ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

ফেব্রুয়ারীর শেষ দিবস মানেই বইমেলাও শেষ। বাতাসে ভেসে বেড়ানো আনকোরা অজস্র ঝকঝকে মলাটবদ্ধ বইয়ের উদাস গন্ধ বন্ধের দিন। আবার একটা বছর শেষে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গন ভরে উঠবে বইপ্রেমীদের পদচারণামুখর উল্লাসে। এই বইমেলাকে ঘিরে লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের অপেক্ষা আদতেই যথেষ্ট সাড়া জাগানো। যদিও আমার ভাবনাটা খানিক ভিন্নতর। একসময় এই ফেব্রুয়ারীর বইমেলায় একটা দিন যাওয়া বাদ গেলেই প্রাণে লাগতো খুব। আমাকে ছাড়া বইমেলায় না জানি কিসব ঘটমান আড্ডা-চা-পান আহা! মনটা ক্যামন করতো! বয়সটা তখন তেমনই ছিলো যে! বইমেলার নামেই উড়ুউড়ু! সেইতো বয়সের ধর্ম। আজও বইমেলা প্রাণকে টানে বিষম তবু যাওয়া না যাওয়া বিষয়ে সেই উড়ুক্কুপনা নেই। নতুন বইপত্র মেলার তথ্যকেন্দ্র এবঙ প্রকাশ তালিকা ধরে নিজেই একটা মনপছন্দ বইয়ের তালিকা করি, অনলাইনে অথবা কাউকে দিয়ে কেনার জন্য। ও হ্যাঁ, ভিন্নতর ভাবনা এই – সারাবছর সুবিধামতো সময়ে বই প্রকাশ করায় অসুবিধেটা কই? কেন যে শুধু ফেব্রুয়ারীতে বইমেলা ঘনিয়ে এলে যেমন করে হউক প্রকাশক ধরতে হবে? পান্ডুলিপি কি সারাবছর সযত্নে একটু-একটু করে গোছানো গেলে কাজটা আরও অনেক ভালো হয়না? হুলুস্থুলু প্রকাশনায় ঝকঝকে প্রচ্ছদে যা ভরে দেওয়া হয় সেসব যত্নে সময় নিয়ে করলে ত্রুটিমুক্ত গ্রন্থটি পাঠকদের দিতেও কত আনন্দ এই ভাবনাটা কি ভুল?

তারপরেও বইমেলা মানেই প্রাণের মিলনমেলা। অই মিলনমেলা ভাঙলো ভাবতে বইপ্রেমীদের মনটা কাঁদে বই কি। একটা মাসের কত সঘন আড্ডামুখর বিকেল, সন্ধে নতুন বইয়ের আলাপচারিতায়, চা-পানে, বাদাম-ফুচকায়। অন্যদিকে রোজই মোড়ক উন্মোচনের ঘটা। আমার অবশ্য মোড়ক উন্মোচন বিষয়টির প্রতি কোনওকালেই ভালোলাগার কিছু পাইনা।  তথ্যকেন্দ্র যখন বারংবার একটা বইয়ের নতুন প্রকাশনার জানান দেয় তাতেই উপস্থিত সকলে দিব্যি জানতে পায়। এবঙ বিভিন্ন চ্যানেল মিডিয়ার ক্যামেরা মেলার নতুন বইয়ের খবর গুরুত্ব দিয়েই সারামাস প্রচার করে। পত্রপত্রিকাতেও বইয়ের খবর ভালোই গুরুত্ব পায়। তাহলে মোড়ক উন্মোচনের মাজেজা কি আমার মাথায় আসেনা। নতুন বই কি গোপন-বিবাহ! তার মোড়ক উন্মোচন করাতে হয় বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব ডেকেই! যেন বা হুজুর ডেকে ঘোমটা কেটে নতুন বইকে (বউ) জায়েজ করানোর মতোন আয়োজন! (*বিশেষ দ্রষ্টব্য* – মোড়ক-উন্মোচনপ্রিয়দের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী।)

বইমেলার বিদায়দিনে মনের মাঝে গুনগুনাচ্ছে প্রিয় পঙক্তিঘোর – আমারই – “অর্বাচীনের দিবসরজনী” নামে একটু-একটু লিখছি যারে। হয়তো অচিরে আগামী যে কোনও দিনেই কোনও প্রকাশকের হাতে ধরিয়ে দিবো ঘটাংঘটাং মুদ্রণযন্ত্রে যন্ত্রস্থ হবার জন্য। তারই ইতিউতি দুচারখানা বইমেলা ভাঙার দিনে এখানে যারা কাব্যিক ভাবজগতের বাসিন্দা তাদের কারও-কারও হয়তো ভালো লাগতে পারে ভেবেই দিচ্ছি – (*ভালো না লাগার সমস্ত দায়ভার আমার*)।

A_Book_Cover_অর্বাচীনের_দিবসরজনী_by_নুরুন্নাহার_শিরীন

 

   অর্বাচীনের দিবসরজনী

     নুরুন্নাহার শিরীন

===================

 ১।  হাড়ের গভীরে ঘুণ ধরেছে ঘুণপোকার মতো।

      তবুও হারতে রাজী কিন্তু সহজ নয়গো।

      ঝাঁঝাঁঝিঁঝিঁ রক্ত জুড়ে গান জুড়েছে কথাও।

      কথাজালেই আটকা আমি পড়ছি অক্ষরলিপিকাও।

      হয়তো ঠিকই কেউ না কেউ জ্বালবে ভালোবাসা।

      ভালোবেসেই বসবে পাশে জ্বালবে এষণাময় ভাষা।

      তার পাশে শুনশান সন্ধে ছায়াদের মিতা।

      ছায়া কি হঠাত হেসে উঠে পড়বে কবিতা?

 

 ২। তাই কবিতা শুনতে শত বাগানবিলাস?

     তাই ভূঁইচাপাদের আর যুঁইজবা লিলি ও মল্লিকাদের

     অন্তহীন আনচান দিঙদোলানো রাতের?

     বার্তা ওড়ে ছাইভস্মে , বাতাসের হাঁসফাঁস।

     পাশে কামিনীরা পাশে বেলী মালতীরা ওড়ে।

     রক্তের ভিতরে ফাটা শিমূলের শাদা তুলো

     তুমুল লালের উড়ো জলতরঙ্গের দিনগুলো

     কবি ও মালির চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বপ্নে ঢুকে পড়ে।

 

 ৩।  তখন তামাদি যত অশ্রুবদ্ধ আশাঘোর।

      তখন তরুণাস্থির ফাঁকা ঝিল্লির ভিতর ফুল্লগন্ধি রাঙা ভোর।

      পুষ্পাকাঙ্ক্ষায় কম্পিত শব্দাকাশে ঝর্ঝর-মর্মর কবিতা প্রহর।

      আমারও অসুখের শেষ পারানির ঝড়।

      তারপরেও তমসা শেষে শব্দের নতুন মোড়।

      কোথাও চম্পাচামেলী ফোটা নতুন খবর।

      সেইখানে চুপচাপ দিবসের কলস্বর।

      রজনী ফুরালে দেখি সুশান্ত সকাল ঘর।

 

 ৪। সে ঘরে আলোয় পোড়ে দিবসরজনীভর ছায়াদের ছবিময় বাঁক।

     সে বাঁকে বেদনাগাথা সুখচোর মেঘলা তারার ঝাঁক।

     তারার আলোয় পোড়া মেঘরাগে চাঁদের কি এসে যায়!

     চাঁদোয়া পড়ন্ত প্রেমে বুড়ো নদীরে হাসায়।

     যোজন গোমতী ঢেউ স্বপ্নে বাতাস ভাসায়।

    তখন তারুণ্যঘেরা স্বপ্নডানা ছুঁয়ে বসি একা ঘাটলায়!

     যা কিছু অপরিশোধ্য আমারই জন্মঋণ শব্দে গান গায়!

     অপহ্নবের আরাধ্য কাব্য রক্তে হৃদয় বাজায়!

 

ফাল্গুন ১৪২০ বঙ্গাব্দ।।

২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ ইং।।

slide

আমার করা "অর্বাচীনের দিবসরজনী" বইয়ের সম্ভাব্য প্রচ্ছদ।