ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বইমেলা হতে শাহবাগের গণজাগরন - ছবি - বাসস।

ভেবেছিলাম চুপ থাকবো কিছুকাল। ভেবেছিলাম অনেক তো লিখেছি – অনেকটা কালব্যাপীই – খানিক ঝিমুনি – ক্লান্তি আমায় জেঁকে ধরেই যেন শুকনো নদীটির হঠাত বাঁক নেয়ার মতো চড়ায় নিয়ে বসিয়ে রেখেছিলো – কিন্তু না, পারলাম না, আমায় লিখতে বসালো পুরনো দায়ভার। এ দায় এড়ালে হৃদয়ের কাছেই অপরাধী হওয়া।

এইদেশে অভূত আজকের এমন একটি গণজাগরণের কথা ভেবেছি বিয়াল্লিশ বছর ধরে —- লিখেছি সেই কথাটি কতভাবে কত কি পঙক্তিমালায় —- কত ভাবের আতিশয্যময়তায় – নিজের পোস্টে —- অথচ আজ দুদিন ধরে নাওয়াখাওয়া ভুলেই সারাদিনমান টিভিতে / অনলাইন নিউজে / ব্লগে এবঙ ফেসবুকে তারই জয়বার্তা শুনছি, দেখছি, পাঁজরঅস্থিমজ্জায় বেজে উঠছে অবিকল একাত্তুরের রক্তজাগা বাজনা – সে বাজনা ছড়িয়ে পড়েছে আজিকে শাহবাগ হতে দেশের সবখানে। ফেসবুকের একজন তরুণ ব্লগারের স্ট্যাটাস যার সূচনা – সেই সূচনা হয়ে দাঁড়ায় শতশত – হাজার – লক্ষ সমর্থনা – অচিরে কোটি ছাড়াবে – এ শুধু আমার কথা না – এ আজ দৃশ্যমান অমিত আগুনের স্ফুলিঙ্গসম সম্ভাবনার বাংলাদেশ।

এইদেশে বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নজাগা মন্ত্রণা জাগিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু একাত্তুরে। সেই মন্ত্রণা মুক্তিকামী গণজোয়ারে রূপান্তরিত হয়েই মুক্তিযুদ্ধের অদম্য প্রেরণা হয়। এবঙ অবশেষে ছিনিয়ে নেয় বিজয় লক্ষ প্রাণের আত্মত্যাগে। একটি পরাধীন জাতির মুক্তির ইতিহাসটি সংগ্রামী রক্তমাখা আত্মত্যাগের। তার চেতনা শিকড়জাত। একাত্তুরে দেশীয় শয়তানরা পাকিস্তানের দোসর হয়েই হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ-লুটপাটের নারকীয় তান্ডব চালিয়েছে। তারাই রাজাকার-আলবদর-আলশামস। তারা মেধাবী বুদ্ধিজীবি হত্যাকারীর দল। তাদের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে বর্তমান সরকার নির্বাচনের ওয়াদা পূর্ণের লক্ষ্যে।

এতোটা কাল পেরিয়ে অবশেষে একাত্তুরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারিক রায়ের ফলাফল জনমনের প্রত্যাশা পূরণ না করায় তারুণ্য দ্রোহের আগুনে ফেটে পড়েই একত্রিত করে ফেললো সর্বস্তরের মানুষদের। এই দৃশ্যটি দেখতে চেয়েছি এতোকাল ধরেই। ভেবেছি এ জন্মে বেঁচে থাকতে আমার হয়তো দেখা হবেনা – কিন্তু অন্তরে আশ্চর্য একটি সুগভীর বিশ্বাস লালিত ছিলো যে – একদিন তরুণ প্রজন্ম একাত্তুরের চেতনায় উঠবে জেগে। সেটিই আজ আমার জীবদ্দশায় ঘটলো বলে পরম করুণাময়ের কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই। এবঙ অভিবাদন জানাই আজকের তরুণ প্রজন্মকে, জানাই লাল সালাম। আমি পারলে সশরীরে তাদের সঙ্গে শাহবাগের জনসমুদ্রে সামিল হয়ে আমার অভিন্নতা প্রকাশ করতাম – তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শ্লোগান দিতাম – “এ রায় মানি না, মানি না, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই।” আমার শারিরীক সমস্যা ভিড়ভাট্টায় প্রকট হয়ে দাঁড়ায় বলে হৃদয়গত প্রবল ইচ্ছেকে কষ্টে দমিয়ে রেখে এখানে ব্লগে প্রকাশ করে দুধের স্বাদ ঘোলেই মেটাতে চাইছি। শাহবাগ এখন জনসমুদ্রে উত্তাল। তরুণরা কঠিন পণ করেছে – দাবী আদায় না করে কেউই ঘরে যাবে না। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মা-বোন-প্রেমিকা-বন্ধু-জনতা। কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকা বানিয়ে প্রতিকী ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সবাই জুতা মারছে – “তুই রাজাকার” বলছে – মাঝেমাঝেই মুক্তিযুদ্ধের অজর শ্লোগান দিচ্ছে – “জয়বাংলা।” যতবার শুনছি আমিও “জয়বাংলা” বলে উঠছি – আমার দুচোখে জলধারা উপচে ওঠা থামাতে পারছি না – শহীদ জননীকে মনে পড়ছে – আহ তাঁর ও লক্ষ শহীদ ভায়ের আত্মা নিশ্চয় আজ শাহবাগের জনসমুদ্র উত্তাল জনস্রোতে উড়ছে – হৃদয় অশরীরি তাঁদের আত্মিক অস্তিত্ব অনুভব করছে – আজ তাঁদের অতৃপ্ত আত্মার শান্তি পাবার দিন – আমার গভীর বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য তাঁদের আত্মার প্রতি – ভুলিনি তোমাদের –

“আমরা তোমাদের ভুলবো না, ভুলবো না, ভুলবো না।”

দুদিনের গণজারণের সন্মিলনে তারুণ্য ঘোষণা দিয়েছে আজ শাহবাগের মিলনমেলাটি মহাসমাবেশ। খানিকক্ষণ আগে টিভিতে শাহবাগের জনসমুদ্রে এক তরুণী ছাত্রীর বক্তব্য শুনলাম – তরুণী আগুনঝরা কন্ঠেই উচ্চারণ করলো – “বিয়াল্লিশ বছর অপেক্ষার পরেও যদি বিচারে একাত্তুরের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি না হয়, তবে আমাদেরই ফাঁসি হউক।” আমি হাজার সালাম জানাই তরুণীকে। আমার রক্ত উথাল হয় – অভিবাদন আজকের তারুণ্য, লাল সালাম তোমাদের।

জয়বাংলা।।
৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৩