ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সুরের ভুবন

 

বশির আহমেদ। অবিস্মরণীয় একজন গানের পাখি ষাটের দশকের। অত্যন্ত মধুর কন্ঠের অধিকারী বশির আহমেদ কোলকাতার খিদিরপুরে বাবা-মায়ের ঘরে ১৯শে নভেম্বর ১৯৩৯ সালে জন্মেছিলেন। চলে গেলেন পঁচাত্তুর বয়সে, অনেক অসাধারণ গানের রেকর্ড রেখে ২০শে এপ্রিল ২০১৪-তে। তাঁর গাওয়া গানগুলি ষাটের দশকেই পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। তিনি কিশোর বয়সে তালিম পেয়েছেন ওস্তাদ বেলায়েত হোসেন-এর উঁচুদরের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ভুবনে। পরে মুম্বাইয়ের প্রখ্যাত ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ তালিম দিয়েছেন মেধাবী বশির আহমেদ-কে ক্ল্যাসিকেলে বিশেষ যত্নে। তরুণ বয়সেই পাকিস্তানের উর্দু চলচ্চিত্রের গানে দারুণ পারফমেন্স দেখিয়েছেন –

“যব তুম একেলে হোগে –

হাম ইয়াদ করেঙ্গে”

গানটি তাঁকে তখনকার সঙ্গীতপ্রিয় সর্বমহলে সাগ্রহে সমাদৃত করেছে।

১৯৬৪ সালে সপরিবারে তাঁর ঢাকায় বসতি স্থাপন। সেই সময়কার চলচ্চিত্র “তালাশ” তাঁকে সুযোগ দিয়েছে বিখ্যাত শিল্পী তালাত মাহমুদের সঙ্গেও কাজ করার, যাতে বশির আহমেদ দক্ষতা রেখেছেন সার্থকভাবে –

“আমি রিক্সাওয়ালা মাতওয়ালা” – গানটি গেয়ে। গানটি সেই সময়ে শহর ছাড়িয়ে গ্রামে লোকজনের মুখেমুখে ফিরেছে। তালাশ ছবির নায়ক রহমান বশির আহমেদের গাওয়া গানটির কারণে সমধিক জনপ্রিয়তা পান তখন। তরুণরা রাস্তার রিক্সাওয়ালাদের অনুরোধ করেই রিক্সা চালিয়ে নায়ক রহমানের মতো গাইতে চেষ্টা চালাতো – “আমি রিক্সাওয়ালা মাতওয়ালা” – এমন দৃশ্য আমরা আমাদের শহর কুমিল্লার রাস্তায় অবাক নয়নে দেখেছি সেই সময়ে। সত্য যে আবার অই গানটি আমরাও অনেক ভালোবেসেই গাইতে চেষ্টা চালিয়ে মনেমনে তরুণদের সনে কন্ঠও মিলিয়েছি। বশির আহমেদ তখন তরুণ-তরুণীদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তাঁর আরও অনেক গানের মধ্য দিয়েই। তেমন একটা গান –

“অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন ছিঁড়ে যায় –

মিছেই তারে শিকল দিলাম রাঙা দুটি পা’য়” –

ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো। “ময়নামতি” ছায়ছবি এবঙ নায়ক-নায়িকা রাজ্জাক-কবরীর জুটি বশির আহমেদের গানের কল্যাণেই অনুরকরণীয়তাকেও প্রায় ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। আজও অই গানটি স্পর্শকাতরতায় জড়ায়। তাঁর আরও একটা গানের বাণী-সুর হৃদয়ছোঁয়া এখনও, এবঙ আরও অনেক কাল এসব গানে বশির আহমেদ অন্তর জাগাবেন – বিশ্বাস করি, গানটি –

“যারে যাবি যদি যা –

পিঞ্জর খুলে দিয়েছি –

যা কিছু কথা ছিলো ভুলে গিয়েছি –

যারে যাবি যদি যা – ”

আজ কাঁদাচ্ছে বড়ো – আমার মতো অনেকেই হয়তো আজ বেদনাহত।

২০০৩ সালে বশির আহমেদ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন – “কখনও মেঘ কখনও বৃষ্টি” চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত শিল্পী বিবেচ্য হয়ে। বশির আহমেদ একই সঙ্গে গায়ক, গীতিকার, সুরস্রষ্টাও ছিলেন। এমন গুণী মেধাবী গানের পাখির অন্তর্ধানে আমরা শোকাহতচিত্তে স্মরণ করছি তাঁরেই তাঁর ফেলে যাওয়া গানেগানে। বিধাতা তাঁকে চিরশান্তিতে রাখুন অচিনপুরে।

২০শে এপ্রিল ২০১৪ ইং

বৈশাখ ১৪২০ বঙ্গাব্দ।।