ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমার কন্যার ক্যামেরাবন্দী ছবি- কাচপুরের কর্মীদের সঙ্গে আমাদের ঈদ-উল-আজহা পালনের আনন্দঘন মুহূর্ত ...

( * অবশেষে ছবিটি আমার কন্যা আমায় দিলো বলেই আমি পোস্টের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিলাম, আমাদের কাচপুরের কর্মীদের নিয়েই ঈদ-উক-আজহার আনন্দছবি। * )

বিগত প্রায় এগারো বছর ধরেই আমরা সপরিবার ঈদ-উল-আজহা উদযাপন করতে যাই আমার স্বামীর কষ্টের কারখানাতে, প্রথমে ছিলো শ্যামপুর-এ। এখন কাচপুরে। সেখানে কর্মরত ছেলেমেয়েরা তাদের স্যারের আমন্ত্রণে তাদের ঝাকানাকা সাজপোশাকে এসে হাজির হয়, কাচ্চাবাচ্চাদেরও সঙ্গে নিয়েই। এমন সুযোগ তারা বছরে শুধু কুরবাণীর ঈদ উপলক্ষ্যেই পায়। অন্যান্য দিন তাদের নিতান্তই গতানুগতিক, শ্রমের-ঘামের। আমরাও তার-ই জন্য তাদের একটি অন্যরকম ঈদ-উল-আজহা আয়োজন করতে পেরে বিষম আনন্দের সঙ্গেই তাদের সঙ্গ, তাদের ঝাকানাকা সাজগোজের হাসি-আনন্দমুখ দেখতে ভালোলাগার কারণেই সেথায় যাই। আগের দিন আমার স্বামী তাদের কয়েকজন-কে নিয়ে কাচপুরের হাট হতেই তাদের পছন্দের গরুটি কেনেন এবঙ খরচাপাতি দিয়ে আসেন (চাল-ডাল-তেল-মশলা-সালাদের উপকরন) এবঙ আমিও কিছু নাশতা-ড্রিংকস ইত্যাদি নিয়ে সকালে রওয়ানা হই সবাই মিলে (দুই পুত্র, পুত্রবধু, নাতনি, গৃহকর্মী)। আমরা পৌঁছেই দেখি যে আয়োজন প্রস্তুত। অর্থাৎ বেচারি গরু কুরবাণী-র জন্য নির্দ্বিধায় নিজের গলা পেতেই শুয়ে পড়েছে (এবারের গরুটি সত্যি এমন কান্ডই করেছে, যে হুজুর জবাই করবেন তিনিও হতবাক, জীবনে নাকি এমন কুরবাণী-র নজির দেখেন নি), গরুটিকে কারও জোরজবরদোস্তি খাটাতে হয়ইনি !

যাহোক, গরু তো কুরবাণী-ই হলো। হুজুর কাচপুর এতিমখানার জন্য চামড়া চাওয়া মাত্রই তা পেলেন। কসাই সুসম্পন্ন করলো কাটাকুটি। আগেই সাজুগুজু মেয়েরা সব তাদের হাত লাগিয়েছে মশলাপাতি রেডি করার কাজে। কেউ বা বাটনা বাটছে চুড়ি-মেহেদী পরা হাতেই। কেউ বা সালাদ কাটতে বসেছে। আমি চেয়ারে বসে দেখছি ওদের দারুণ রঙিন আনন্দযজ্ঞ …জোরে বাজছে একজনের আনিত রেকর্ড প্লেয়ারে – “আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে …”।

এসে পৌঁছুলো আমার কন্যাও তার স্বামী সমেত এবঙ আমার প্রিয় নাতিও এলো – শেহমান। শানযাহ (নাতনি) তো মহাখুশি। আমার ননদিনী পৌঁছুলো তার দুইপুত্রকে নিয়ে। কন্যা ও তার ফুপু তাদের কুরবাণী সম্পন্ন করেই এসেছে। ননদিনী এনেছে রেঁধে খাসির রেজালা ও পোলাও, তার কুরবানির রান্না। তো, ভাইপো-ভাইঝি-জামাইর খুশিতে বাড়তি ভোজনযুক্ত হওয়ায় আনন্দ মাত্রা ছাড়াই হলো।

আরও এক আনন্দবার্তা এই যে আমার নাতির তার নানার কাছে প্রতিবছর কুরবাণী এলেই একটি ডিমান্ড থাকে খাসির। এবারের ডিমান্ড ছিলো একটি ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট খাসির। আশ্চর্য যে নানাও একা হাটে গিয়েই পেয়ে যান নাতির ডিমান্ড মতোই ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট ডিজাইনের খাসি। কিনেই নাতিকে পৌঁছেও দেন নিজেই। সেই খাসির ছবি আবার আমাদের কন্যা দিয়েছে ফেসবুকে, আমিও শেয়ার করার সুযোগটি পেলাম।

(*ছবিটি অবশেষে আমার কন্যা আমায় দিলো বলেই আমি পোস্টের সঙ্গে সংযুক্ত করেই দিলাম – আমাদের কাচপুরের কর্মীদের নিয়েই ঈদ-উল-আজহা পালনের আনন্দছবি*)

তো, এ এক অপরিসীম আনন্দই বটে, যেন বা ঈদ নয়, ঈদের দিনের অন্যরকম পিকনিক। কারখানার গেইটের সামনে ইট বসিয়ে দুই চুলোয় বিশাল হাঁড়িতে গোশত চড়িয়েছেন আমার স্বামী, সাহায্য করছে অন্যান্য ছেলে কর্মীরা। রোদে পুড়েই রান্নাবান্না, বুটের ডাল গরুর হাড় দিয়ে, এবঙ সিদ্ধ চালের ভাত। সালাদ, কোক-সেভেন-আপ সহযোগেই খাওয়াওদাওয়ার আয়োজন, কেবল রান্না শেষের অপেক্ষা …ডেকোরেশন-এর দোকান হতে আগেই বাসনকোসন-গ্লাস-জগ-চামচ-দস্তরখানও রেডি …একসময় চুলো নিভলো, গরম-গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের হাঁড়ি, গোশত, বুটের ডালও চলে এলো …সবার আগে কাচ্চাবাচ্চাদের তাদের মায়েদের সুদসুদ্ধ সারবেঁধে বসিয়ে পাতে দেওয়া শুরু …সে এক হইহইরইরই কান্ডই বটে, দেখেও সুখ। আমার সস্তামার্কা মোবাইলের ছবি বিশেষ সুবিধের হয়না, উপরন্তু আমার মোবাইল-ইন্টারনেট পছন্দ নয় বলেই ছবি আপাততঃ দেয়া গেলোনা, কিন্তু, আমার কন্যা যে সব ছবি তুলেছে তা আমায় দিলেই আমি আমার এই পোস্টের সঙ্গে সংযুক্ত করবো পরে, এমন ইচ্ছে।

অতঃপর শ্রান্ত-ক্লান্ত-বিধ্বস্ত কর্মীদের স্যারও খুশিমনেই বসলেন সবার সঙ্গে, আমরা চাটগাঁইয়্যা স্টাইলে তাদের ঐতিহ্যবাহী “মেজবানী” গরুর গোশতের স্বাদটি পেলাম। সত্যি-ই তিনি চমতকার “স্যার” যেমন – তেমন চমতকার বাবুর্চিও ! যেমন ঝাল ঝোলের রান্না, তেমন দারুণ স্বাদের – “না খাইলে পস্তাইবেন” মার্কা সন্দেহ নাই। অন্যরকম আনন্দন-এর এমন ঈদ-উল-আজহা পালনের তৌফিক আল্লাহ যে আমাদেরকে দিয়েছেন সেজন্য আমাদের শুকরিয়াও আল্লাহর নিকট সীমাহীন। আমরা খাওয়াদাওয়া সাঙ্গ হলেই আমন্ত্রিত সকল কর্মীদের হাতেই কাচা গোশত-এর ভাগও এক পাকেট করে বিলিয়ে তবেই বাড়ির পথ ধরি। যাওয়া যত সহজে সম্পন্ন ঘটেছে, ফেরা ততোই কঠিনের পুলসেরাত হয়ে উঠলো যানজটাবদ্ধতার কারণে। আমার পাশে আমার প্রিয় কাজের মেয়ে মর্জিনা বমি করতে লাগলো …সে এক যন্ত্রণার একশেষ আরকি …সেও অন্যরকম অভিজ্ঞাই …আনন্দ তাতেও খানিক মিলমিশ যেন বা …কেননা সামনে বসা ছোট ছেলে হেসেই সারা …অগত্যা আমিও হেসেই উঠি – হা-হা-হা- !

সকলের সঙ্গেই শেয়ার করতে এই পোস্টটি লেখা। সবার জন্য শুভেচ্ছা এবঙ শুভেচ্ছা।

২৮ অক্টোবর ২০১২ ইং