ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

আজ আবার সেই ২৪শে এপ্রিল ২০১৩-র সেইদিন, যেদিন হঠাত হুড়মুড়িয়ে রানাপ্লাজা নামের এক ভবন ধসে পড়েছে বালির বাঁধের মতো,  মুহূর্তে শত শ্রমিক ভাইবোনের আর্তনাদের শব্দ শোনার আগে। আমরা আগে এমন করে কোনও ভবনের এভাবে ধসে পড়ার দৃশ্য দেখিনি এক জীবনে। এতগুলি প্রাণের একসঙ্গে জীবনহানির যাতনা দেখিনি। একজন অবিবেচক মালিক নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে ভবনে চিড় ধরেছে জেনেও শ্রমিকদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়ায় সেইদিন পোষাক কারখানার মেশিন চালু হবার সঙ্গেসঙ্গে শ্রমিক ভাইবোনেরা হয়তো কিছু বোঝার আগেই অনেকে রক্তধূলিকণাসম স্থবির, ধূলিস্যাত হয়েছে। তারা হয়তো ভাগ্যবান, যাদের মৃত্যু বোঝার আগেই ঘটেছে। কিন্তু যাদের  দমবদ্ধ ইট-চুনসুরকি-ইস্পাত-ধাতবে হাত-পা-মাথা-কোমর আটকা পড়েছে সেইদিন, তাদের যন্ত্রণা আমরা কতটুকু বুঝেছি আর! যদিও  মাসব্যাপী উদ্ধার কাজের দৃশ্যটি দেখে আমরা অনেকেই সেখানে ছুটে গিয়েছি মানবিক তাগিদে। সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগ দিয়েছি। সরকারও দিয়েছে। তবু অপ্রতুল তখন শতশত আহত সংকটাপন্ন শ্রমিকদের চিকিতসা চালাতে দেশের মানুষ, প্রবাসীরা দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দায়ী  মালিক গ্রেফতার হলেও আজও বিচারাধীন। বিচারিক দীর্ঘসূত্রীতা এইদেশে একটা বৃটিশ কালের জগদ্দল পাথর যেন। সহজে নড়নচড়ন নাই। বাতাসে তাই আজও বিচারের বাণীর কেঁদে ফেরার আওয়াজ। সরকারের কাছে বিচার ব্যবস্থার আইনগত দীর্ঘসূত্রীতার জরুরী অবসানকল্পে জরুরী পদক্ষেপ নেবার দাবী জানাই আজ।

এদেশে চব্বিশ বছর পেরিয়েছে পোষাক শিল্প বাণিজ্য। মালিক পক্ষের অবিবেচনার কোনও অগ্রগতি আজও ততখানি ঘটেনি যতখানি কাঙ্ক্ষিত মানবিক কারণে। যত্রতত্র যে যার মতো ভবন নীতিমালা না মেনে, দমবদ্ধ চারদেয়ালে শ্রমিকদের নিয়োগ দিয়ে, দিনরাত্তির মেশিন চালিয়ে  বৈদেশিক আয়ের মুনাফা লোটেন। মুখবুঁজে জীবন-জীবিকার তাগিদে লক্ষলক্ষ শ্রমিক ভাইবোন তাদের জীবনঝুঁকিময় ভবনতলে মালিকের নির্দেশ মেনে চব্বিশঘন্টা শ্রম দিয়েও ন্যায্য মজুরী পেতে প্রায়ই আন্দোলন করতে নামে। সেইখানেও তারা রাজনীতির অন্যায় শিকার হয়।  যদিও বর্তমান সরকারের আমলে শ্রমিক মজুরী বাড়ানো হয়েছে, তথাপি, বহু কারখানার মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অঙ্গুলি আছে। “মেইড ইন বাংলাদেশ” খ্যাত তৈরীপোষাক রফতানীর বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। “সেলাই দিদিমনি”-দের অবস্থা আজ “দিন কাটেতো রাত কাটে না” অবস্থানে অনিশ্চয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে ঝুলছে। আমরা সেটি চাইনা। চাইনা বলেই আইনের সর্বোচ্চ কড়াকড়ি আরোপ সহ দেশের সকল পোষাক  কারকারখানাগুলি সরেজমিন তদারকীর মাধ্যমে সচল রাখার আবেদন জানাই। সেইসঙ্গে সেদিনকার শতশত মৃত ও আহত শ্রমিক ভাইবোনদের পরিবারের প্রতি সহমর্মীতা প্রকাশ করছি।

সেই আহাজারির আর্তনাদে যখন বাতাস কাঁদছে, কেঁদেছি আমরা, এমন কি প্রধানমন্ত্রীর চোখেও অশ্রু ঝরতে দেখে আপ্লুত আহতরা, তেমন সময়ে শ্রমিক ভাইবোনদের স্মরণে কিছু পঙক্তি রচনা করেছিলাম। সেটি এখানে শেয়ার করছি আজ আবার –

অবাঙ আদিম যাতনাজালে

~            নুরুন্নাহার শিরীন

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

এতটা গুমোট – আহ – অভাবিত দমবদ্ধ –

প্রায় কবরের চাপে আজগুবি যন্ত্রণাকাতর শত শব্দ।

রক্তাক্ত জমাট চাপ – একসঙ্গে এতগুলি জীবনহানির ভার –

বহন করছে কার পাপপূণ্য – যার আর অবশিষ্ট নেই হারাবার।

আহ যদি পারতাম চোখের পলকে

ঘটে যাওয়া বিনাশ রূপকথার জিয়নকাঠি ছুঁইয়ে ফেরাতে জীবনকে!

সেলাই দিদিমনির স্বপ্ন কিনে দিতে ধসে পড়া ধূলিকার দামে!

অক্ষম অসহ্য বড়ো বেদনা জখম উঠে আসে আঙুলবিহীন!

আহ – কি দিয়ে বাঁচাই এতগুলি হাঁসফাঁস – বাতাস হৃদয়হীন!

(*কাব্যখানি দৈনিক জনকন্ঠ-র চতুরঙ্গ পাতায় প্রকাশিত আমার আর্টিকেল সমেত*)

 

বৈশাখ ১৪২১ বঙ্গাব্দ।।