ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

একাত্তুরে পশ্চিমা জান্তার উতপীড়ন হতে উদ্ধার পেতে যে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও নেতৃত্ব মেনে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্ম, সেই সময় অর্থাৎ সেই জন্মলগ্নেই দেশি-বিদেশি চক্রান্তেরও শুরুই। সেইসব চক্রান্তে খোয়াতে হয়েছে বহু অমূল্য প্রাণ স্বাধীনতার স্বল্পকালের মধ্যেই। প্রথম অমূল্য প্রাণটি বঙ্গবন্ধুর। এবঙ বাংলাদেশ-এর সেনা-ষড়যন্ত্রেই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবার হত্যাযজ্ঞের শিকার হলেন। হত্যার রাজনীতির সেই শুরুর তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সবচে’ প্রিয় ঘনিষ্ঠ সহচর স্বাধীনতার অন্যতম নেতৃত্বদানকারী চারজন সুযোগ্য নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান কারাভ্যন্তরে রাতের অন্ধকারে নেপথ্য চালিকাশক্তির নির্দেশেই নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞের শিকার হন।

ইতিহাসের বিকৃতিও রচিত হওয়ার শুরুটি তখন থেকেই। সেনাশাসন-এর সূত্রপাতের প্রথম সুযোগে কথিত “সিপাহিজনতা বিপ্লব”-এর নেপথ্য নায়করা সক্রিয় হয়ে ঘটাতে থাকে একের পর একেক হত্যকান্ড। সবই ঘটানো হয়েছে রাজনৈতিক অভিলাষেই। এতে মোটেও জনসম্পৃক্ততা ছিলোনা। আজকের বিএনপি তখন জন্মই নেয়নি এদেশে। ৭ নভেম্বর-এর “বিপ্লব ও সংহতি দিবস” / জাসদ-এর কথিত “সিপাহিজনতা বিপ্লব” কোনও নাম আদতে প্রযোজ্য না। একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরে যখন স্বাধীনতার অন্যতম নেতৃত্বদানকারীদের হত্যার পরপরই চলতে থাকে সেনাজান্তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার উদ্দেশ্য, তখন অন্যায়ের বাছবিচার থাকেনি বলেই ঘটে ৭ নভেম্বরের জিয়া বন্দীর নাট্যচিত্র বনাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশের লক্ষ্যেই বীর সৈনিক কর্ণেল তাহের হত্যাকান্ড সঙ্ঘটিত হয়েছে। মূলতঃ “বিপ্লব ও সংহতি দিবস” / “সিপাহিজনতা বিপ্লব”-এর পার্থক্য / অর্থের ভিতরগত ফারাকটি কমই। কেননা জিয়ার কৌশলেই জাসদ তখন চালিকাশক্তি হিসেবেই কেবল ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র। জিয়াকে মুক্ত করার নাটকের অংশী হয়ে জাসদ সেই সময় লিফলেট বিতরনের মধ্যে সিপাহীদের জানিয়েছিলো যে – “খালেদ ভারতের দালাল” এবঙ সিপাহিদেরকে উত্তেজিত করাও হয়েছিলো যথেষ্ট এই বলে যে – সেনাবাহিনীতে অফিসারদের কোনও প্রয়োজন নেই – “অফিসার-সিপাহি ভাইভাই” শ্লোগানে সাধারণ সৈনিকগণ ব্যবহৃত হয়েছে জিয়া বন্দীর নাট্য নির্দেশনায়। এবঙ প্রথমে খালেদ তারপর কথিত সিপাহিজনতা বিপ্লব-এর নামেই অসংখ্য জিয়াবিরোধী সেনা অফিসারের প্রাণ হরণ করা হয়েছে।

তারা প্রত্যকে বীর মুক্তিযোদ্ধার অন্যতমদের মধ্যেই ছিলেন, যাদের একজন কর্ণেল হুদা, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই আগতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ছিলেন। আরেকজন বীর সৈনিক কর্ণেল এটিএম হায়দার বীরোত্তম, ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে ঐতিহাসিক বিজয়দিনে রেসকোর্স ময়দানে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ক্যামেরাবন্দী হয়ে আছেন কোমরে পিস্তল কাঁধে রাইফেলসমেত নিয়াজী ও অরোরা-র মাঝেই যুবক কর্ণেল এটিএম হায়দার। অতঃপর যে বীরের প্রাণ হরণ হয় তিনিই বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল তাহের, জিয়ার বন্দীদশার নাট্যশালায় তিনি জীবনরক্ষাকারী হিসেবেই বিশেষ পুরষ্কৃত হয়েছিলেন প্রাণ দন্ডের মধ্য দিয়েই।

এই ইতিহাসটি নিয়ে বিস্তর লেখালিখি হয়েছে, হচ্ছে, হবেও। কিন্তু ইতিহাসের সত্য যা তা বহুকালের চর্বিত চর্বন ভেদ করেই উন্মোচিত হয়ই হয়, অমোঘ নিয়মেই সত্যের জয় অবধারিত। তাই সেদিন যারা নেপথ্য নায়কের ভূমিকা পালন করেই এক একটি হত্যাকান্ড ঘটিয়ে পালানোর সুযোগ পেয়েছিলো তারাই মিডিয়ায় সাক্ষাতকারে বলেছে –

“প্রথম কথা হচ্ছে জিয়া তাঁর স্টাইলে নিজের বাসভবনে আটক ছিলেন। দ্বিতীয়ত – তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও পদাতিক বাহিনীর একটি কোম্পানীর প্রহরাধীন ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফ অফিসাররা সেখানে ছিলেন। তিনি সেনাবিদ্রোহ দমনের কোনও চেষ্টা করেন নাই। বরং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ পালনেও অস্বীকার করেন। তাঁর বাসভবনের টেলিফোন সংযোগ বরাবরই সম্পূর্ণরূপেই কাজ করেছে। তাঁর স্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন – তিনি গ্রেফতার বা আটকাবস্থায় নাই। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁর স্ত্রী জানান যে – কয়েকজন সামরিক অফিসারের সঙ্গে তিনি আলাপরত।”

(স্যাটারডে পোস্ট – সাক্ষাতকারপর্ব – বঙ্গবন্ধু-হত্যার খুনী – ফারুক, রশিদ-এর)

জিয়া অনুসারীরা বিস্তর অপপ্রচারময় বিবৃতি ও লেখায় জিয়ার অনেস্টি বিষয়ক রচনা করেছেন, করেই যাচ্ছেন, তথাপি –

“জিয়া চীফ অব আর্মি স্টাফ হিসাবে সর্বদাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণ ও সৈনিকদের ধোঁকা দিয়েছেন” –

(তিনটি সেনা অভ্যূত্থান – লে, ক, এমএ হামিদ)

এযাবতকাল পর্যন্ত সেনা অফিসাররা অসংখ্য লেখায়, মিডিয়ার সাক্ষাতকারে ১৫ আগস্ট পরবর্তীকালের ঘটনাবলী সম্পর্কে জিয়ার ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠিয়েছেন। সব সূত্রের উল্লেখ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আওয়ামীলীগের কারও লেখার সূত্র অনুল্লেখ্যই মনে করছি। তবে এক্ষেত্রে আরও একটি প্রমাণিত সূত্রের কথা বলছি – বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনী ফারুক-রশিদ-এর সাক্ষাতকারপর্বেই ছিলো –

“১৩ আগস্ট ১৯৭৫-এ জিয়ার সঙ্গে খোন্দকার মোশতাক-এর দুবার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

“১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে জিয়া বলেছিলেন (খুনী ফারুক-কে) ইউ হ্যাভ ডান আ ওয়ান্ডারফুল জব, কিস মি, কাম টু মাই কার”।

“১৫ আগস্ট দুপুরে জিয়াকে বঙ্গভবনে খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে পরামর্শ করতে হয়েছে মন্ত্রীসভার সদস্য তালিকা প্রণয়নে এবঙ খুনীদের পলায়নের ব্যবস্থা করতে।”

“জেনারেল জিয়া-ই বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যাকারী ১২ জনকে কূটনৈতিক মিশনের চাকুরী দেন।”

(সাক্ষাতকারপর্ব সচিত্র গ্রহণ করেন লন্ডনের প্রখ্যাত সাংবাদিক এ্যান্থনি মাসকারেনহাস)

তো, বলাবাহুল্য যে – মূলত ১৫ আগস্ট, ৩রা নভেম্বর আর ৭ নভেম্বর একইসূত্রে গ্রন্থিত সেনা-ষড়যন্ত্রের তিন তিনটি জাতীয় কলঙ্কময় দিন। সেনা-ষড়যন্ত্রেই নেপথ্য নায়কদের নাট্য নির্দেশনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট করবার লক্ষ্যে ও জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করবার লক্ষ্যেই সঙ্ঘটিত অন্যায় হত্যাকান্ড। জাতীয় গভীর দুঃখদিন।

আজও একাত্তুরের সেই শকুন-এর দলের সদস্যরা সঙ্ঘটিত করেই চলেছে এদেশে এক একটি দুঃখজনক ঘটনা। আমরা কি এই জাতীয় শত্রুসম শকুনদের বিরুদ্ধে অভিন্ন আওয়াজ ওঠাতে পারিনা সবাই একযোগে ???

৭ নভেম্বর ২০১২ ইং