ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

আজ ভোরের কাগজ খুলেই দেখি আজিকে পয়লা অগ্রহায়ন। বাংলার সোনালি ধানী গন্ধের অাবাহনে অমনি মনের মধ্যে চিরন্তনের বাজনা বাজলো –

“ ও আমার মাইজা ভাই, সাইজা ভাই, কই গেলিরে – চল যাই ক্ষেতের ধান কাটিতে ….”

হ্যাঁ, আবার এসেছে ফিরে অগ্রহায়ন প্রকৃতির নিয়মে এই বাংলার মাঠে ও জনপদে। গানের ভাষায় কৃষাণ-কৃষাণীর প্রাণের ভাষাটি বলতে। সেই কথাই কতভাবে কত না গানেগানে ছড়িয়ে আছে। বিশেষতঃ এই গানটি গ্রামের মানুষদের প্রিয় একটি গান। ফসল কাটার সময় মুখেমুখে ফিরতে থাকা – বাজতে থাকা একটি গান। গানের সুরটিও দারুণ। এমন অারও শত লোকগানোর সুর হৃদয় জাগানিয়া বিষম। নবান্নের, উতসবের মাস অগ্রহায়নে অায়োজন ঘরেঘরেই পিঠাপুলির – হাজার রকমের পিঠাপুলির মেলা –

“ আবার জমবে মেলা – বটতলা-হাটতলা –
অঘ্রানে নবান্নের উৎসবে –
সোনার বাংলা ভরে উঠবে সোনায় –
বিশ্ব অবাক চেয়ে রবে।”

বিশ্ব অবাক হোক কি – না হোক – তাতে কি ! আমি তো আজ অবাঙমুখর চিত্তেই অনুভব করছি এই অগ্রহায়ন । এই নবান্নবার্তা। সেই চিরন্তনের ঘ্রাণ। যেন বা কবেকার যোজন- যোজন দূরের বার্তা। আমায় বাতাসের খামেই পাঠিয়েছে সোনালি ঘ্রাণ ! যেন বা এই অন্তর্জালের ঘেরাটোপভেদী যান্ত্রিকতাভেদী তুমুল হলুদ মাঠের ঘ্রাণ। হৃদয় জুড়ে বাজাতে এসেছে সে সোনালি দিনের গানের সনে সবচে’ সুমধুর সুরটি ছড়িয়ে দিতেই। সেই প্রাণের সুর আমাদেরই অভিন্ন জাতীয় সুর – কবিগুরুর অতুল গানের বাণী –

“ ও মা অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কি দেখেছি –
ও মা কি দেখেছি মধুর হাসি –
আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি …………”

সেই সে গানের ভাষার-সুরে ভেসে আমার খুব করেই ইচ্ছে করছে সেই ছেলেবেলার মতো শীতের শিশিরমাখা ঘাসের ‘পরে খালিপায়েই ছুটে বেড়াই। আর অবাধ আলক্ষেত পেরিয়ে ধানী গন্ধের গানের সনেই পাল্লা দিয়ে গাইতে থাকি –

“ আমার মাইজা ভাই, সাইজা ভাই, কই গেলিরে চল যাই ক্ষেতের ধান কাটিতে ….”

আরও মনে পড়ছে অজস্র মধুর স্মৃতিমালা –
….কোনটি ফেলে কোনটি লিখি ….

অগ্রহায়নে ছেলেবেলায় মা-বাবা নিয়ে যেতেন কখনও নানারবাড়ি। কখনও বা দাদীরবাড়ি। দুই বাড়িই আমাদের ভাইবোনের মহাপ্রিয়। নানারবাড়ি হরিনারায়নপুর। দাদীরবাড়ি শর্শদি। আমরা যখনই নানারবাড়ি অথবা দাদীরবাড়ি গেছি অগ্রহায়নে – দেখেতাম সে এক এলাহি আয়োজনের সমারোহ। উঠোনে ধানমাড়াই কিংবা ধান শুকোনো হচ্ছে। সোনালি খড়ের গাদায় উঠোন ছাওয়া। আমরা নেমেই সেই সোনালি খড়ের গাদায় ঝাঁপ দিতাম। আমাদের অনেক ডাকাডাকি করেই ঘরে নেওয়া হতো। হরেক পদের পিঠাপুলির মন ভোলানো চোখ জুড়ানো আয়োজন। শীতলপাটির উপর সুজনি / শতরঞ্জী বিছিয়ে সেইসব সুস্বাদু পিঠেপুলি পরিবেশন করতেন দাদী / নানী / ফুপু / খালারা। আহ কোথায় সেই সোনালি দিনগুলি ! আমার নানী ছিলেন সেকালের বিদুষী নারীসম অশেষ গুণবতী রমনী। তিনি যেমন অতুল রাঁধুনী, তেমনই ছিলেন সেলাইফোঁড়াই সহ গালগল্পেও একাই একশো। এমন কি হারমোনিয়মেই চিকন সুরেলা কন্ঠে গানও ধরতেন রাত্তিরে আমাদের অনুরোধেই। সে এক অনুরোধের আসরই যেন বা। আমরাও সবাই যে যা শিখেছি সে আসরে পরিবেশন করার ধুম পড়তো। রাত্তিরের খাওয়াদাওয়ার পাট চুকলে তবেই বসতো সেই অনির্ব চন অনুরোধের আসর। আমি ও আমার ছোটখালা আবার যুগল নাচও পরিবেশন করেছি –

“ ছন্দেছন্দে দুলি আনন্দে আমি বনফুলগো ….” /

“ বেলা যে আজ ভরে গেছে পাকা ফসলে মরি হায়-হায়-হায়-
পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে ছুটে আয়-আয়-আয়- ….”

আজ অগ্রহায়নে আবারও মধুরতম স্মৃতিমালা অজস্র সবুজে সোনালি দিনগুলি ফিরিয়ে আনলো যান্ত্রিক নাগরিক বাতাসে। আহ পিঠেপুলির গন্ধমাখা বাংলার একান্ত ঐতিহ্যময় নবান্ন উৎসব-এর চিরকালীন দিন। যেন সে চিরদিনের সবুজ ডাক ….চিরকালীন ডাক গ্রামবাংলার ….

“আমার মাইজা ভাই, সাইজা ভাই, কই গেলিরে – চল যাই ক্ষেতের ধান কাটিতে ….”

বাংলার প্রাণজাগানি মনজাগানি কৃষাণ-কৃষাণীর গানের ভাষা। সে গান ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। সবার মনে সবার প্রাণে। অভিন্ন অনুভবে যান্ত্রিক অন্তর্জালভেদী চিরকালীন আবাহনে –

“ আমার মাইজা ভাই, সাইজা ভাই, কই গেলিরে – চল যাই ক্ষেতের ধান কাটিতে ….”

ফেসবুক-শেয়ার-ছবি-সুলতান মির্জা

১লা অগ্রহায়ন ১৪১৯ বঙ্গাব্দ