোটা আনন্দবার্তা হয়না যতখানি আনন্দ দেয় পুত্রজন্মের বার্তা। কেননা পুত্র মানেই বংশধর ও বংশরক্ষার একমাত্র পরিচায়ক। কন্যা মানেই পরের সম্পত্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গিটির পরিবর্তন ঘটেনি একবিংশ শতাব্দীতে এসেও। এই মহাবিশ্বের সব দেশে-দেশেই পুত্র যতটা বুক ফুলিয়ে হাঁটে, ততই কন্যা অবদমিত দীর্ঘশ্বাস নিয়েই জাগতিক সীমিত সীমারেখা মানার নির্দেশিত প্রথায় হেঁটে যাবার চেষ্টারত। মেধায়-মননে কন্যারা কিছুমাত্র কম যে নয় তার প্রমাণ কিন্তু বিশ্বের সর্বত্র-ই কন্যারা দিচ্ছে। কোনও-কোনও ক্ষেত্রে তো পুত্রদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে কন্যারা তাদের কর্মকান্ডেই। তবু বিশাল একাংশের অবস্থা সেই আদ্দিকালের চেয়ে বিশেষ ভালো পর্যায়ে পৌঁছোয়নি। অশিক্ষা-কুশিক্ষা-অভাবগ্রস্ত অবস্থান-এর কারণে আর ধর্মীয় অপব্যাখ্যা-ফতোয়া- কুসংস্কারের দাপটে বিশ্ব জুড়েই কন্যাশিশুজন্ম আজও বহুভাবে অপয়া বলে চিহ্নিত করার কাজটি ঘটে চলেছে। এমন কি মাতৃগর্ভের ভ্রূণটি একটি কন্যাশিশু – জানার পরে ভ্রূণাবস্থায় তাকে মেরে ফেলার বহু প্রমাণ বহু ঘটনা মিডিয়ার বরাতে আমরা জানছি।

আজ নিশ্চয় বিশ্বের সকল অধিকার বঞ্চিত কন্যাশিশুদের বাঁচার অধিকার এবঙ নূন্যতম আদরযত্নে বেড়ে ওঠার অধিকার দেয়ার জন্য আইন প্রণয়ন শুধু না, আইনটি মানার জন্য প্রচার-প্রচারণা-উদবুদ্ধকরণ-এর যথার্থ উদ্যোগ জরুরী। “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুর-ই অন্তরে” – কবির বাণীটি যতখানি সত্য-র উচ্চারণ – ততোধিক-ই সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে তার-ই বিপরীতে লুকিয়ে থাকা সত্যের উচ্চারণে – “ঘুমিয়ে আছে শিশুর মাতা কন্যাশিশুর অন্তরে”। তাকে সযত্নে বেড়ে ওঠার অধিকার না দিলে আগামীর একটি সম্ভাবনাময় মাকে-ই অধিকার বঞ্চিত করে অন্ধকারের গর্ভে ঠেলে দেয়ার মতো অপরাধটি করা হয়। যা সমাজকে কেবল পশ্চাদপদ করার পথে ঠেলছে । তখন সে সমাজ মায়ের জন্য যেসব পুঁথিগত ভালোবাসার কথা প্রচার করে তা কেবল অর্থহীন-হৃদয়হীন অসার মৌখিক বুলি হয়েই ভবিষ্য মায়ের অনিশ্চয়তা-অনিরাপত্তা তৈরী করেই যাবে।

যেসব কন্যাশিশু অনেক ভাগ্যে আদরযত্নে বেড়ে ওঠার অধিকার পায় ও মেধা-মননে বিকশিত হবার পথে এগিয়ে যেতে পায় – তারও কিন্তু কিছুটা দায়ভার বর্তায় – তার ঘরেই যে কন্যাশিশুটি উদয়াস্ত গৃহকর্মীর চাকুরীটি করছে – তারে একটু স্বশিক্ষিত হবার পথে এগিয়ে দেবার কাজটি করবার। কেননা সমাজের সৌভাগ্যবান একজন কন্যাই পারে বঞ্চিত কন্যাশিশুর অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে। রাষ্ট্র আরও ব্যাপক উদ্যোগী হলে অবহেলিত কন্যাশিশুরা অনিরাপদ-অনিশ্চিত জীবন হতে আরও অধিকহারে আলোকিত জীবন-এর অধিকারটি পেয়ে বাড়তে পায়। কে জানে হয়তো তাদের কেউ না কেউ ঠিক-ই মেধায়-মননে বিকশিত হবার সুযোগটি পেলে একদিন হতেও পারে অনন্য একজন সফল নারী। জাতীয় কন্যাশিশু দিবস শুধু নামেই নয় – কাজের মাঝে কুসংস্কারমুক্ত কন্যাজন্মের মাইলফলক হয়ে উঠুক এরচে’ সুন্দর স্বপ্ন দেখিনা। অাজকের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী নেত্রী নারীর অগ্রণী প্রতীক বলে গর্বিত অামরাও। গর্বের মাত্রা অাকাশছোঁয়া উদাহরণ রচুক কন্যাজন্মের সকল কন্যাশিশুদের অধিকারকে সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়ে। এ বিশ্ব নিরাপদ অাশ্রয় হোক কন্যাশিশুর জন্য – অামার হৃদয়জ চাওয়া এই।

১৪২১ বঙ্গাব্দ।
ঢাকা। বাংলাদেশ।