ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

রোজ ভোরে জানালায় চিলতে সূর্যালোকে ভেসে যেতে-যেতে ভাবিঃ আজ যেন দিন ভালো যায় — ওগো ও জগতবিধাতা আজ সকলের ভালো যেন হয়। এই প্রত্যাশা আদতে রক্তে বুনে দিয়ে গেছেন মা। সেই শিশুবেলায় ঘুমপাড়ানির গুনগুনানির সনে মা কিন্তু রোজই বেশ স্পষ্ট কন্ঠে শোনাতেনঃ

সকালে উঠিয়া আমি মনে-মনে বলি / সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি /
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে / আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে /
ঝগড়া না করি যেন কভু কারও সনে / মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মনে /
ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি / মোর লাগি ব্যথা নাহি পায় দাসদাসী।

কথা শেখার আগেই মায়ের উচচারিত পঙক্তিমালা মেধা-মননে মন্ত্রের মতোই প্রায় গাথা হয়ে গেছিলো বলে বুলি ফুটতে না ফুটতেই ভোরে জেগে উঠেই আউড়াতে থাকতাম অই পঙক্তি। আধো উচচারণের ভুলভাল শুনে দাদী-বাবা-মা সবাই হাসতেন। আবার হাততালি দিয়ে প্রণোদনাও দিতেন। আজ তারা কেউ বেঁচে নেই বটে, তবুও তাদের প্রণোদনাময় আদর্শ ঠিক রয়ে গেছে রক্তে, মেধা ও মননে। যে জন্য কিছুতেই কোনও মিথ্যেবাজিতে মন যায়নি, যায়না, যাবেনা জানি। জানি একদিন সত্য-র জয় অবশ্যম্ভাবী, মিথ্যেও ইতিহাসের পাতা হতে খসে পড়ে অবধারিত নিয়মেই। হৃদয় সততঃ সাহসী তাই। তাই অকপটে লিখতে পারিঃ

— দগ্ধ বাংলায় পেতেছি ঘর — চারপাশে পড়ন্ত উদ্যান। / বাংলা ব্যাতীত স্বপ্ন বুঝিনা — বুঝিনা স্বর্গসুধাপান। /
যদি যুদ্ধবাজ কাল কেড়ে নেয় কালের যোগান — / তবু ছাড়বোনা হাল — জানবো আমার আছে গান। /
আছে রাত্রিভোরের হাজার উপাখ্যান। / শুনতে-শুনতে যার হাজার জানালা লেখে হৃদিগান। /
লেখে স্নেহজলরেখা — সজল আগুনমাখা পিতৃতর্জনীতে জয়বাংলা দেখা। /
যারা শুনেও শোনেনি সেই সাড়ে সাত কোটি হৃদয়ের গান — /
যারা জীবনে পড়েনি সত্য-উপাখ্যান — / এদেশ তাদের নয়। এদেশ তাদের নয়। /
শুধু কি না আমাদেরই কিছু ভুলে তারা আজ চারিয়ে গিয়েছে মূলে। /
এবার তাদের মূলোতপাটন চাই। এবার তাদের প্রকাশ্য বিচার চাই।

* আমার ‘পড়েছো জানালাগান?’ কাব্য থেকে, ‘নুরুন্নাহার শিরীন-এর দেশজ কবিতা’ গ্রন্থে প্রকাশিত কবিতাংশ, পৃষ্ঠাঃ৪৯ *