ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

একাত্তুর। যখনই উচ্চারিত হয় রক্ত জাগে নতুন করে। কেন? কেন আবার? একাত্তুর যে রক্ত জলের অজর গাথা আমাদের। আমাদের মহান স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস। যে ইতিহাস অনেক আত্মত্যাগ অনেক রক্ত জলে লেখা। যার মধ্য দিয়ে এদেশের নির্যাতিত-নিপীড়িত জাতি এক মহান নেতার মহান দিক-নির্দেশনায় পরিচালিত হয়ে বিশ্বে গণজাগরণের নতুন দৃষ্টান্ত রেখেছিলো। বিশ্ব জানে সেই মহান নেতা তাঁর সুদীর্ঘ সংগ্রামী আদর্শে এদেশের জাতির জন্য বিশ্বমানচিত্রে ঠাঁই করে দেয়ার লক্ষ্যেই জাতিকে তৈরী করেছেন স্বাধীনতার জন্য প্রাণবাজি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছেন। রক্তক্ষয়ী হামলার শিকার যেন না হয় দেশের সাড়ে সাত কোটি জনগণ সেই দূরদৃষ্টি দিয়ে রচেছেন স্বাধীনতার অজর আহবান রূপী ১৯৭১, ৭ মার্চ এর ঐতিহাসিক গণজোয়ারের ভাষণঃ — এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। — প্রত্যেক ঘরে-ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। — রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দিবো। এদেশের মানুষকে মক্ত করে যাবো ইনশাআল্লাহ।

সেদিন এদেশের অবিসংবাদিত নেতা ও দেশব্যাপী উত্তাল গণজোয়ারের কান্ডারি কালের মহান নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অই ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্যে জাতির মনে স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রণোদনা সঠিক মাত্রায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই এদেশের মানুষ পাকিস্তান-জান্তার নারকীয় হামলার শিকার হয়েও মনোবল না হারিয়ে নেতার অজর শ্লোগান ‘জয়বাংলা’ বলে যুদ্ধ করেছে। ৭ মার্চের পরপরই বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান গৃহবন্দী রাখে। নেতা তাঁর মানুষ বাঁচুক এবং বিশ্বজনমত যাতে তৈরী হয় সেই উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের ভয়ংকর হয়ে ওঠার জান্তব আক্রমণ ঠেকাতে গৃহবন্দী অবস্থায় জান্তার হাতে স্বেচ্ছাবন্দীত্ব মেনে নেন ২৫ মার্চ এদেশের কালরাত্রিতে। তার আগেই তিনি তাঁর সুযোগ্য সহকর্মীদের হাতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ছড়িয়ে দেবার নির্দেশ দিয়ে যান।

তারপরের ইতিহাস এদেশের নিরীহ-নিরপরাধ মানুষের ‘পরে পাকিজান্তার পৈশাচিক নির্যাতনের ইতিহাস। যা আজও যেন লিখে ফুরোবার নয়।
কালজয়ী সেই রক্ত জলের ইতিহাস প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি ‘জনমনোকালকাহিনী’ নামের কাব্যে, যা ২০০৭ এ এদেশের সংকটময় ক্রান্তিকালে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় ধারাবাহিক ছাপানোর সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে ৪৪টি পর্বে ছাপা হয়। আজ তার সামান্য উদ্ধৃতি আবার নিবেদন করছিঃ

— চল্লো নেতার আদেশে যার যা কিছু তা দিয়ে স্বাধীনতার প্রস্তুতি — আর
স্বাধীন একটি সূর্যখচিত সবুজ পতাকার অঙ্গীকার।
তখন শাসকজান্তা গৃহবন্দী করলো নেতাকে — ধানমন্ডির বত্রিশ রোডের বাড়িতে
যে বাড়িটি বাংলার ইতিহাসবাড়ি।
তখন কর্মী ও জনতার ভিড় বাড়ির পাঁচিল ঘিরে। নেতা দাঁড়াতেন বারান্দায়
যেন পিতা, দিতেন অভয়।
অতর্কিতে ভয়ংকর রাত হামলে পড়লো দেশে ইয়াহিয়ার নির্দেশে।
পাকি-পিশাচজান্তা সশস্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধট্যাংক-কামানের গোলা নিয়ে ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ‘পরে
পঁচিষ মার্চ উনিশশো একাত্তুরে। তবু মানুষ বাঁচুক ভেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রেখে ও বিশ্বজনমতের লক্ষ্যে
বন্দীত্ব বরণ করলেন স্বেচ্চায় শত্রুর কাছে। তবু তাঁর মানুষ বাঁচেনি। সেই রাতে ট্যাংকে পিষে
কামানের গোলার আগুনে পুড়িয়ে ঘুমন্ত লক্ষ মানুষকে পৈশাচিক উল্লাসে মেরেছে পাকিজান্তা।
রাজপথে-ঘরে-অলিতে-গলিতে-হাটবাজারের মধ্যে এমন কি মসজিদেও রেহাই পায়নি বাংলার মানুষ।
মানুষকে তারা সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে মেরেছে পশুর মতো।
এই হত্যাযজ্ঞ নাতসি বিভতসতার চে’ ভয়াবহ।
শিশুনারীবুড়োনির্বিশেষে হত্যা-ধর্ষকামের হিংস্রতায় পৃথিবী স্তম্ভিত।
বাংলা ও বাঙালি নিধনের সে এক বর্বরযজ্ঞ। সে এক তান্ডবপিষ্ট নগ্নমাতৃভূমি।
তান্ডবের যে ছবিতে আজও হৃদয় দাউ-দাউ — তার কথা বলিঃ

নেহাত গাঁয়ের লোক বাংলায় ভিটেমাটিঠাঁই বাংলা ব্যাতীত অন্য ভাষা জানা নাই।
সে কি অপরাধ? সে কি পাপ? মানবধর্ম বলেঃ এ অপরাধ না পাপও না।
অথচ ধর্মের জালে ঝুলন্ত ভ্রাতৃত্ব নামের কলঙ্ক পাকিজান্তা বেয়নেটে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে মারে
লোকটারে — যেহেতু সে বাংলায় কথা বলে।

এইসব দুঃখচিত্র রক্তাক্ত স্মৃতির অস্রুকাব্য লিখলে হয়তো মহাকাব্যের অধিক হবে।
তখন বয়স ষোলো এস-এস-সি-র ছাত্রী মনে আছে পাড়ার ডাক্তার নিত্যহরিবাবু
চব্বিশ ঘন্টাই খোলা রাখতেন চেম্বার পাড়ার মানুষের জন্য, এ পাড়ায় তিনপুরুষের ভিটে
ফেলে কোথায় যাবেন স্ত্রীপুত্রকন্যাকে নিয়ে — যখন হঠাত মিলিটারি নামলো শহরে —
এগিয়ে এলোনা কেউ — শুধু বাবা দাঁড়ালেন পাশে ‘শান্তিকমিটি’র রক্তচক্ষুচিরে।
নির্বিরোধী হিসেবে সুনাম ছিলো বাবার, সুনাম ছিলো অসময়ে পাশে দাঁড়াবার।
যে কারণে এ্যাকশন নেয়নি কমিটি আর। যুদ্ধের ন’মাস লুকিয়ে রইলো আমাদের বাড়িতেই
ডাক্তারবাবুর পরিবার। তবু লুট হয়ে গেছে তাঁর বাড়ি, ‘শান্তিকমিটি’র রাজাকারগুলো
হাতিয়ে নিয়েছে সব — মনে হলেই — ঘৃণায় জ্বলি।

উল্লেখ্য, আমার ‘জনমনোকালকাহিনী’ ২০০৭ এর বাংলাদেশের সংকটময় কালেই বইমেলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। যাহোক, আজ আমার বলবার যা তা এই যে আজ আবার আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি আর বঙ্গবন্ধুর হত্যা সমর্থনকারী জেনারেলগঙসৃষ্ট দল-উপদলগুলো রাজাকারগঙদের বিচারিক প্রক্রিয়া বন্ধ করতে বহুবিধ অপব্যাখ্যায় লিপ্ত। যার বিরুদ্ধে জনসাধারণের একাত্ম-অভিন্ন হওয়া জরুরী মনে করি। যাতে কোনোভাবেই বিচারিক কার্যপ্রক্রিয়া বানচাল না হয়। স্বাধীনতাবিরোধীরা শাস্তি থেকে অব্যহতি পায়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেয় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কাম্য রাজাকারগঙ এর জন্য। আমরা যারা যুদ্ধ দেখেছি, দেখেছি পাকিজান্তার সনে কারা হাতে-হাত মিলিয়ে নিরন্তর সহযোগীতার যোগান দিয়ে সাহায্য করেছে অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রম লুটতে, আমরা জানি পাকিরা চিনতো না এদেশের গ্রামগঞ্জের পথ, দেশীয় শয়তানরাই চিনিয়েছিল। এমন কি একদম বিজয় অর্জনের মুহূর্তে তারা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে নৃশংসভাবে বধ্যভূমিতে হত্যা করেছে আমাদের নমস্য সুশীল ব্যক্তিত্বদের। তাদের কি ক্ষমা করা যায়? এই প্রশ্নের জবাবের জন্যই আজকের এই লেখা আমার।