ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

সবুজ বাংলা-ইমেজ

জীবনানন্দ কি আশ্চর্য পঙক্তি রচে গেছেন –

“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি –
তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাইনা আর”

আমিও সেই আশ্চর্য পঙক্তি হাজারবার উচ্চারণ করি ও গুনগুনাই যখন যেখানেই যাই। এমন হৃদয়জ সবুজ বাংলার জীবন্ত শিকড়ের গন্ধ কি পৃথিবী ঘুরেও দেখা পাওয়া যায় ! যায়না। তাইতো যোজন দূর হতেও বাংলার মুখটি ঠিকই হৃদয় জুড়ে জড়িয়ে থাকে। তাবত সৌন্দর্যের ভিতর সোঁদা গন্ধের শ্যামলিম হাতছানি সে। পৃথিবীর উজ্জ্বলতম ঝলোমলো দুবাই-আমেরিকা-লন্ডন-থাইল্যান্ড-মালয়শিয়া-প্যারিস-জার্মান-কানাডা-রোম-জাপান সমস্ত ছাপিয়ে সে জাগায় হৃদয়। হয়তো সে নিতান্ত ক্ষুদ্র একটি মাঠের পারের শ্যামসষ্পময় লতাগুল্মে-র দেশ। তবুও অপরূপ মুখটি তার। হাজারবার দেখে-দেখেও আশ না মেটা বাংলার শ্যামলা মুখ। তাতেই পৃথিবীর সমস্ত সুখ।

জীবন সায়াহ্নেও সে মুখ একান্ত ভালোবাসার আলোময়ী মায়ের মতো রূপসী। তার তরেই হাজার গানের জাগরণী। চেতনা জাগানিয়া দেশের গান। বাংলা ভাষার মায়াবী গান। জীবন ফুরোয়, তথাপি অফুরান বাংলা মায়ের ভালোবাসার টান। মৃত্যুর পথে যেতেও যে সন্তান ভোলেনা তারে, সে গায় –

“আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল
সকলি ফুরায়ে যায় মা।।
জনমের সাধ ডাকিগো মা তোকে –
কোলে তুলে নিতে আয় মা।।”

এই ভালোবাসার কাছে সকলি তুচ্ছ। সকলি নস্যি। কেবল তার মুখটি ভালোবেসে তারেই বলি –

“ওগো মা তোমায় দেখে-দেখে আঁখি না ফেরে –
ওগো মা -”

আদতে সব দেশের সব মানুষ তার জন্মভূমিকে মায়ের মতোই জানে। মায়ের মতো ভালোবেসেই আদর্শিক যার যা কাজ সে কাজে অকাজে তারই কথা বলতে চায়। লিখতে চায়। আঁকতে চায়। চাওয়া হয়তো সেভাবে এক জীবনে পাওয়া হয়না। হৃদয়জ উপলব্ধিই স্বশিক্ষায় সাহায্য করে। নিজের বাড়ি ও চারপাশের অভিজ্ঞার আলোক তাকে চেনায় আপন হৃদয় হতে অপর হৃদয়ের অন্তরালও। সেইখানে অনেক জটিল অন্তর্জাল। তথাপি দেশমাতৃকার মুখটি সমুজ্জ্বল।

তাইতো প্রতিটি দেশই তার জাতীয় সঙ্গীত সশ্রদ্ধ চিত্তে নির্ভুল উচ্চারণে এবঙ সুর-তাল-লয় সঠিকভাবে গায়। নইলে নিজের দেশের অসন্মান করার মতো অপরাধটি হয়। আমরা যেন তেমন অপরাধ না করি ভুল করেও। এই আবেদনটি জানাই সবার কাছে।

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে ভাষার জন্য আত্মত্যগের নাম। একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া একটি অবিস্মরণীয় দেশের নাম। বাংলাদেশ চেতনার অজর নাম। বাংলাদেশের চেতনা যারা অবজ্ঞা করে / অশ্রদ্ধা করে তারাই এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি, জামায়াত-শিবির-রাজাকারের জোটবদ্ধ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অপশক্তির দল। এদেশ যারা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে ও এদেশের চেতনা জাগানিয়া স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের তাড়নায় দেশকে মাথাউঁচু দেখতে চায় – তাদের আজ একতাবদ্ধ দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই জামায়াত-শিবির-রাজাকারের বিরুদ্ধে। এদেশ কোনও অপশক্তির ঠাঁই না। এদেশ হতে সকল অপশক্তিকে সমূলে উতখাত করতে হবে। গাইতে হবে চেতনা জাগানিয়া একাত্তুরের গান আবার হৃদয় দিয়েই –

“মাগো আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে
তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি –
আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।।”

বাংলা মায়ের হাসিমুখের জন্য গাইতে হবে সেই সে গান –

“মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি।।
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।।

জীবনানন্দ যে মুখটি অনেক ভালোবেসে ছড়িয়ে দিয়েছেন হৃদয় হতে হৃদয়ে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তারে আরও ভালোবেসে জাগ্রত করেছেন –

“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”

বলেই। নজরুল চিরবিদ্রোহী রূপে তারেই উস্কে গেছেন –

“তোরা সব জয়োধ্বনি কর”

আমরা বাংলার জয়োধ্বনিকে চিরজাগ্রত রাখতে বদ্ধপরিকর হলেই এদেশ অপশক্তির থাবামুক্ত হবে। বাংলা মায়ের মুখের হাসি জগতলোক আলোকিত করবে। সেই হাসিমুখটি হৃদয়ে ধারণ করে মরেও সুখ।

গাঁয়ের বাড়ি, মায়ের মুখ - ইমেজ।

বিজয়মাস ডিসেম্বর ২০১২ ইং