ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

অনলাইন প্রথম আলো-র ছবি, ফটোগ্রাফার - নীরব চৌধুরী, খাগড়াছড়ি।

বাংলাদেশে গত ক’দিন ধরে শীতের দাপট বেড়েছে বেশ। ভোরের রোদ্দুরের দেখাই মেলেনা অনেক বেলা পর্যন্ত। প্রায়ই যানবাহনের কুয়াশা কবলিত হবার খবর পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ যাত্রা বিঘ্নিত। চাকরিজীবিরা লেটে অফিস পৌঁছুচ্ছেন। লেপের ওম ছাড়তে বড়ো যাতনা কি না !

এদিকে এই শীতের সকাল-বিকেল জুড়ে পিঠার কারিগরদের কোনও ফুরসত মেলেনা ঘুমোবার। শহরে, গ্রামে সবখানেই শীতের গরম ভাপা-চিতই সহ হরেক পিঠেপুলির ধুম। আমার বাড়ির মোড়েও ছোট্ট ঝুপড়ি দোকানের পাশেই মধ্যবয়েসি নারী চমৎকার পিঠে বানায়। তার হাতের পরিচ্ছন্ন তড়িত পিঠে বানানো দেখতেও আশ্চর্য লাগে। প্রচুর লোকজন খায় ও সঙ্গে নিয়েও যায় পরিবারের জন্য ঠোঙ্গায় বেঁধে। আমিও মাঝেমাঝে আনাই। মহিলার হাতের ভাপা-চিতই সত্যি নিপুণ কারিগরের মতোই। স্বাদেও কমতি নেই। মায়ের হাতের পিঠের মতোই সুস্বাদু, নরম, গরম। আহ, শীতের সকালে গরম পিঠে পাওয়া সে এক আনন্দ বটে। আগের দিনের মায়েরা সেই সাতসকালে হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে পিঠের আয়োজন মহানন্দেই করতেন। এখনকার নাগরিক জীবন হতে সেসব দিন অনেক দূরে সরেছে। এখন হাতের নাগালেই ঝামেলামুক্ত সুবিধের পসরা। তো, অযথা কষ্টের দরকারটা কি ! তবু অনেকে শখের বশেই বাড়িতে শীতের পিঠে বানান। আবার শীতের পিঠে মেলাও হয় অনেক। সেও অনেক আয়োজন নিয়েই, শীতপিঠে উতসবের সমারোহ। উপচে পড়া ভিড়ের ভিতর পিঠের মনোহারী প্রদর্শনের উতসব।

সমস্ত ছাড়িয়ে শীতের শাল-সোয়েটার-জ্যাকেট-কম্বল-বাণিজ্য রমরমা সর্বত্র। যথেষ্ট সুলভেই পাওয়া যায় ফুটপাথের দোকানে। এবঙ বড়বড় বিপনী জুড়ে শীতের পোশাকের বিশাল বাণিজ্য। সেখানে সুলভে না। চড়াদামেই বেচাকেনা। আকাশতল যাদের ঠিকানা, তারা শীতের দিনরাত্রি কি করে কাটায় ভাবতে গেলে লেপের ওম কাঁটার মতো শিউরে ওঠে।

আমার ছেলেবেলায় হাড়কাঁপানো শীত এলেই মায়ের শেখানো ছড়া জোরেজোরেই আওড়াতে ভালোবাসতাম –

“শীত আমার মিত আগুন আমার ভাই
শীতের কাছে কইও আমার কাঁথাকাপড় নাই।।”

যেন বা শীত অমনি মিত হয়েই আগুনে ভায়ের বার্তা পড়বে ! আর কাঁথাকাপড় নাই জানতে পেয়ে শীতের দাপট কমিয়ে দেবে ! ছেলেবেলায় এমনই বিশ্বাস ছিলো ! অবুঝ-সবুজ বিশ্বাস। আদতে যে বাস্তব কত কঠিন বাস্তব বয়সকালে তা বুঝেছি। বোঝার পর হতেই যন্ত্রণার মাত্রাও মাত্রাছাড়া বেড়েই চলেছে। কেননা –

“কঠিনেরে ভালোবাসিলাম”

কবিগুরুর এই বাণীটি আদতেই কঠিন। কঠিনেরে ভালোবাসিবার জন্য যে অঢেল ক্ষমতা প্রয়োজন, নিজের সামান্য ক্ষমতা বাস্তবের সবার প্রয়োজন মেটাতে ধূলিকণাসম, এ বড়ো সত্য। আবার অনেকের সামান্য মিলে অনেক হয়ে উঠতে পারে, এটিও সত্য। আমরা নিশ্চয় সবাই সেটি করতে পারি। শীতের আগমনে আমার প্রস্তাব থাকলো –

অগণিত গরীব শিশু-বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সহায়তায় হাত বাড়ানোর উদ্যোগ যাতে আমরা নিই। আমাদেরই চারপাশের কোনও এক বস্তির স্কুল / এতিমখানা দিয়ে শুরুটি হোক।

আজই প্রথম আলো-র অনলাইন ছবিটি খুব করেই মনে পড়িয়ে দিলো এদেশে অতিথি পাখির কাল এসেই গেছে। অর্থাৎ শীতকাল এসেছে। আমরা মানব জাতি “সৃষ্টির সেরা” হিসেবে নিজেদের জাহির করি। অথচ আমাদের দেশের অতিথি পাখিশিকার করে তাদের নির্বিচারে আহার করি ! একটু অনুশোচনা পর্যন্ত নেই। আমরা অতি নিষ্ঠুর জাতি আদতে। অযথাই বড়াই করি – “সৃষ্টির সেরা” মানব জাতি আমরা ! মোটেও না, অতি নিকৃষ্ট আমরা। নইলে এতো সুন্দর বিদেশি অতিথিদের হত্যা করতে পারি ! আইন করেও ওদের রক্ষা করার কোনও উপায় নাই ! আসুন, আমাদের দেশে যে অতিথি পাখিরা ক’দিনের জন্যই বেড়াতে এসেছে, ওদেরকে আমরা ভালোবাসি। আদরযত্ন করি। পাখিরা প্রকৃতির সবচে’ সুন্দর প্রাণীর অন্যতম। ওদের হত্যা করার মানে আমরা সবচে’ অসুন্দরের দল, মানুষ নামের ঘাতক দল।

কবির পঙক্তি পড়লো মনে –

“শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?”

কবির নাম মনেও আসছেনা ! আমি যে আদতেই কবির দলে নেই / কবিতা ভুলে গদ্য-র মাঝে এবঙ এর জন্য যে বিডিনিউজ ব্লগ অনেকখানা দায়ী অস্বীকারের কোনও উপায় নাই ! এ ছাড়াও অজস্র অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রবের কালে শীতকাল কি আর তেমন লাগে ! ভুলতে বসেছি কত কি প্রিয় ভুবন ! তো, শীতকালের কবি ও কবিতা ভোলা নিশ্চয় অপরাধ না !

২১ ডিসেম্বর ২০১২ ইং