ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বসবাস যেখানে, যেখানে জীবন-জীবিকার বহমানতা পৃথিবীর সৃষ্টিকাল থেকে, যাপিত জীবনের বর্জ্যের উদ্ভব তখন থেকে। তখন আদিযুগ বলেই মানুষের অন্বেষা ও এষণার স্ফূরণ ঘটেনি, তখন প্রাকৃতিক নিয়মেই বর্জ্যের বিশোষণ-বিশোধন ঘটতো। অতিকায় ডাইনসোর থেকে ক্ষুদ্রতম পিপিলিকাও প্রকৃতিগতভাবে পারস্পরিক জীব-বৈচিত্রের বিচিত্র সূত্রে জাগতিক জীবন যাপনের বর্জ্য অনেকটা বিপাক ক্রিয়ার নিজ-নিজ পরিবেশে শোষিত হতে ভূমিকা নিতো। তাতেই কিন্তু সমগ্র পরিবেশের একটি ভারসাম্য বজায় থাকতো।

ক্রমান্বয়ে যখন মানুষের মেধা-মননে হাজার উপায়ে উত্তোরণ ঘটে চললো। আর বেড়ে চললো মানুষের সভ্যতা। বিকশিত হতে থাকলো সহস্র উপায়ে নিত্য নতুন আবিষ্কারে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। তখনই বর্জ্য তার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিশোষণ ক্ষমতা হারাতে-হারাতে প্রায় বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে উঠলো। অবশেষে আজকের স্যাটেলাইট থেকে কম্পিউটারাইজড বিবর্তনের বর্জ্য ভারে প্রকৃতি বড়ো ভারসাম্যহীনতায় কম্পমান। যেন মহাপ্লাবন আসন্ন। অজানা ভূমিকম্পের হুমকির মুখেই আমাদের প্রিয় পৃথিবী। যেন যবনিকা কম্পমান এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাগৃহে বসে আছে অসহায় মানুষ। এমনই এক ভয়াবহ চিত্রকলায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় ভাবতে গেলেই মনে হয় – হায়, পৃথিবী – সেতো শূণ্যের কোঠায় ঠেকছে ! হ্যাঁ, এ কিন্তু বাস্তব চিত্র। মোটেও কোনও চিত্রকরের চিত্রকলা নয়। আমরা যারা স্বপ্ন দেখি ও দেখাতে ভালোবাসি, যতই চেষ্টা করি না কেন – কার্যতঃ পরিবেশ দূষণের অতিকায় দানবিক প্রক্রিয়ার কাছে সবই যায়-যায় !

যে দেশে সাধারণের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় প্রায়, যে দেশে অন্নবস্ত্র বাসস্থানের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোই দুষ্কর, উপরন্তু নেই রোগশোকে সঠিক চিকিত্সা সঙ্গতি, নিরাপত্তাহীনতা এক কঠিনতম বাস্তব ছবি, তো, সে দেশে যেন – ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ – এক সোনার হরিণ করায়ত্ত করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। তথাপি তাকে চাই। যদিও আমাদের অধিকাংশ সাধারণের – ‘পরিবেশ দূষণ’ – সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞানটুকুরও প্রকট অভাব। তাদেরকে সচেতন করার কাজটি নিশ্চয় আমাদের ‘পরেও বর্তায়। এবঙ সত্য এই যে যাপিত জীবনের ধারণাতীত সঙ্কটজালে মানুষ এতটাই জড়ানো যে এ নিয়ে তার ভাবার অবকাশ কই ! এ নিতান্তই অবান্তর ভাবনা যেন ! এ বিষয়টিকে আদতে আরও হাইলাইট করে লাইমলাইটে নিয়ে আসতে পারে কেবল মিডিয়াই। পত্রিকায় অবশ্য এনিয়ে প্রচুর গবেষণাধর্মী ফিচার প্রকাশিত হয় প্রায়শই। এখন প্রশ্ন হলো – তা পড়েন ক’জন এবং পড়ে উদ্যোগী হন অপরকে জানাতে / নিজেই কোনও পরিবেশ উন্নয়নের কাজে উদ্যমী ভূমিকায় নামতে – তারও খুব বেশি উদাহরণ নেই। দু’চারটে উদ্যোগ যে নেয়া হচ্ছেনা এমন নয়। কিন্তু তা নগন্য প্রয়োজনের তুলনায়। সরকারী কাজও সন্তোষজনক নয়। মোদ্দাকথা – গোটা বিষয়টি হতাশাব্যঞ্জক।

এদিকে এক রাজধানী ঢাকার বর্জ্যে বাংলাদেশ তলিয়ে গেলে আশ্চর্য হওয়ার অবকাশও মিলবেনা মনে হয় ! অচিন্ত্যনীয় হারে বাড়ছে কলকারখানা-হাসাপাতালের বর্জ্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের অকর্মণ্যতায় আধুনিক কোনও রি-সাইকেল প্রজেক্ট গড়ে ওঠেনি আজতক বাংলাদেশে। আমাদের বহতা নদীগুলো বর্জ্যে ও দূষণ ভারে বিষাক্ত প্রায়। কোটি মানুষ গৃহহীন নদীতীরে, লেকের ধারে, রেলের পতিত জমিনে কোনমতে পলিথিন টাঙিয়ে টঙঘরে বস্তির মানুষগুলো অবর্ণনীয় ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর মানবেতর জীবনযাপন করে এই দেশে। কে তাদের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন গড়ে দেবে? দায় কার? বিগত কোনও সরকারকেই এই ভয়াবহ অবস্থান থেকে উত্তোরণের কোনও সঠিক পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন হয় বড়ো ঢাকঢোল পিটিয়ে। বৃক্ষমেলা ও নার্সারির প্রসার দেখি চারপাশেই। পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ কেটে সাফ করাও দেখি অসাধু এক শ্রেণীর সরকারী-বেসরকারী ধান্দাবাজ মানুষদের। এসবই বড়ো উদ্বেগজনক। বন্দরনগরী চট্টলার পাহাড় কেটে রিয়েল-এস্টেট তৈরীর ধুমে নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্টের সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে ভূমিকম্পের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। শহর কুমিল্লার প্রধান নদী গোমতীপারে ইটভাঁটা এবঙ যত্রতত্র হাউসিং বাণিজ্য প্রসারের কারণে একদার দারুণ খরতোয়া গোমতী বর্জ্যভারে দূষিত ক্ষীণকায় নদীটি। কোন সরকার কোন আইনে এইসব অন্যায় কর্মযজ্ঞ চিরতরে নিষিদ্ধ করে পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে জানিনা। তবু সরকারের কাছে সনির্বন্ধ আবেদন রাখছিঃ বর্জ্যে তলিয়ে যাওয়া থেকে প্রিয় বাংলাদেশকে বাঁচান।

১৪২১ বঙ্গাব্দ।।
২০১৪ ইং।।